শাহ আলম, সাভার

  ২৯ জুন, ২০২২

শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা লাঞ্ছনার তীব্র প্রতিবাদ

সাভারের আশুলিয়ায় শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা ও নড়াইলে শিক্ষককে লাঞ্ছনার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেছেন, অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সমাজ ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পথ হারানোর আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এদিকে শিক্ষক হত্যা ও লাঞ্ছনার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ হয়েছে। গতকাল পৃথক কর্মসূচিতে মানববন্ধন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, শিক্ষক উৎপলের মৃত্যু ১৭ কোটি মানুষের জন্য লজ্জার-অপমানের। তারা এই হত্যার বিচার দাবি করেছেন। এদিকে শিক্ষক উৎপল হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাভার। সাভার উপজেলা সদরে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ও জামগড়ার চিত্রশাইল এলাকায় পৃথক মানববন্ধন হয়েছে।

শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা ও লাঞ্ছনার প্রতিবাদে গতকাল গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন দেশের ১৭ বিশিষ্ট নাগরিক। সাংস্কৃতিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান ঘটনায় প্রমাণিত হয়, দেশে মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। সামাজিক মর্যাদা অদৃশ্য। ঢাকার আশুলিয়ায় স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় উৎপল কুমার নামের এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করেছে এক বখাটে ছাত্র। অন্যদিকে, নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাম্প্রদায়িকসহ সব অপশক্তিকে কঠোর হস্তে দমন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির আলোকে শিক্ষা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সব কার্য সাধনে প্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।

বিবৃতিদাতারা হলেন হাসান ইমাম, অনুপম সেন, সেলিনা হোসেন, রামেন্দু মজুমদার, সারোওয়ার আলী, ফেরদৌসী মজুমদার, আবেদ খান, আবদুস সেলিম, লায়লা হাসান, মফিদুল হক, শাহরিয়ার কবীর, মুনতাসির মামুন, হারুণ হাবীব, শফি আহমেদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিমূল ইউসুফ ও সারা যাকের।

সাভারের আশুলিয়ায় হাজি ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, শিক্ষক উৎপলের মৃত্যু ১৭ কোটি মানুষের জন্য লজ্জার-অপমানের। তারা এই হত্যার বিচার দাবি করেছেন।

নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও সাভারে শিক্ষক হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ হয়েছে। সমাবেশ থেকে শিক্ষককে লাঞ্ছনা ও হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। এসব ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিসহ শিক্ষক সংগঠনগুলোর ভূমিকারও সমালোচনা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’-এর ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই সমাবেশ হয়। ‘শিক্ষকের গলায় জুতার মালা: নৈতিকতার অবক্ষয় ও সাম্প্রদায়িকতার ছড়াছড়ির শেষ কোথায়’ শীর্ষক এই সমাবেশ হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারের সামনে এই মানববন্ধন হয়। কর্মসূচির আয়োজক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪১ ব্যাচ (২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষ)।

উৎপল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাস করার পর তিনি আশুলিয়ার হাজি ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করছিলেন। এই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ছিলেন।

মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ফণী ভূষণ বিশ্বাস বলেন, তিনি আর উৎপল একই ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। উৎপল হাজি ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ছিলেন। গত শনিবার দুপুরে দশম শ্রেণির এক ছাত্র ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে অতর্কিত হামলা চালায় শিক্ষক উৎপলের ওপর। সোমবার ভোরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উৎপল মারা যান। হামলাকারী ছাত্রের বিরুদ্ধে উত্ত্যক্তের অভিযোগ দিয়েছিল এক ছাত্রী। হামলাকারী ছাত্র বিদ্যালয়ের সভাপতির আত্মীয়। এই হত্যায় জড়িত সবাইকেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আজকে ২০২২ সালে আমরা সভ্যতার এমন একপর্যায়ে দাঁড়িয়েছি, যেখানে একজন ছাত্র তার শিক্ষককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আর আমাদের সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে হচ্ছে। এই ঘটনাকে কোনো সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। সভ্যতার উন্নয়নের নিচে আমরা যে অন্ধকার লালন করি, এই ঘটনা তার প্রমাণ। সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে আমরা যে একটি নোংরা-পিছিয়ে পড়া সভ্যতা বহন করে চলেছি- এ ঘটনা তারই প্রমাণ।’

নাসির উদ্দিন বলেন, ‘যে শিক্ষার্থীকে আমরা ক্লাসে পড়াই, যে শিক্ষার্থীকে আমরা আলোকিত করি, আলোড়িত করি, সেই শিক্ষার্থীর আঘাতে আমাদের মৃত্যুবরণ করতে হবে, এর চেয়ে লজ্জার, দুঃখের, ঘৃণার, অপমানের আর কিছু হতে পারে না। এ অপমান, এ লজ্জা শুধু উৎপলের নয়, শুধু শিক্ষক সমাজের নয়; এ অপমান, এ লজ্জা বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের।’

উৎপলের সহপাঠী মোহাম্মদ সুমনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরো বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী, একই বিভাগের ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর, ক্রিমিনোলজি বিভাগের সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুনা সাহা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ নিয়াজ মোরশেদ প্রমুখ।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, এ ঘটনা নিছক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ব্যাপার নয়। একে দেখতে হবে সমাজব্যবস্থার প্রগতির বাধা হিসেবে। একে দেখতে হবে, সমাজকে পিছিয়ে টেনে নেওয়ার নোংরা লক্ষণ হিসেবে।

বক্তারা বলেন, এই প্রতিবাদ শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নয়, এই প্রতিবাদ দেশের সব বিবেকবান মানুষের। একজন অপরাধী, একজন খুনিকে ধরে শাস্তি দিলেই এই অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। এ ধরনের ঘটনা থেকে রেহাই পেতে সমাজের সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার যে সংস্কৃতি, তাকে লালন করতে হবে। চর্চা করতে হবে। তা না হলে উৎপলের মতো ঘটনা আবার দেখা যাবে।

উৎপলের প্রাণহানির ঘটনার বিচারের দাবিতে উত্তাল এখন সাভার। গতকাল আশুলিয়ায় বেলা ১১টার দিকে কর্মসূচি পালন করেন হাজি ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এবং দুপুর ১২টার দিকে সাভারের উপজেলা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ।

নিহত শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার এলংজানি দত্তপাড়া গ্রামের মৃত অজিত সরকারের ছেলে। তিনি ২০১৩ সালে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী কলেজে কলেজ শাখার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।

অভিযুক্ত বখাটে ছাত্র চিত্রশালাই এলাকার উজ্জ্বল হাজির ছেলেও এই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মালিক হাজী হযরত আলীর ভাগিনার ছেলে ওই ছাত্র। ঘটনার পর স্থানীয়দের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যায় সে। তার বাসায় গিয়েও বাবা-মাসহ কাউকে পাওয়া যায়নি।

সাভারে মানববন্ধনে সাভার উপজেলা কিন্ডারগার্টেন ফেডারেশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা চাই সরকার এ হত্যাকান্ডের কঠোর ব্যবস্থা নিবে, নাহলে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন পিটার গমেজ বলেন, ‘বখাটে ওই ছাত্রকে আমরা কুলাঙ্গার হিসেবে আখ্যায়িত করি। স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলম সাজু এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

চিত্রশাইল এলাকায় হাজী ইউনুস আলী কলেজের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে ৬ দফা দাবি তোলা হয়। শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা সারা দিন এই কর্মসূচি পালন করব। স্থানীয় অন্যান্য স্কুল এবং কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে আমাদের সঙ্গে তাদের সামিল করব। যতক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়বিচার এবং দাবি পূরণ না হবে ততক্ষণ আমরা আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাব।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close