প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২২ জুন, ২০২১

সংক্রমণ পরিস্থিতি নাজুক ঢাকার সুরক্ষায় পদক্ষেপ

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ রোধে চলছে বিধিনিষেধ। আর সীমান্তবর্তী অনেক জেলায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এরপরও সংক্রমণ পরিস্থিতি নাজুক। শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৬৩৬ জন। এ সময়ে মারা গেছে আরো ৭৮ জন।

এই পরিস্থিতিতে জনসমাগম স্থানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে আরো তৎপরতা বাড়িয়েছে প্রশাসন। রাজধানী ঢাকাকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত রাখতে আশপাশের ৭ জেলায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে এই বিধিনিষেধ। যা চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত।

------
সচিবালয়ে গতকাল দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই সাত জেলায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকবে। শুধু পণ্যবাহী ট্রাক ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহনে বিধিনিষেধ থাকবে না।

সাত জেলায় কঠোর বিধিনিষেধের প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ২২ জুন সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ৭ জেলায় সার্বিক কার্যাবলি/চলাচল (জনসাধারণের চলাচলসহ) বন্ধ থাকবে।

এ সময়ে শুধু আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা যেমন কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরগুলোর নদী বন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী, যানবাহন এবং পণ্যবাহী ট্রাক, লরি নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

এদিকে, দেশের সীমান্তবর্তী জেলা ও এর আশপাশের জেলায় কোভিড সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ। খুলনা বিভাগে কোভিডে প্রাণ গেছে আরো ১২ জনের এবং শনাক্ত হয়েছে ৯৪৫ জন। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় এক পরিবারের ৮ জনসহ ১৪ জন কোভিড শনাক্ত হয়েছে। ঝিনাইদহে আক্রান্ত হয়েছে ৯৫ জন। সাতক্ষীরায় কোভিড শনাক্তের হার ৪৩ দশমিক ১০ শতাংশ। টাঙ্গাইলে এক দিনে রেকর্ড কোভিড রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণ রোধে ফরিদপুরে তিন পৌর এলাকা এবং কুষ্টিয়ায় সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়েছে। তবে এ জেলার দৌলতপুরে লকডাউনের প্রথম দিনে ঢিলেঢালাভাব লক্ষ্য করা গেছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

খুলনা : খুলনা বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় কোভিডে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরো শনাক্ত হয়েছে ৯৪৫। গতকাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরো জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় তিনজন, কুষ্টিয়ায় তিনজন, ঝিনাইদহে দুজন, চুয়াডাঙ্গায় একজন, যশোরে একজন, বাগেরহাটে একজন এবং নড়াইলে একজন মারা গেছেন। খুলনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৭৫ জন, বাগেরহাটে ৮৬, সাতক্ষীরায় ৫০, যশোরে ৩০৫, ঝিনাইদহে ৯৫, মাগুরায় ২০, নড়াইলে ৩৮, কুষ্টিয়ায় ৮৩, চুয়াডাঙ্গায় ৫৯ ও মেহেরপুরে ৩৪ জন।

ফরিদপুর : ফরিদপুর সদর, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা পৌর শহর এলাকায় সাত দিনের বিধিনিষেধ সোমবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়েছে।

গতকাল সকাল থেকে দেখা যায়, ফরিদপুর পৌর শহরের প্রত্যেকটি প্রবেশদ্বারে পুলিশের নজরদারি। কোনো যানবাহনকে শহরের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুরে ২৬৩টি নমুনা পরীক্ষায় ১০১ জনের কোভিড শনাক্ত হয়েছে। আর মারা গেছেন আরো দুজন। তারা হলেন আকমল বিশ্বাস (৭৮) ও দেলোয়ার হোসেন (৬০)।

ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে কোভিডে মারা গেছে আরো চারজন। আর ২০৫টি নমুনা পরীক্ষা করে কোভিড শনাক্ত হয়েছে ৯৫ জন। আক্রান্তের হার ৪৬ দশমিক ৩৪ ভাগ।

এদিকে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সদর পৌরসভাসহ ৬টি পৌরসভা এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ জারি করেছে প্রশাসন। সকাল থেকে পৌরসভা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে অভিযান চালাচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, ৫০ বেডের করোনা ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগ ভর্তি আছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় ৫০ বেডের একটি নতুন করোনা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ায় ৭ দিনের কঠোর লকডাউনের ১ম দিন চলছে। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় রবিবার মধ্যরাত থেকে ২৭ জুন মধ্যে রাত পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করে গণবিজ্ঞপ্তি দেয় জেলা প্রশাসন। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সময়ে জেলার সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, শপিংমল, দোকান, রেস্টুরেন্ট ও চায়ের দোকান, পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। তবে কাঁচাবাজার ও মুদির দোকান সকাল ৭টা থেকে ১২টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখা যাবে। কুষ্টিয়া জেলার অভ্যন্তরে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার সব ধরনের গণপরিবহন, ইজিবাইকসহ সব যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে গরুর হাটসহ জেলার সব সাপ্তাহিক হাটবাজার।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ২২৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন করে ৮৩ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩৭ শতাংশ। শেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় আরো ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় ১১৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫০ জনের কোভিড শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৪৩ দশমিক ১০ শতাংশ। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকে করোনা আক্রান্ত হয়ে একজন ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরো তিনজন।

এ পর্যন্ত জেলায় মারা গেছেন ৬১ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ২৭৩ জন।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন সাফায়াত জানান, বর্তমানে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বেশি হচ্ছে। যত বেশি টেস্ট করা হবে তত বেশি কার্যকারিতা পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ঘোষিত লকডাউন চলছে সাতক্ষীরা জেলাব্যাপী। লকডাউন বাস্তবায়নে শহর ও উপজেলা সদর কেন্দ্রিক মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট রয়েছে। তবে এসব উপেক্ষা করেও প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে বেরিয়েছে মানুষ।

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) : কুষ্টিয়ায় গত রবিবার রাত ১২টা থেকে ২৭ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত জেলায় কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয় জেলা প্রশাসন।

এদিকে, অন্যান্য উপজেলাতে লকডাউন কঠোরভাবে পালিত হলেও দৌলতপুর উপজেলার চিত্র ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। লকডাউন শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে প্রতীয়মান। কঠোর লকডাউনের ঘোষণা থাকলেও প্রশাসনকে কঠোর হতে দেখা যায়নি এই উপজেলাতে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, সকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছি। সেই সঙ্গে জনসাধারণকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। তবে লোকবলের স্বল্পতার কারণে সব স্থানে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে ৩৮৫টি নমুনা পরীক্ষায় রেকর্ড ১৬৫ জনের কোভিড শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৪২.৮৫ শতাংশ।

এদিকে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় টাঙ্গাইল ও কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা পৌরসভায় আজ মঙ্গলবার থেকে ৭ দিন কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে জেলা প্রশাসন। এসব এলাকায় কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান ছাড়া হোটেল, মার্কেটসহ সব বন্ধ থাকবে। এ ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবাহী ট্রাক ছাড়া গণপরিবহন, রিকশা, ইজিবাইক, সিএনজিসহ সব যানবাহন বন্ধ থাকবে।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৯২টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৯০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ১৭১ জনে। এ সময় মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে নগরীতে ১২৮ জন এবং উপজেলায় ৬২ জন রয়েছে।

দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) : নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় একই পরিবারের ৮ জনসহ ১৪ জন করোনায় আক্রান্ত্রের খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত একই পরিবারের ৮ জন দুর্গাপুর উপজেলার চন্ডিগড় ইউনিয়নে আলমপুর এলাকার। অন্যরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। এ তথ্য নিশ্চিত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তানজিরুল ইসলাম রায়হান বলেন, গত ১৬ জুন ওই পরিবারের মা ও মেয়ে নমুনা পরীক্ষায় কোভিড-১৯ শনাক্ত হন। পরে ২০ জুন ওই পরিবারের ৯ জনের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে ওই পরিবারের ছয় বছরের এক শিশুসহ আটজন শনাক্ত হন। ফলে সংক্রমণ রোধে গত রাতেই কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন ইউএনও।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close