নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৪ আগস্ট, ২০২১

বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র হয় দেশ-বিদেশে

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মরতে রাজি, তাকে কেউ মারতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন। সেটা তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না, তা কেউ পারে না। এটাই আমার বিশ্বাস।’ একই বছরে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এনবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক পল নিক্সনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি পেয়েছি কোটি কোটি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। যেদিন এই মানুষের জন্য আমার জীবন দিতে পারব, সেদিন আমার আশা পূর্ণ হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করি না।’

এই দুই বিদেশি সাংবাদিককে দেওয়া দুটি সাক্ষাৎকার শুনলে মনে হয় দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য জীবন দেওয়ার এক চরম আত্মত্যাগের আকাক্সক্ষা নিয়ে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু আন্দোলনণ্ডসংগ্রাম করেছেন বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা যখন অর্জিত হলো, তার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রাণ দিতে হলো তাকে। তিনি বিশ্বাস করতেন না, কোনো বাঙালি তাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই বাঙালিদের মধ্যে কারো কারো শরীরে বইছে মীরজাফরের রক্ত। তাই ২৩ বছরের সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীন বাংলার মাটিতে তাকে জীবন দিতে হলো সেই নব্য মীরজাফরদের হাতে। জাতির পিতার রক্তে রঞ্জিত হলো তারই স্বপ্নের সোনার বাংলা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রচিত হলো সেই বিশ্বাসঘাতকতার কালো ইতিহাস।

তাই বাঙালির জীবনের সবচেয়ে এক অন্ধকারতম দিনের নাম ১৫ আগস্ট। এক নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা। এক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিত চক্রান্তের নাম একজন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন। শুধু বাঙালির ইতিহাস নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম জঘন্যতম ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত যেই দেশ, সেই যুদ্ধের যে মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাকেই হত্যা করা হলো তার নিজের বাসভবনে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাকে হত্যা করতে সাহস পায়নি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা সেই ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিল মাত্র সাড়ে চার বছরের মাথায়, তাকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সুবিধাভোগীরা। রাষ্ট্র চলেছে ১৯৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি ভাবধারায়। জাতির পিতার স্বপ্নের দেশ লুণ্ঠিত হয়েছে এই সুবিধাভোগীদের হাতে। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল এই দীর্ঘ ২৩ বছর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে জাতির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকাণ্ডণ্ডপরবর্তী সুবিধালাভকারীদের দ্বারা। দীর্ঘ এই সময়ে বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়াও নিষিদ্ধ ছিল।

ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নামণ্ডনিশানা মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত নানা অপচেষ্টা করা হয়েছে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইতিহাসের মহানায়ক’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘যে নেতার বুকভরা ছিল গভীর ভালোবাসা, বাংলার মানুষ বাংলার আকাশণ্ডবাতাস, মাটিকে যিনি গভীর ভালোবাসায় সিক্ত করেছিলেন, সেই বাংলার মাটি তার বুকের রক্তে ভিজে গেল কয়েকজন ঘাতক ও বেইমানের চক্রান্তে।’ বঙ্গবন্ধু কখনো বিশ্বাস করতেন না এই বাঙালি তাকে কখনো হত্যা করতে পারে। তাই দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়েও সাদামাটা নিরাপত্তাহীন এক বাসভবনে তিনি বসবাস করতেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের এই বাড়িটি এখন বঙ্গবন্ধুর উদার চিন্তা আর ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের কালরাত্রির সাক্ষী হয়ে আছে। এই বাড়ির সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়েছে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত জাতির পিতার লাশ। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হওয়া এই বাড়িটি ঘাতকদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন ও নৃশংসতার উদাহরণ হিসেবেই থাকবে আগামী সময়।

১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ দীর্ঘ ২৩ বছরের নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বাঙালির ইতিহাসের এই মহানায়ককে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা, অপচেষ্টাই ছিল মাত্র। যে বাংলার মাটিতে মিশে আছে বঙ্গবন্ধুর প্রাণ, সেই মাটির গন্ধ তো আর বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে শুয়ে থেকেও তিনি জাগ্রত ছিলেন এবং এখনো আছেন বাঙালির অন্তরের আলো হয়ে। তার স্বপ্নের বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনে চেতনার বাতিঘর হিসেবে তিনি জাগ্রত আছেন। তাই তিনি থেকেও ছিলেন আলোকবর্তিকার মতো, না থেকেও আছেন বাঙালির হৃদয়জুড়ে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close