মিজান রহমান

  ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

নির্বাচনমুখী রাজনীতি

বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের ধাক্কা সামলে দলে-দলে শুরু হয়েছে রাজনীতি। এরই মধ্যে সব দলই নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ঘর গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই বছরেরও বেশি বাকি থাকলে এই নির্বাচনের কৌশল কী হবে তা নিয়ে আগেভাগেই শুরু হয়েছে ভাবনা। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি কথা বলতে শুরু করছে। নড়েচড়ে বসেছে ছোট দলগুলোও। পিছিয়ে নেই বাম-প্রগতিশীল এমনকি ধর্মভিত্তিক দলগুলোও। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমনই আভাস মিলেছে।

সম্প্রতি দলীয় নেতাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে ৩টি নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। ওই সভায় উপস্থিত দলের সভাপতিম-লীর দুজন সদস্য এ তথ্য জানান। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে লিডারশিপ তৈরি, দল ও সরকার নিয়ে মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেওয়া এবং সরকারে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেশের মানুষের কাছে বেশি করে তুলে ধরা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দলীয় সভাপতি

শেখ হাসিনার নির্দেশে দ্বাদশ নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্যে আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করার কাজ শুরু হয়েছে। দলের বিভিন্ন উপ-কমিটিগুলোর সেমিনারের মাধ্যমে উঠে আসা প্রয়োজনগুলো নির্বাচনের ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। উপ-কমিটিগুলোকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন- স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আমরা কী কী অন্তর্ভুক্ত করব- তা তুলে ধরা হবে।

জানতে চাইলে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। আমাদের হাতে দুই বছরের মতো সময় আছে। এরই মধ্যে দলকে সংগঠিত করতে হবে। সর্বস্তরে নেতাকর্মীদের নির্বাচনমুখী করতে হবে।

এদিকে নির্বাচনে প্রস্তুত রয়েছে বিএনপিও। নির্বাচন সামনে রেখে দলটি একক কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা করছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করেছেন।

দলীয় নেতারা জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের সর্বস্তরের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে রাজনৈতিক কৌশল ও নীতি চূড়ান্ত করতেই এই বৈঠক হয়েছে। এতে আগামী দিনের কৌশল নিয়ে নেতারা মন খুলে আলোচনা করেছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করছেন। রাজনৈতিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।

জানতে চাইলে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপি নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় না। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন কী পদ্ধতিতে করবেন, সেটা ঠিক করতে সব দল, সংগঠন ও সমাজের নানা পেশার মানুষের সঙ্গে সংলাপ করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সংসদ প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও। চেয়ারম্যান ভাই জি এম কাদের দলকে সংগঠিত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তিন শ আসনে প্রার্থী নির্ধারণ করাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সামনের নির্বাচনে কেমন ও কীভাবে হবে, কার সঙ্গে রাজনৈতিক জোট হবে- এগুলো পরে ঠিক হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাপা চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে দলকে সংগঠিত করতে কাজ করছি। এরপর যখন নির্বাচনের সময় চলে আসবে তখন আমরা নির্বাচন নিয়ে চিন্তা করব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের প্রেসিডিয়ামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা সবগুলো আসন ধরেই প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমরা কত আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করব, সেটা নির্ভর করে সামনের নির্বাচন কীভাবে হবে। আমরা কোনপর্যায়ে যাব, কার সঙ্গে জোট করব- এসবের ওপর, এগুলো পরে ঠিক করব।

বড় দলগুলোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকরা এরই মধ্যে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরাও বসে নেই। জোটের বাইরে বাম, ডান, মধ্যপন্থা এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলোও ঘর গোছাচ্ছে। ভবিষ্যতে জোট বেঁধে নির্বাচনের ভাবনা মাথায় থাকলেও, আপাতত তারা এককভাবেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে গত রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছেন, করোনায় আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতা অনেকটাই স্তিমিত ছিল। এখন পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় জোরেশোরে দল গোছানোর কাজে হাত দেব। তিনটি নির্বাচন আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে ঐক্যবদ্ধ অংশ নিয়েছি। তবে ভবিষ্যতে কী হয় তা সময়ই বলবে। আপাতত আমরা দল গোছানোর পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি এ প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪-দলীয় জোটে আছি। জোটের প্রধান শরিক দল কী চায় তা যেমন দেখার বিষয় আছে, এজন্য অপেক্ষাও করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে।

বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে আমরা নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছি। এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ), খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি- জাগপা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (একাংশ), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এনডিপি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস লীগ, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ডেমোক্রেটিক লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (ভাসানী), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল নির্বাচন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।

দুই জোটের বাইরে বাম প্রগতিশীল ঘরানার দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে পথ চলছে। ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই এরাসহ ৯টি বাম গ্রগতিশীল ঘরানার দল বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠন করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা জোটগতভাবেই অংশ নেয়। আগামী নির্বাচনও তারা জোটগতভাবে করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ববি হাজ্জাজের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনও (এনডিএম) নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close