মিজান রহমান

  ২৮ অক্টোবর, ২০২১

নিয়মের মধ্যে আসছে ওটিটি প্ল্যাটফরম

ওভার-দ্য টপ (ওটিটি) একটি স্ট্রিমিং মিডিয়া পরিষেবা; যা সরাসরি দর্শকদের কাছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। দেশে এই ওটিটি প্ল্যাটফরমের ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। এ প্ল্যাটফরমে প্রচারিত কনটেন্ট একদিকে যেমন প্রশংসা পাচ্ছে, অন্যদিকে কিছু কনটেন্ট নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। প্ল্যাটফরম যাতে নিয়মনীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সে লক্ষ্যে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে নীতিমালার প্রাথমিক খসড়া সম্পন্ন হয়েছে। শিগগির এটি চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এই প্ল্যাটফরম থেকে অশ্লীলতা রোধ ও রাজস্ব আদায় সংক্রান্তসহ কয়েকটি ইস্যুতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি গাইডলাইন তৈরি করছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এরই মধ্যে গাইডলাইনের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আগামী ১ নভেম্বর সেই খসড়া গাইডলাইন আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ওটিটি প্ল্যাটফরমের কার্যক্রম তদারকির জন্য ২০২০ সালে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। খসড়া তৈরির জন্য ওই বছরের ডিসেম্বরে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিজান উল আলমকে সভাপতি করে ১৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নীতিমালা তৈরির সঙ্গে যুক্ত আছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রচার) খাদিজা বেগম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নীতিমালা মোটামুটি তৈরি হয়েছে, তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একটি নীতিমালা করতে অনেকগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়। অনেক ধরনের পরামর্শ নিতে হয়। সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে, বিভিন্ন নিয়মকানুন পর্যালোচনা করেই নীতিমালা তৈরি করতে হয়। চূড়ান্ত হওয়ার আগে দেখা যায়, সংশোধনের জন্য মতামত আসে। তখন সেগুলো সংশোধন করতে হয়। আমরা সবকিছু মাথায় নিয়ে নীতিমালা চূড়ান্তের জন্য কাজ করছি।’

কবে নাগাদ এটি চূড়ান্ত করা হবে-জানতে চাইলে খাদিজা বেগম বলেন, ‘এটি এখনই বলা যাচ্ছে না। যত দ্রুত সম্ভব নীতিমালা চূড়ান্ত করা যায়, সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ ‘রেগুলেটরি জব’; নীতি, নীতিমালা তৈরি করে এই গণমাধ্যমের ক্রমবিকাশকে এগিয়ে নেওয়া। ওটিটি প্ল্যাটফরম এটি একটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। কিন্তু ওটিটি প্ল্যাটফরমে সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজ বা কোনো কনটেন্ট রিলিজ করতে হলে এখনো অনুমোদনের ব্যবস্থা নেই।’

মন্ত্রী আরো বলেন, আমি সাম্প্রতিক ভারত সফরে সেখানকার তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। তারা কীভাবে দেখভাল করছে সে বিষয়ে আলাপ করেছি। তারা গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ নিয়ে প্রজ্ঞাপন আকারে একটি নীতিমালা জারি করেছে, সেখান থেকে পরিচালিত সব ওটিটি প্ল্যাটফরমকে এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সেই নীতিমালার ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এরই মধ্যে নীতিমালার প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছি। সেই নীতিমালা খুব সহসা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করতে পারব বলে আশা করছি।’

ওটিটি প্ল্যাটফরমের কনটেন্ট এতো বিস্তৃত এবং ব্যাপক যে, সেন্সর বোর্ডের মাধ্যমে সেন্সর করা দুরূহ কাজ উল্লেখ করে ড. হাছান বলেন, ‘কারণ বছরে ৫০টি বা ১০০টি সিনেমা রিলিজ হয়, সেটি সেন্সর করা সহজ। তবে ওটিটির হাজার কনটেন্ট সেন্সর করা সহজ কাজ নয়। সে কারণে ভারতসহ অন্যান্য দেশে যেভাবে করা হচ্ছে সেভাবে আমরা একটি নীতিমালা খসড়া তৈরি করেছি যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করব। এটা এজন্য যাতে করে আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা সমাজ ও মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, বিজাতীয় সংস্কৃতি উৎসাহিত হয় কিম্বা আমাদের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে, এমন কোনো কনটেন্ট সেখানে না যায়।’

এদিকে এই প্ল্যাটফরম থেকে অশ্লীলতা রোধ ও রাজস্ব আদায় সংক্রান্তসহ কয়েকটি ইস্যুতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি গাইডলাইন তৈরি করছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। দেশে অসংখ্য বিদেশি ওটিটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরম যেমন- নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্স, হইচই, অ্যামাজন প্রাইম জি-ফাইভ ইত্যাদি রয়েছে। আর দেশিগুলোর মধ্যে আছে বঙ্গ, বিঞ্জ, চরকি, বাংলাফ্লেক্স, বায়োস্কোপ, সিনেম্যাটিক, আড্ডাটাইমস, টফি ইত্যাদি। দেশিগুলোতে কী ধরনের কনটেন্ট আছে তা নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি করা এবং সেসব থেকে রাজস্ব আয়েরও পরিকল্পনায় নীতিমালা তৈরির জন্য বিটিআরসি আট সদস্যের কমিটি করেছে। এতে বিটিআরসির কমিশনার (এলএল) আবু সৈয়দ দিলজার হোসেনকে আহ্বায়ক এবং উপ-পরিচালক (আইন) পদবির একজনকে সদস্য সচিব করা হয়।

এছাড়া সদস্য করা হয়েছে ছয়জনকে। সদস্যরা হলেন বিটিআরসির মহাপরিচালক (সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস), পরিচালক (আইন), পরিচালক (সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস), তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি (উপসচিবের নিচে নয়), অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগের একজন প্রতিনিধি (উপপরিচালকের নিচে নয়) এবং বিটিআরসির একজন আইন পরামর্শক।

এই কমিটি ওটিটি নির্ভর বিভিন্ন ওয়েব প্ল্যাটফরমে অনৈতিক ও আপত্তিকর ভিডিও কনটেন্ট পরিবেশন তদারকি এবং শনাক্তকরণের বিষয়ে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ, ওটিটি নির্ভর বিভিন্ন ওয়েব প্ল্যাটফরমে অনৈতিক ও আপত্তিকর ভিডিও কনটেন্ট পরিবেশন রোধ বিষয়ে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ, ওটিটি নির্ভর বিভিন্ন ওয়েব প্ল্যাটফরম থেকে রাজস্ব আদায় বিষয়ে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে কাজ করছে। একই সঙ্গে খসড়া গাইডলাইন তৈরির কাজও করছে কমিটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন বলেন, ‘আগামী ১ নভেম্বর কমপ্লায়েন্স জানানোর জন্য কোর্টে উপস্থাপন করা হবে। এখন খসড়া তৈরির কাজ চলছে। চূড়ান্ত খসড়া কোর্টে উপস্থাপন করা হবে। খসড়া তৈরির আগে পার্শ্ববর্তীদের ভারত, সিঙ্গাপুর যে গাইডলাইন তৈরি করেছে সেগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আবু সৈয়দ দিলজার আরো বলেন, ‘খসড়া চূড়ান্ত করার আগে আমরা ব্রডকাস্ট করার নিয়মটি দেখব। এছাড়া সংযোগ নিয়ন্ত্রণ তথা নেটওয়ার্কে কীভাবে চলে সেটাও দেখা হবে। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামতও শোনা হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মতামতও জানতে চাওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশি ওয়েব সিরিজের বিতর্কিত অংশ বাদ দিতে সংশ্লিষ্টদের একটি আইনি নোটিস দিয়েছিলেন আইনজীবী তানভীর আহমেদ। তবে সে নোটিসের কোনো জবাব না পেয়ে একই বছরের ১২ জুলাই হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।

বিনোদননির্ভর ও অন্যান্য অ্যাপসে অনৈতিক ও আপত্তিকর ভিডিও কনটেন্ট পরিবেশন তদারকি এবং শনাক্তকরণের বিষয়ে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ সহজ। তবে যোগাযোগ নির্ভর অ্যাপে সহজ হবে না বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। ভাইবার, মেসেঞ্জার, ইমো, উইচ্যাট, লাইনের মতো যোগাযোগ নির্ভর ওটিটি সার্ভিস এ দেশ থেকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ আয় করলেও সরকারের প্রাপ্তি শূন্য। বিটিআরসি গঠিত কমিটি এসব বিষয়ে দেখভাল, খসড়া নীতিমালা তৈরি ইত্যাদি কাজ করবে বলে জানা গেছে।

দেশের আইপি-টিএসপি অপারেটরগুলো পরিচালিত দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফরমের (আলাপ, ব্রিলিয়ান্ট, আম্বার আইটি ইত্যাদি) জন্য একটি গাইডলাইন করছে। দেশীয় ওটিটির ট্যারিফ অনুমোদনের জন্য বর্তমানে সেটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে রয়েছে। সেই গাইডলাইনের ‘জেনারেল প্রভিশন’ অংশের ৭ দশমিক ৫ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে-বিটিআরসি একই পরিপ্রেক্ষিতে (দেশি ওটিটি সেবার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন) বিদেশি ওটিটি পরিষেবার জন্য নির্দেশনা বা নির্দেশিকাও জারি করবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close