মিজান রহমান

  ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সমুদ্র অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে সমৃদ্ধির পথে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশের নজরকাড়া অর্জন প্রায় সব খাতেই। এবার লক্ষ্য সমুদ্রের সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণ এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল রপ্তানি করেই বছরে আয় হতে পারে এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। ফলে এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। টেকসই উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের ওপর দিচ্ছে গুরুত্ব। এরই অংশ হিসেবে সমুদ্রে (বাংলাদেশ অংশে) কী পরিমাণ মৎস্যসম্পদ, খনিজসম্পদ, নৌচলাচলসহ আরো কী ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা রয়েছে; তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে ১৯ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি সমুদ্র অর্থনীতির বিষয়ে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা দ্রুত পাঠাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সমৃদ্ধশালী এবং টেকসই সুনীল অর্থনীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১২টি কার্যকলাপ উল্লেখ করা হয়েছে; যেখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মৎস্য চাষ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মানবসম্পদ, ট্রান্সশিপমেন্ট, পর্যটন এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এ ছাড়া ২০১৭ সালে সুনীল অর্থনীতি সম্পর্কিত উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বিভাগীয় মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় সাধনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্লু ইকোনমিক সেল প্রতিষ্ঠা করা হয়। চিহ্নিত করা হয় সুনীল অর্থনীতির ২৬টি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র; যার মধ্যে মৎস্য চাষ, শিপিং, জ্বালানি, পর্যটন, উপকূলীয় সুরক্ষাব্যবস্থা এবং সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য নজরদারি।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিপুল পরিমাণ মালামাল-শুল্ক দেশের অভ্যন্তরে রাখার উদ্দেশ্যে স্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রণোদনা প্রদান করা যেতে পারে, যাতে করে তারা বিদ্যমান জাহাজের বহরের সঙ্গে আরো জাহাজ সংযুক্ত করতে পারে। এ ছাড়া সমুদ্র উপকূলীয় জাহাজ চলাচল, সমুদ্রবন্দরগুলো, যাত্রীবাহী খেয়া পারাপার সেবা, অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহন, জাহাজ প্রস্তুতকরণ এবং জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পগুলো আমাদের দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আরো গুরুত্ব বহন করতে পারে।

মৎস্যসম্পদ : বিশেষজ্ঞদের মতে, শামুক, শেলফিস, কাঁকড়া, হাঙর, অক্টোপাস এবং অন্য প্রাণী ছাড়াও শুধু মাছেরই ৫০০ প্রজাতি বিদ্যমান। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে সহজলভ্য মোট ৮ মিলিয়ন টন মাছের মধ্যে আহরণ করা হয় মাত্র ০.৭০ মিলিয়ন টন মাছ। এ ছাড়া অসংখ্য মানুষ তাদের জীবিকা এবং খাদ্যের চাহিদার জন্য যেহেতু সামুদ্রিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, তাই সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ৭১০ কিলোমিটার সুদীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের শতকরা ১৯.৪ ভাগই আসে সামুদ্রিক মৎস্য থেকে। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। পর্যটকদের গড়ে শতকরা ৮১ ভাগই কক্সবাজার ভ্রমণ করেন।

এদিকে, দেশের সমুদ্রের অভ্যন্তরেও গ্যাস মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের স্থলসীমানায় কিছু গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে; যা দেশের গ্যাসের মোট মজুদের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে। এ ছাড়া তেল, লবণ ও নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক সম্পদেও (বালু, নুড়ি ইত্যাদি) আছে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা।

এদিকে, দেশের বিশাল সাগরসীমায় কী আছে এবং সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে কীভাবে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করা যায়, তা গবেষণা করতে ২০১৭ সালে কক্সবাজারে নির্মিত হয় সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট। শুধু বঙ্গোপসাগরের তলদেশের সম্পদ গবেষণায় নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে তা কীভাবে বাড়ানো যায়; সেই প্রচেষ্টাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

বাংলাদেশের সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করা বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’র তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুধু বিদেশে রপ্তানি করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। এ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতেও পারে।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘শুধু সমুদ্র অর্থনীতিকে যদি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশে অর্থনীতিতে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। শুধু সামদ্রিক মাছ ও শৈবাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ আয় করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকও বলছে, সুনীল অর্থনীতি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নততর জীবিকা সংস্থান এবং কাজের লক্ষ্যে সামুদ্রিক প্রতিবেশের উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাছাড়া সমুদ্রসম্পদ খাদ্যের পাশাপাশি জ্বালানিও সরবরাহ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান জোবায়ের আলম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান এবং সমুদ্রসম্পদের সুরক্ষার মধ্যে টেকসই ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতির বিকাশে আরো নজর দিতে হবে। এই খাতে নতুন বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকল্পে আরো ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে। এখন মৎস্য পালন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজভাঙা, লবণ উৎপাদন এবং বন্দর সুবিধাসহ কিছুসংখ্যক সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্র উন্মোচন করা গেছে। সমুদ্রসম্পদের আরো ব্যবহার সম্ভব হলে ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে পারবে বাংলাদেশ।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close