মিজান রহমান ও জিয়াউদ্দিন রাজু

  ২৬ জুন, ২০২২

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সমর্থন দিয়েছে বলেই পদ্মা সেতু নির্মাণে সক্ষম হয়েছি। জনগণের শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি- আমি সেটাই বিশ্বাস করি। কারণ, বাবা-মা, ভাই হারিয়ে পেয়েছি আপনাদের। আপনাদের মাঝেই আমি ফিরে পেয়েছি বাবার স্নেহ, মায়ের স্নেহ ও ভাইয়ের স্নেহ। আপনাদের পাশেই আমি আছি। আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি, দেওয়ার কিছুই নেই; আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই।’

মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ীতে গতকাল শনিবার দুপুরে পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেন তিনি। এ ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে সকালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশের ‘গর্ব, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক’ আখ্যায়িত করে বলেন, সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বহুল প্রতীক্ষিত সেতুটি এখন প্রমত্তা পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ সালে পদ্মা সেতুর জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি। খালেদা জিয়া এসে তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে এসে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু করি। তখন তারা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ কোনো দিন পদ্মা সেতু করতে পারবে না। খালেদা জিয়াকে জিজ্ঞেস করি, আসুন দেখে যান পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে কি না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ বাংলাদেশে যেমন আমরা খাদ্য, বিদ্যুৎ ও গৃহহীনদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছি এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ করে দিয়েছি। আরো উন্নত জীবন যেন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা পায় তার ব্যবস্থাও আমি করব। এ দেশ আপনাদের, এ দেশ আমাদের। জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন এবং এ দেশকে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক জ্ঞানী-গুণী লোক ছিলেন, অর্থনীতিবিদ, বড় বড় আমলা ছিলেন। সবাই বলেছিলেন, নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু সম্ভব না। আজকে নিজেদের টাকায় কীভাবে করতে পারলাম।’

বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য প্রস্তুত তখন গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রে নানা মহলে ‘তদবির শুরু করেন’ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তার তদবিরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেল। তারা অভিযোগ আনল দুর্নীতির। এখানে দুর্নীতি কে করল? যে সেতু প্রাণের সেতু, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য জড়িত, সেখানে কেন দুর্নীতি হবে?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা টাকা দেয়নি। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্র বলে টাকা বন্ধ করল। আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম টাকা বন্ধ করেছো ঠিক আছে। কিন্তু বাংলাদেশ বসে থাকে নেই। আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করব। অনেকে অনেকভাবে চেষ্টা করেছে, অনেক কথা বলেছে... এ সেতু আমরা করতে পারব না। আমার একমাত্র শক্তি আপনারা, বাংলাদেশের জনগণ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে পদ্মা সেতু হয়েছে। যারা বাধা দিয়েছিল, তাদের আমরা উপযুক্ত জবাব দিতে পেরেছি। এ সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে আমাদের অনেক অপমান, অনেক অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার ছেলে জয়, পুতুল, রেহানার ছেলে ববি, আপনাদের সন্তান আবুল হোসেন (সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন), উপদেষ্টা মসিউর রহমান, সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁঞাকেও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অপমান করা হয়েছে। কিন্তু আমরা পিছু হটি নাই। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল, এই সেতু নির্মাণ করব। দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব। আমরা তা করতে পেরেছি। আপনারা সেই সাহস ও শক্তি দিয়েছেন। আমি আপনাদের পাশে আছি।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আর কাউকে এই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে বাবা, মা, ভাই-বোন, সন্তান বা আপনজনকে হারাতে হবে না, আপনারা সেখানে নির্বিঘ্নে চলতে পারবেন। সেই ব্যবস্থাই আমরা করে দিয়েছি।’

‘৭৫-এ বাবা, মা, ভাইদের হারানোর পর ৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এক রকম জোর করেই নির্বাসিত জীবন থেকে তার দেশে ফিরে আসার কথা স্মরণ করে বলেন, নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে ফিরে এসেছিলাম। তখন সমগ্র বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি।’

সে সময় শরীয়তপুরে আসার স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘লঞ্চে করে আসার পর লঞ্চ নষ্ট হয়ে গেলে নৌকায় করে প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়েছি, কাদাপানিতে নেমেছি, মিটিং করেছি, আজ শরীয়তপুরের চেহারা পাল্টে গেছে। কারণ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে রাস্তাঘাট, পুল, সেতু করেছে এবং সার্বিক উন্নয়ন করেছে।’

সে সময় মাদারীপুরও সেই লঞ্চে যেতে হতো এবং গোপালগঞ্জ যেতে ঢাকা থেকে ২২ ঘণ্টা সময় লাগত এবং এসব এলাকা অত্যন্ত দুর্গম ছিল। তবে এসব এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়নসহ সরকার শিকারপুর, দোয়ারিকা এবং গাবখান সেতু করে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি সবাইকে টিকা গ্রহণের এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলারও পরামর্শ দেন। পাশাপাশি, দেশের এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ ও সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের সঞ্চালনায় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী স্বাগত বক্তব্য দেন। আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. এম আবদুুর রাজ্জাক, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুুর রহমান ও শাহজাহান খান, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন প্রমুখ। মঞ্চে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে এবং অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডারবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারারপারসন সায়মা ওয়াজেদ।

সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে প্রমত্তা পদ্মার বুকে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে পদ্মা সেতু : সকালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশের ‘গর্ব, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বহুল প্রতীক্ষিত সেতুটি এখন প্রমত্তা পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ পদ্মাার বুকে জ্বলে উঠেছে লাল, নীল, সবুজ, সোনালি আলো। ৪১টি স্প্যান যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি আজকে বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত। সেই সঙ্গে আমিও আনন্দিত, গর্বিত এবং উদ্বেলিত। অনেক বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে এবং ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আজকে আমরা এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছি। এই সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই সেতু দুই পাড়রর যে বন্ধন সৃষ্টি করেছে শুধু তাণ্ডই নয়। এ সেতু শুধু ইট-সিমেন্ট-স্টিল-লোহার কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয়, এ সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্যাদার প্রতীক।’ তিনি বলেন, ‘এ সেতু বাংলাদেশের জনগণের। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা, সহনশীলতা আর আমাদের প্রত্যয় এবং এই জেদ যে, এই সেতু আমরা তৈরি করবই। যদিও ষড়যন্ত্রের কারণে এ সেতুর নির্মাণ দুই বছর বিলম্বিত হয়। কিন্তু আমরা কখনো হতোদ্যম হইনি, হতাশায় ভুগিনি, আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলেছি এবং শেষ পর্যন্ত সব অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর পথে যাত্রা করতে সক্ষম হয়েছি। জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সেই অমোঘ মন্ত্র কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না-এর পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ দাবায়া রাখতে পারেনি, আমরা বিজয়ী হয়েছি।’ জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তার এবং তার সরকারের পথচলা উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ‘তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আজকে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।’

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম পদ্মা সেতুর নির্মাণবিষয়ক সূচনা বক্তৃতা করেন। তিনি প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম, উপপরিচালক কামরুজ্জামান, প্রজেক্ট ম্যানেজার অ্যান্ড সুপারভিশন কনসাল্ট্যান্ট ররার্ট জন এভিসসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের সঙ্গে অনুষ্ঠানে পরিচয় করিয়ে দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পকলা একাডেমি নির্মিত দেশের বরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে থিম সংগ পরিবেশিত হয়।

অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতুর ওপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট, সুভ্যেনির শিট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর এবং ১০০ টাকা মূল্যের স্মারক নোট অবমুক্ত করেন। পদ্মা সেতুর নির্মাণকারক কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি পদ্মা সেতুর একটি রেপ্লিকাও উপহার দেওয়া হয়। নির্মাণ-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ফটো সেশনেও অংশগ্রহণ করেন তিনি। এরপরই প্রধানমন্ত্রী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে টোল দিয়ে সেতুর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করেন এবং মোনাজাতে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং বাংলাদেশের অটিজম আন্দোলনের পথিকৃৎ সায়মা ওয়াজেদ এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার গাড়ি বহর নিয়ে সেতু অতিক্রম করার সময় সেতুর মাঝ বরাবর নেমে সেতু এবং প্রমত্তা পদ্মার উত্তাল তরঙ্গ প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় তিনি বিমানবাহিনীর মনোজ্ঞ ডিসপ্লেও উপভোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী এরপর পদ্মা সেতু পার হয়ে জাজিরা প্রান্তে উপস্থিত হন এবং সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করেন ও মোনাজাতে অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী তার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ভাষণে বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে কোনো আপস করা হয়নি। এ সেতু নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ দিয়ে, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে। পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে। পদ্মা সেতুর পাইল বা মাটির গভীরে বসানো ভিত্তি এখন পর্যন্ত বিশ্বে গভীরতম। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর পর্যন্ত এ সেতুর পাইল বসানো হয়েছে। ভূমিকম্প প্রতিরোধ বিবেচনায় ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। এ রকম আরো বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে এ সেতুর নির্মাণ পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে প্রকৌশলবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে- এটা নিশ্চিত। কারণ, এটা একটা আশ্চর্য সৃষ্টি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ বিশাল কর্মযজ্ঞ থেকে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছেন আমাদের দেশের প্রকৌশলীরা। ভবিষ্যতে নিজেরাই এ ধরনের জটিল সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণ করতে সক্ষম হব আমরা।’ তিনি বলেন, ‘সেতু নির্মাণ যেমন কঠিন ছিল, তেমনি আঁকাবাঁকা, খরস্রোতা উন্মত্ত পদ্মা নদীকে শাসনে রাখাটাও একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জও সফলভাবে মোকাবিলা করে নদীর দুই পাড়কে সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেতুর উভয় দিকে রয়েছে উন্নত ব্যবস্থাপনাসমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন সার্ভিস এরিয়া।’

সরকারপ্রধান বলেন, বহুমুখী এই সেতুর ওপরের ডেক দিয়ে যানবাহন এবং নিচের ডেক দিয়ে চলাচল করবে ট্রেন। সেতু চালু হওয়ার পর সড়ক ও রেলপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে এ অঞ্চলের মানুষের একদিকে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব হবে, অন্যদিকে অর্থনীতি হবে বেগবান। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে। আশা করা হচ্ছে, এ সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক দু-তিন শতাংশের বেশি হারে অবদান রাখবে এবং এর ফলে দারিদ্র্য নিরসন হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। ফলে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগের একটা বড় লিংক। তাই, আঞ্চলিক বাণিজ্যে এই সেতুর ভূমিকা অপরিসীম। তা ছাড়া, পদ্মার দুপাড়ে পর্যটনশিল্পেরও ব্যাপক প্রসার ঘটবে।

পাশাপাশি, এ বছরের শেষ নাগাদ চালু হবে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং ঢাকায় মেট্রোরেল। ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু হবে। ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সেটিও ২০২৩ নাগাদ চালু হবে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিবিশেষের ষড়যন্ত্রে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধে বিশ্বব্যাংকের পদক্ষেপ এবং তাকে, তার পরিবারের সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দেওয়ার অপচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তা মোকাবিলার ইতিবৃত্তও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাপর্যায়ে চক্রান্তকারীদের মিথ্যা ষড়যন্ত্রের কারণে আমার পরিবারের সদস্য ছোটবোন শেখ রেহানা, আমার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ, রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, আমার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক যোগাযোগ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ কয়েকজন সহকর্মী চরম মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন। আমি তাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাদের রুহের মাগফিরাত এবং আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

তিনি এ সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ পরামর্শক, ঠিকাদার, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, শ্রমিক, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি দেশবসীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ জনগণই আমার সাহসের ঠিকানা, এ জনগণকে আমি স্যালুট জানাই। এ সময় তিনি পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’ তিনি বলেন, ‘তাদের হয়তো চিন্তাচেতনার দৈনতা রয়েছে। আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। আগামীতে তাদের দেশপ্রেম জাগ্রত হবে এবং দেশের মানুষের প্রতি তারা আরো দায়িত্বশীল হবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close