নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০১ আগস্ট, ২০২১

কাঁদো বাঙালি কাঁদো

‘এসেছে কান্নার দিন, কাঁদো বাঙালি, কাঁদো/ জানি, দীর্ঘদিন কান্নার অধিকারহীন ছিলে তুমি,/হে ভাগ্যহত বাংলার মানুষ, আমি জানি/একুশ বছর তুমি কাঁদতে পারোনি। আজ কাঁদো।/ আজ প্রাণ ভরে কাঁদো, এসেছে কান্নার দিন/দীর্ঘ দুই-দশকের জমানো শোকের ঋণ/আজ শোধ করো অনন্ত ক্রন্দনে।/ তোমার বক্ষমুক্ত ক্রন্দনের আবেগী উচ্ছ্বাসে/আজ ভেসে যাক, ডুবে যাক এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপ।/ মানুষের ত্রকত্রিত কান্না কতো সুন্দর হতে পারে,/ মানুষ জানে না। এবার জানাও। সবাই জানুক।/ মাটি থেকে উঠে আসা ঝিঁঝির কান্নার মতো/তোমাদের কল্লোলিত ক্রন্দনের ধ্বনি শুনুক পৃথিবী।/ কাঁদো, তুমি পৃথিবী কাঁপিয়ে কাঁদো আজ।’ সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পঠভূমিতে কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় এভাবেই ওঠে এসেছে বাঙালি হৃদয়ের শোকগাঁথা।

১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট শেষ রাতে (১৫ আগস্ট) ঘাতকরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাকে সপরিবারে নিঃশেষ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শিশু শেখ রাসেল, সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসেরকে সেখানে হত্যা করা হয়। বেইলি রোডে সরকারি বাসায় হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট মেয়ে বেবি সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টুকে। আরেক বাসায় হত্যা করা হয় তার ভাগ্নে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণিকে।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণ হয়েছে শুনে সেখানে যাওয়ার জন্য রওনা দেন বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ। তবে ৩২ নম্বরের সামনে পথভ্রষ্ট সেনা কর্মকর্তারা তাকে প্রথমে বাধা দেয় ও পরে হত্যা করে। এছাড়া ওইদিন ৩২ নম্বরের বাড়িতে কর্তব্যরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও হত্যা করা হয়। এ হত্যাকান্ড বিশ্বের বুকে নিন্দিত ও ঘৃণিত রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের উদাহরণ হয়ে আছে।

সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে বাঙালি জাতি। সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর বড় সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ও ছোট বোন শেখ রেহানা শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান।

’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নরপিচাশরূপী খুনিরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ঘৃণ্য ইনডেমনিটি আইন জারি করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে দীর্ঘ ২১ বছর বাঙালি জাতি বিচারহীনতার কলঙ্কের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে এ বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিয়মতান্ত্রিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১০ সালে ঘাতকদের কয়েকজনের ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেন শেখ হাসিনা।

এছাড়া এ শোকের মাসেই আরো একটি নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনার জন্ম হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। ওই হামলার টার্গেট ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এদিকে শোকাবহ আগস্ট সামনে রেখে মাসব্যাপী শোকের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আগামী ৫ আগস্ট থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার নিজ সরকারি বাসভবনে ব্রিফিংকালে ওবায়দুল কাদের এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।?

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ, মর্মান্তিক হত্যার স্মৃতিবিজড়িত আগস্ট মাস আমাদের দুয়ারে সমাগত। প্রতি বছর আগস্ট মাসে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা হয় কিন্তু এবার করোনার ভয়াবহতায় লকডাউনের কারণে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে আগস্টের কর্মসূচি সীমিত পরিসরে এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মাসব্যাপী আগস্টের কর্মসূচিগুলো হলো ৫ আগস্ট শেখ কামালের জন্মদিন উপলক্ষে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে আবাহনী ক্লাব প্রাঙ্গণে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন।

৮ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে সকাল ৯টায় বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন।

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন। বেলা ১১টায় টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুুর সমাধিতে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদলের শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়া দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা হবে। ১৬ আগস্ট বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভা।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close