বদরুল আলম মজুমদার

  ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ঐক্য অটুট রাখার চ্যালেঞ্জ

সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চায় বিএনপি

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে বাঁচা-মরার লড়াই হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। দলটির শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সবাই এখন মাঠে নামার কথা বলছেন। তবে মাঠে নামার বিষয়টি উঠে এলেও সাংগঠনিকভাবে দলটি এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। আর এমন দল নিয়ে মাঠে নেমে কাক্সিক্ষত ফলও আশা করা যায় না। তাই সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চায় দলটি। সেজন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দল সাজানোর কাজ চলছে। আগে বছরের পর বছর সময় নিলেও এবার কয়েক মাসের মধ্যে দল গঠনের ৮০ শতাংশ কাজ গুছিয়ে রাখতে চায় বিএনপি।

সম্প্রতি দলের নেতাদের মূল্যায়নে এ বিষয়টি উঠে আসে। সেই বেঠকের পরই টনক নড়ে দলের হাইকমান্ডের। এখন নেতারা মনে করছেন, রাজপথে নেমে দাবি আদায়ে সফল হতে হলে শক্তিশালী সংগঠনের বিকল্প নেই। ১০-১২ বছর ধরে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা একেবারেই নাজুক। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও আজও দলকে একটি শক্ত সংগঠন হিসেবে গড়তে ব্যর্থ নীতি নির্ধারক নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দল ক্ষমতায় না থাকলেও শক্তিশালী সংগঠন গড়া যায়। সেটি আমরা করতে পারিনি বললে ভুল হবে। আসলে সরকারি দমন-পীড়ন এতটা বেশি ছিল যে, আমরা দল গঠনের লক্ষ্যে একটা সভা-সমাবেশও করতে পারিনি। তাই সবার মতামত উঠে না আসায় অনেক ক্ষেত্রে কমিটিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এই নেতা আরো বলেন, বিএনপির সব ইউনিটপর্যায়ে এত বেশি যোগ্য লোক হয়েছে, যারা প্রত্যেকে দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তাই কমিটি গঠনে একটু ভুল হলেই তা ব্যর্থ হচ্ছে। এবার আরো বেশি সতর্ক ও সজাগ আছি। এরই মধ্যে ৮০ শতাংশ কমিটির কাজ শেষ হয়েছে। বাকিগুলোও দ্রুত শেষ হবে। পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী দলের কমিটির কাজও চলছে দ্রুত গতিতে।

সিরিজ বৈঠকের আগে দলীয় কর্মপন্থা ঠিক করতে ১০ থেকে ১২ দফার একটি রূপরেখার খসড়া তৈরি করেন নীতিনির্ধারকরা। সেখানে দল শক্তিশালী করার ব্যাপারেও মতামত চাওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় প্রতিটি নেতা দলকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন। বৈঠকের আলোচনার সূত্র থেকেই একটি প্রাথমিক খসড়াও তৈরি করা হয়। তা ছাড়া অঙ্গ ও সহযোগী দল গঠনে বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় না করার জোরালো অভিযোগ আসে বৈঠকে। বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে নিয়ে এরই মধ্যে হাইকমান্ড থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ছয় দিনের ওই সিরিজ বৈঠকে নেতারা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ দলের সাংগঠনিক নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে নেতারা ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। সেগুলো হলো- দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলা, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একই প্ল্যাটফরমে আনা, পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্দোলনের ছক কষা, দীর্ঘ নয়, স্বল্প সময়ের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা, বিভেদ ভুলে দলে বন্ধন সুদৃঢ় করা, কমিটি গঠনে অনৈতিক লেনদেন বন্ধ করা, আন্দোলনমুখী নেতৃত্ব বাছাই করা, সংগঠনকে শক্তিশালী করা, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং দলের অবস্থান পরিষ্কার করা। এর বাইরেও দলের স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্যপদ পূরণের পক্ষে মতামত দিয়েছেন নেতারা।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে দলের সাংগঠনিক অবস্থাকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না। এ ছাড়া কমিটিতে স্থান পেতে নানা তদবির-লবিং করতে হয়, মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ভাঙানো, কমিটি বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দলসহ সব অঙ্গসংগঠনকে সক্রিয় রাখতে পুনর্গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়।

সূত্র আরো জানায়, চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিএনপির অঙ্গসংগঠন কৃষক দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক ও মহিলা দলের পুনর্গঠনের তোড়জোড়ও শুরু হয়েছে। এসব কমিটির শীর্ষ পদে সাবেক ছাত্রনেতাদের এনে সংগঠন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড।

এ বিষয়ে দলের দুজন নীতিনির্ধারণী ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করেই তারা রাজপথে নামার চিন্তা করছেন। তাই বিএনপি এখন সংগঠন গোছানোর বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। মহানগর কমিটির পর বিএনপি এখন দেশে যেসব জেলায় কমিটি অকার্যকর, সেগুলোতে নতুন কমিটি দেওয়ার কাজ করছে। সব মিলিয়ে আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চায় বিএনপি।

সূত্র জানায়, দেশের অধিকাংশ জেলা কমিটি নিয়ে হতাশ বিএনপি। বিশেষ করে আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে বেশি চিন্তিত দলটি। তারা নির্ধারিত সময়ে থানা-উপজেলার সবপর্যায়ের কমিটি দিতে পারেনি। আবার যেসব জেলা তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজে হাত দিয়েছে, তাদের বেশ কয়েকটির বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ পড়েছে কেন্দ্রে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলাসহ বেশ কয়েকটিতে থানা-উপজেলা-পৌরসভার কমিটি গঠনে ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসিচব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে দল পুনর্গঠনের কাজ আমরা সেভাবে করতে পারিনি। তার পরও সীমিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ মহানগর কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ চলছে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ থানা-উপজেলা-ইউনিয়নসহ তৃণমূলের সবপর্যায়ের কমিটি দ্রুত শেষ করতে চাই। এজন্য জেলা নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বলেন, থানা-উপজেলা-পৌরসভাসহ সব পর্যায়ের কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব কমিটি ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাদের দিয়ে করতে হবে। বিশেষ করে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন, দলীয় কর্মসূচিতে নিয়মিত, ভালো সংগঠক তাদের দিয়ে কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। যারা এলাকায় থাকেন না, দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় নন, তাদের কমিটিতে না রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close