শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

  ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১

বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুট

কমসংখ্যক ফেরিতে পারাপারে দুর্ভোগ

মাত্র চারটি ফেরিতে ১০ ঘণ্টা সার্ভিস দিয়ে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া নৌরুটে প্রতিদিন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শত শত গাড়ির কম অংশই পারাপার হতে পারছে। এতে পদ্মা নদী পার হতে না পেরে অনেক গাড়ি ফিরে যাচ্ছে। অনেক গাড়ি আটকা পড়ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে। এছাড়া ট্রাকের পচনশীল পণ্য নষ্ট হচ্ছে। অপরদিকে ঘাটের অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিরিয়াল বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, দূরবর্তী জেলা থেকে আসা ছোট-বড় যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষা করে বিকালে যখন ফেরিতে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন বিকল্প নৌরুটে যাওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। রাতে ঘাটের টার্মিনালে থাকতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে।

বিআইডব্লিউটিসির বাংলাবাজার ঘাট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বর্ষা মৌসুমে স্রোতের তীব্রতার কারণে পদ্মাসেতুর পিলারে একাধিকবার ফেরির ধাক্কা লাগে। এরপর থেকেই ফেরি চলাচল ব্যাহত হতে থাকে। দুর্ঘটনা এড়াতে গত ১৮ আগস্ট ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এরপর টানা ৪৭ দিন বন্ধ থাকার পর গত ৫ অক্টোবর সীমিত আকারে ফেরি চালু হয়। পরে মাত্র ৬ দিন চলার পর স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে আবারো ফেরি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। এ সময় টানা ২৮ দিন বন্ধ থাকার পর গত ৮ নভেম্বর থেকে ফের ফেরি চালু হয় বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটে। তবে সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত (রোকেয়া, কুঞ্জলতা, কদম ও সুফিয়া কামাল) নামে চারটি ফেরি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারী যানবাহন পারাপার বন্ধ রেখে শুধু হালকা যানবাহন পার করা হয়।

দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলা থেকে অসংখ্য ছোট যানবাহন ঘাটে এলেও ফেরি স্বল্পতার কারণে পর্যাপ্ত সংখ্যক যানবাহন পারাপার হতে না পেরে ফিরে যাচ্ছে। এসব যানবাহনের সঙ্গে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকেও ফিরে যেতে দেখা যায়। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ছুটতে হচ্ছে তাদের।

গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ঘাটে সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনা, বরিশাল, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত ঘাটে ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাননি। অনেকে বলছেন, ‘কিছুক্ষণ পর ফেরি চলাচল বন্ধ হবে। মনে হয় না আজ পার হতে পারব।’

বাংলাবাজার ঘাটে এসে পার হতে না পেরে বিকল্প রুটে ফিরে যেতে জ্বালানি খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পার হতে না পেরে চরম ভোগান্তি আর কষ্ট নিয়ে ফিরে যান।’

এদিকে বাংলাবাজার ঘাট এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কিছু যানবাহনকে ফেরিতে উঠার সুযোগ করে দেয় বলেও অভিযোগ করছেন কয়েকটি যানবাহনের চালক। সে ক্ষেত্রে সিরিয়াল ভেঙে পেছনের গাড়িও ফেরিতে ওঠানো হয় বলে অভিযোগ তাদের।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে বাংলাবাজার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) মো. জামাল উদ্দিন।

অন্যদিকে, ভিআইপিদের যাঁতাকলে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে আটকে থাকতে হচ্ছে সাধারণ ট্রাক, পিকআপ ও মাইক্রোবাসচালকদের। দেখা যায়, অনেক ভিআইপি তাদের লোকজনকে পার করার জন্য ঘাট এলাকায় কর্তব্যরত পুলিশ ও বিআইডব্লি­উটিসির কর্মকর্তাদের মেসেজ দিয়ে তাদের আত্মীয়স্বজনদের পার করে নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনেকে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও ফেরিতে উঠতে পারছে না।

বাংলাবাজার ঘাটে সিরিয়ালে থাকা একাধিক চালক জানান, সারা দিনে সিরিয়ালে থাকা অনেকে বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকে গাড়িতে উঠতে না পেরে আবার ফেরত চলে যাচ্ছে।

জাহাঙ্গীর নামে শরীয়তপুর থেকে আসা এক পিকআপচালক বলেন, সকাল ৯টায় ঘাটে এসেছি, এখন বিকাল ৩টা বাজে। ভিআইপিদের গাড়িগুলো ছেড়ে যাচ্ছে। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি ৬ ঘণ্টা ধরে।

রোমান নামে গোপালগঞ্জ থেকে আসা এক প্রাইভেট কারচালক জানান, গাড়িতে ছোট তিনটি বাচ্চাসহ স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। এক বাচ্চা অসুস্থ। এখানে যেভাবে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, এতে বাচ্চাটি আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের লাইন থেকে ২২টি গাড়ি গেছে- এরা সব নাকি ভিআইপি। অনেকে ‘ম্যানেজ’ করে ফেরিতে উঠে যাচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিসির বাংলাবাজার ঘাটের সহ-ব্যবস্থাপক সামসুল আবেদিন বলেন, ‘এই নৌরুটে ফেরি সংখ্যা এবং সময় না বাড়ানো জরুরি। তা নাহলে দুর্ভোগ শেষ হবে না। এত কম ফেরি ও কম সময়ে যাত্রীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। প্রতিদিন শতাধিক যানবাহন ফেরিতে উঠতে ব্যর্থ হয়। শত শত গাড়ির ভিড় থাকে ঘাটে। ফেরিতে উঠার রাস্তা গাড়ি দিয়ে ব্ল­ক হয়ে যায়। জরুরি অ্যাম্বুলেন্সও তখন ফেরিতে উঠানোর সুযোগ থাকে না।

তিনি আরো বলেন, ফেরির সংখ্যা এবং রাতে চলাচল শুরু না হলে এই দুর্ভোগ আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। ফেরি চলাচলে সময় এবং সংখ্যা বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। হবে কি না তাও জানা নেই। তবে ঊর্ধŸতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বিষয়টি।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close