নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৪ অক্টোবর, ২০২১

সামান্য দোকানদার থেকে ভয়ংকর মানব পাচারকারী

ঢাকার বাড্ডায় ওভারসিজ ব্যবসার ৩টি অবৈধ কার্যালয়

মেহেরপুরের গাংনী থানার কামন্দী গ্রামে মুদি দোকানদার ছিল এসএসসি পাস সাইফুল ইসলাম ওরফে টুটুল। মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে হাতিয়ে নিত লাখ লাখ টাকা। প্রতারণার মাধ্যমে রাজধানীর বাড্ডার লিংক রোডে গড়ে তুলেছে তিনটি ওভারসিজ। এগুলোর বৈধ লাইসেন্স নেই বলে জানা গেছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলামসহ ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব-৪-এর একটি আভিযানিক দল বাড্ডার লিংক রোডের টুটুল ওভারসিজ, লিমন ওভারসিজ ও লয়াল ওভারসিজে অভিযান চালিয়ে ৪ জন ভিকটিম (২ জন পুরুষ ও ২ জন নারী) এবং গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ১০টি পাসপোর্ট, ৭টি ফাইল, ৪টি সিল, ১৭টি মুঠোফোন ৫টি নিবন্ধন খাতা, ৩টি সিম কার্ড, ৪টি ব্যাংকের চেক বই, ২টি কম্পিউটার এবং নগদ ১০ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করে।

গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তিরা হলো মো. তৈয়ব আলী (৪৫), শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন ওরফে লিমন (৩৮), মারুফ হাসান (৩৭), জাহাঙ্গীর আলম (৩৮), লালটু ইসলাম (২৮), আলামিন হোসাইন (৩০) ও আবদুল্লাহ আল মামুন (৫৪)।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে ব্যাটালিয়ন-৪-এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। তিনি জানান, মুদি দোকানি সাইফুল ইসলাম টুটুল) মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসত। অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার লোভে ধীরে ধীরে মানব পাচারকারী কোনো একটি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ও চক্রের দালাল হিসেবে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করতে থাকে। পরে নিজেই রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় প্রতারণামূলকভাবে ‘টুটুল ওভারসিজ, লিমন ওভারসিজ ও লয়াল ওভারসিজ’ নামে ৩টি এজেন্সি অফিস খুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার ও শিক্ষিত বহু নারী-পুরুষকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় টুটুল।

টুটুলের এই প্রতারণার কাজে অন্যতম সহযোগী আবু তৈয়ব। সে কোনো পড়াশোনা জানে না। চায়ের দোকান ছিল তার। টুটুলের প্ররোচনায় মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ও বহু লোককে প্রতারণামূলকভাবে বিদেশে পাঠানো এবং দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নামে টাকাণ্ডপয়সা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

তৈয়ব নিজেকে দেশের একটি এয়ারলাইরসের ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে চাকরি এবং দেশের নামি-দামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার নাম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকজন ভিকটিমকে চাকরি দেওয়ার ভুয়া নিয়োগপত্রও দিয়েছে।

এ ছাড়া গ্রেপ্তার বাকিরা মাঠপর্যায়ে টার্গেট সংগ্রহ, প্রার্থীর পাসপোর্টের ব্যবস্থা, কথিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, টাকা সংগ্রহ, প্রাথমিক মেডিকেল সম্পূর্ণ করাসহ অন্যান্য কাজে সহায়তা করত। টুটুল ও তৈয়বের নির্দেশে এই চক্র মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করত। তাদের কয়েকটি টিম দেশজুড়ে কাজ করে।

র‌্যাব বলছে, চক্রের কয়েকজন সদস্য অফিস স্টাফ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভিকটিমকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করত। এতে ভিকটিমদের মনে আর কোনো সন্দেহ থাকত না। পাসপোর্ট অফিসের দালালের সঙ্গেও সখ্য ছিল চক্রের সদস্যদের। কথিত মেডিকেল টেস্ট শেষে নারী ভিকটিমদের বাসাবাড়িতে বিক্রি এবং পুরুষ ভিকটিমদের অমানবিক কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদ, জর্ডান ও লেবাননে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করত তারা। ভিকটিমরা বিদেশে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারত না। যাদের বিদেশে পাঠানো সম্ভব হতো না তারা টাকা ফেরতে যোগাযোগ করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো।

বৈধতা না থাকার পরও কীভাবে মানব পাচার করেছিল টুটুল-তৈয়ব চক্র জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, তাদের ৩টি ওভারসিজ প্রতিষ্ঠানের বৈধতা না থাকায় বৈধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মানুষকে পাচার করেছে। এ ছাড়া শতাধিক মানুষকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মতো ভুক্তভোগী র‌্যাবে যোগাযোগ করেছে। প্রতারিত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close