গাজী শাহনেওয়াজ

  ০৫ ডিসেম্বর, ২০২১

ডেল্টার চেয়েও দ্বিগুণ ক্ষতিকর ‘ওমিক্রন’

নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) নতুন ধরন ওমিক্রন ডেল্টার চেয়েও দ্বিগুণ ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। কিন্তু ওমিক্রন থেকে অ্যান্টিবডি থাকা মানুষটিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ দুই ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিও এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। তবে এই আতঙ্ক থেকে সুরক্ষার একটাই পথ সতর্কতা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, কিছুক্ষণ পর হাত ধোয়া, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিতে হবে। কারণ মানুষের কথা ও হাসির মাধ্যমেও এটা ছড়াতে পারে।

এদিকে, গত চার দিনে দক্ষিণ আফ্রিকায় কোভিড রোগী বেড়েছে চার গুণ। যাদের প্রায় সবাই ওমক্রিনে আক্রান্ত। গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে শনাক্তের সংখ্যা ১৬০৫৫ জন। খবর ন্যাশনাল ইনস্টিটিটিউ ফর কমিউনিকেবল ডিজিজের (এনআইসিডি)। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এটা নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ড. স্বামী নাথন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ওমিক্রন উচ্চ সংক্রমণশীল ভ্যারিয়েন্ট। সাউথ আফ্রকিায় এটি যে হারে ছড়াচ্ছে তাতে ধারণা করা যায় এটিই সবচেয়ে প্রভাবশালী।

বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের একটি সাইড ইভেন্ট উদ্বোধনকালে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুুল মোমেন বলেছেন, ওমিক্রন নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সজাগ আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আশপাশের দেশগুলোসহ সাতটি দেশ থেকে প্রবাসীদের আসতে আমরা নিরুৎসাহিত করছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. মজাহেরুল হক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, করোনার অন্য ভ্যারিয়েন্ট আমরা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম, এটাও সেভাবে করতে হবে। এজন্য করোনার টিকা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাহলে এটা ঠেকানো সম্ভব। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাপসপাতালের চেয়ারম্যান এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, করোনাভাইরাসের যত ভ্যারিয়েন্ট এ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ওমিক্রমই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর। এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার ৩টি কারণ রয়েছে। এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার হার দ্বিগুণেরও বেশি। এরই মধ্যে যাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল; সেটিকে দুর্বল করে ওমিক্রম ঢুকে পড়তে পারে এবং নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া টিকা দেওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে সুরক্ষা তৈরি হচ্ছে তা আংশিক বা পুরোপুরি অকার্যকর করতে পারে। এই তিনটি বিষয়ের কারণে পৃথিবীর মানুষ উদ্বিগ্ন। এখন পর্যন্ত ৪০টির মতো দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটি। আমাদের পাশের দেশ ভারত, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও জাপানে নতুন এ ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়েছে। এসব দেশের সঙ্গে আমাদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে; এটাও আতঙ্কের কারণ। এটা প্রতিরোধের জন্য আমাদের দুই ধরনের কাজ করতে হবে, এর মধ্যে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যারাই আসবে অবশ্যই তাদের দুই ডোজ টিকা নেওয়া থাকতে হবে এবং করোনা পরীক্ষার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাদের আরটিপিসিআর টেস্ট নেগিটিভ থাকা নিশ্চিত করতে হবে। এটা করার পরও যাদের শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ রয়েছে জ্বর-সর্দি ও কাশি তাদের প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং দিলেও দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে।

ডা. লেলিন আরো বলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে যেসব নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসেছেন তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। পাশাপাশি তাদের নজরদারিতে রাখতে হবে। তাদের মধ্যে করোনার কোনো লক্ষণ দেখা গেছে কি না সেটা বের করতে হবে। কারো মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখলে তার জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষা করাতে হবে। সম্প্রতি যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদেরও জিনোম সিকোয়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানায় মানুষকে নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য সরকারকে ব্যাপকভাবে প্রচারণা শুরু করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসা বলেন, করোনার টিকার আওতা বাড়াতে হবে। কারণ এখন পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ এবং ৩৭ শতাংশকে এক ডোজ টিকা দিতে পেরেছি। অতি দ্রুত দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকার আওতায় আনা দরকার। আর ৬০-এর ওপরে যাদের বয়স তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। এই কাজটির পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের ওপরে বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওমিক্রন ভাইরাসের যে সতর্কতা মানার আহ্বান জানাচ্ছে সেটা করা সম্ভব না হলে যেকোনো সময় ওমিক্রন ভাইরাস দেশে সংক্রমিত হয়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

করোনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মানিক লাল আইচ লিটু প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ওমিক্রন বিপজ্জনক কিছু না। এমনকি এটাতে শরীরের তেমন ক্ষতি হয় না। এ ছাড়া মানুষের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও গন্ধ চলে যায় না, স্বাদ অটুট থাকে এবং কাশি হয় না। কিন্তু দ্রুত ছড়ায়; যার কারণে এতো আতঙ্কিত বিশ্ব। কারণ এর উপসর্গের মধ্যে নাকে যেটা আক্রান্ত হয় যেমন নাইরো ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গা মেজ মেজ করে, (মাসল প্লেইন) হালকা কাশি হয় ও জয়েন্ট পেইন হয়। এতে অক্সিজেন লাগে না। তবে এটার সবচেয়ে বড় সমস্যা অন্য যেকোনো ভ্যারিয়েন্ট থেকে এটি অধিক সংক্রমিত ভাইরাস। কেননা ডেল্টাতে ৫টির মতো মিউটেশন হলেও এটাতে হয়েছে ৩০টির মতো। এটা কাশি ছাড়াও ছড়াতে পারে মানুষের কথা বলা ও হাসির মাধ্যমে। ফলে এটা একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। কিন্তু ক্ষতি করার ক্ষমতা কম। তাই এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়াটা অমূলক। তাই করোনা থেকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা এবং টিকা নিতে হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close