নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১

মুক্তির পদচিহ্ন দুয়ারে

আজ ৪ ডিসেম্বর। বিজয়ের মাস। কুয়াশা-ঘেরা কনকনে শীত সারা দেশে। ১৯৭১ সালের এই দিনে সমগ্র বাংলা উত্তাল হয়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। পুরো একাত্তরের মতো ডিসেম্বরের প্রতিটি দিনই ছিল ঘটনাবহুল। মুক্তিযুদ্ধে ডিসেম্বরসহ পুরো ৯ মাস ছিল প্রচ- উত্তেজনাময়। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও বাঙালির স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্যোদয়ের ভিত্তি সূচিত হয়েছিল বেশ আগেই। বাংলার মানুষ ঋতুকে অগ্রাহ্য করে মুক্তির জন্য তুমুল যুদ্ধ শুরু করে, বিজয়ের দুয়ারে এঁকে দিয় পদচিহ্ন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের শোষণ এবং শাসন অব্যাহত রাখতে, মুক্তিকামী বাংলার মানুষকে দমিয়ে রাখতে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন চালিয়েছে। ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনী নিজেদের নিশ্চিত পরাজয়কে এড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ধরনা ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। কিন্তু প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো প্রদানে, তাদের সব কুটিল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়। ৪ ডিসেম্বরে থেকে এক ভিন্ন মাত্রা পেতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ। এদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের এইদিন দখলমুক্ত হয় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, দামুড়হুদা, জীবননগর, বকশীগঞ্জ, কানাইঘাট, কুমিল্লার দেবীদ্বার, জামালপুরের ধানুয়াকামালপুর, লক্ষ্মীপুরসহ কয়েকটি এলাকা।

উত্তর রণাঙ্গনের ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনা অনুসারে ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা কামালপুর ঘাঁটি অবরোধ করেন। দশ দিনব্যাপী প্রচ- এই যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় দুর্গে অবরুদ্ধ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের গ্যারিসন কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান মালিক খানসহ ১৬২ পাকিস্তানি সৈন্য যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। কামালপুর মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই সূচিত হয় শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ ঢাকা বিজয়ের পথ। এ যুদ্ধে শহীদ হন ১৯৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে, একজন ক্যাপ্টেনসহ পাকিস্তানি বাহিনীর ২২০ জন সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন জোর দিয়ে বলেন, এই যুদ্ধ ভারতের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধ হবে। জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, পাকিস্তানের বন্ধুরা তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। তবে তিনি কোনো দেশের নাম বলেননি।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া উর্দুতে বলেন, ‘আমরা আমাদের সম্মানের জন্য লড়াই করছি। আমাদের বিশেষ এই কাজে ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন।’

এদিকে, যৌথবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এবং ১ নম্বর সেক্টর ক্যাপ্টেন মাহফুজ পশ্চিম অঞ্চল থেকে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়ে পূর্বাঞ্চলের দিকে এগোতে থাকেন। তারা পাকিস্তানিদের বিভ্রান্ত করতে সম্মুখভাগের ক্যাম্পগুলোর পাশঘেঁষে অতিক্রম করেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে ভারতীয় জঙ্গি বিমানগুলো বিভিন্ন পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায়। ঢাকা ছিল পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর মূল ঘাঁটি। পাকিস্তানিদের বেশির ভাগ যুদ্ধবিমানগুলো ঢাকায় ছিল।

প্রেসিডন্ট ইয়াহিয়া বেতারে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তান যথেষ্ট সহ্য করেছে। আর নয়। পাকিস্তানিরা ‘পাকিস্তানের মাটিতে’ ভারতীয় বাহিনীকে শুধু আক্রমণ করবে না বরং ভারতের সীমান্তেও আঘাত করবে।

তথ্যসূত্র : হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র (১-১৫ খণ্ড) ও মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সংকলিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close