প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ১১ অক্টোবর, ২০২১

দক্ষিণাঞ্চলেই হবে দ্বিতীয় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট

পরমাণু চুল্লিপাত্র স্থাপন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎকে দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি আখ্যায়িত করে বলেছেন, তার সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলেই আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করবে। তিনি বলেন, ‘আরেকটি পাওয়ার প্লান্ট আমরা করব। আমার ইচ্ছা পদ্মার ওপারেই অর্থাৎ দক্ষিণাঞ্চলে করার। আমরা জায়গা খুঁজছি। এখানে যদি আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট করতে পারি তাহলে বিদ্যুতের জন্য আমাদের আর অসুবিধা হবে না।’

প্রধানমন্ত্রী পাবনার ঈশ^রদী উপজেলার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল যন্ত্র রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল (আরএনপিপি-পরমাণু চুল্লিপাত্র) স্থাপনের কাজের উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন। তিনি গতকাল দুপুর পৌনে ১২টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করেন। ‘আর যেন কোনো শকুনির থাবা না পড়ে বাংলাদেশের ওপর।’ এই উন্নতি এবং অগ্রগতি যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায় সেজন্যও সবাইকে সতর্ক করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণে রাশিয়ার সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ ও আমরা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

তিনি বলেন, আমরা বহুমুখী বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছি এই জন্য যে, এই বিদ্যুৎ সুবিধা যাতে মানুষ পায় এবং এটা যাতে অব্যাহত থাকে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জিয়াউল হাসান স্বাগত বক্তৃতা করেন। প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. সৌকত আকবর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল যন্ত্র রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের সময় আরএনপিপি থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হন। অনুষ্ঠানে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, পাবনা সদর আসনের এমপি গোলাম ফারুক প্রিন্স, স্থানীয় এমপি বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ নুরুজ্জামান বিশ্বাসসহ জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাসহ রাশিয়ান বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পারমাণবিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা-ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (আইএইএ) গাইড লাইন অনুযায়ী এবং সংস্থাটির কড়া নজরদারির মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প (আরএনপিপি) বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।

সূত্র মতে, ইউনিট-১ এর ভৌত কাঠামোর ভেতরে রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের পারমাণবিক যন্ত্রাংশ স্থাপন সম্পন্ন হবে। এর ফলে এই ইউনিটের রিয়্যাক্টর ভবনের ভেতরের কাজ প্রায় শেষ হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকেও ১২০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে, এরই মধ্যে আমরা সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। ২০২৩ সালে আমাদের প্রথম ইউনিট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি আরো ত্বরান্বিত হবে, সেটাই আমরা বিশ্বাস করি।

তিনি বলেন, আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না ’৪১ এ উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলদেশ আমরা গড়ব। দেশ ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করবে। সে সময়ে আগামী প্রজন্ম একটি সুন্দর, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবেই সেটা উদযাপন করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের অনেক আগেই জাতির পিতা এখানে বিদ্যুতায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছিলেন এবং পাকিস্তান সরকারের কাছে তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৬১ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণসহ বেশ কিছু কাজ তখন সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার হঠাৎ করে কাজ বন্ধ করে দিয়ে প্রকল্পটি পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নিয়ে বিরাজমান বৈষম্যমূলক আচরণের পুনঃপ্রকাশ ঘটায়। আর স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালেই বঙ্গবন্ধু ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ ‘আইএইএ’র সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেন। সে সময় দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিচালক হিসেবে তার প্রয়াত স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ারও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। জাতির পিতা বেঁচে থাকলে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশ আরো আগেই নির্মাণ করতে পারত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকে উন্মুক্ত করে দেওয়াসহ ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দানের ফলে সে সময়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১৬০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট হয়। অথচ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর দেখা যায় সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নেমে গেছে। অর্থাৎ এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনও বিএনপির আমলে বৃদ্ধি করা হয় নাই বরং এখাতে অনেক দুর্নীতি, অনেক টাকা খাওয়া, এমন অনেক কিছুই পাওয়া গেছে।

সরকারপ্রধান বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর তার সরকার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ এর সঙ্গে সংগতি রেখে ‘পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান-২০১০’ প্রণয়ন করে এবং আবার রূপপুর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

‘তার সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে প্রায় ৩ থেকে ৪ স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমরা করেছি। পাশাপাশি পরিবেশদূষণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, এই রিঅ্যাক্টরের কাছে বা এর ভেতরে যারা কাজ করবেন তাদেরও অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে তেমনি পুরো এলাকাটিরও নিরাপত্তার যে প্রয়োজন তা পূরণ করা হয়েছে। সেখানে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।

প্রকল্পের শুরুতেই রাশিয়ার সঙ্গে তার সরকারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চুক্তির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে পরিবেশদূষণ আর হয় না। কারণ সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটারও খুব একটা সুযোগ থাকে না।

শেখ হাসিনা বলেন, এই রিঅ্যাক্টর বসানোর জন্য মাটি তৈরি করা থেকে নদী ড্রেজিং অর্থাৎ রাশিয়ার ভলগা থেকে পদ্মা আমরা পাড়ি দিয়েছি। কাজেই এটাও আমি মনে করি যে, ভবিষ্যৎ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আরো একটি আলোর দুয়ার খুলে গেল।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close