মিজান রহমান

  ০২ মার্চ, ২০২১

বাড়ছে ই-কমার্স খাত

২০২৫ সালের মধ্যে এই খাতে তৈরি হবে আরো ৫ লাখ কর্মসংস্থান

প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। ব্যস্ততম নগরীর জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে কাজ করছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। করোনাকালে ঘরবন্দি মানুষের দ্বারে খাবার, ওষুধ, খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিয়ে আস্থা অর্জন করেছে এই খাত। এছাড়া মানুষকে অভ্যস্ত করেছে অনলাইন কেনাকাটায়। এর সুফল পাচ্ছে ই-কমার্স খাত। বিগত অর্ধযুগে ই-কমার্স যতটা প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে শুধু করোনার মধ্যে তাকে ছাড়িয়ে গেছে এই খাত। গ্রাহক বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হচ্ছে অনলাইন ব্যবসায়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, করোনাকালে শুরুতে সারা দেশে লকডাউন ও পরে এলাকাভিত্তিক লকডাউন ই-কমার্স খাতের বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘গত ১০-১১ বছর ধরে ই-কমার্সকে আমরা যতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার বেশি পেয়েছে গত পাঁচ মাসে। প্রায় সব পর্যায়ের লোকজন এখন বুঝতে পেরেছেন ই-কমার্স কী?’ প্রতিমন্ত্রী জানান, ই-কমার্সকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে ফুড ফর নেশন, ওয়ানশপ-এর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। ই-কমার্সের এমন প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে ২০২৫ সালের মধ্যে এই খাতে আরো ৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশাবাদী তিনি।

------
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল ওয়াহেদ তমাল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, করোনাকালে ই-কমার্সে দ্বিগুণ গ্রোথ হয়েছে। যারা আগে কখনো ভাবেনি ই-কমার্স ব্যবসা করছে ট্রেন্ডের কারণে তারাও এখন এই দিকে ঝুঁকছে। লাখ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এই খাতে। মার্কেট অনেক পরিবর্তন হচ্ছে, মার্কেটের আকার বড় হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন ই-কমার্সে অর্ডার পড়ছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখের মতো। তবে এটি এখনো বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গ্রাম পর্যায়ে এটি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ই-কমার্স মার্কেটের আকার ছিল ৫৬০ কোটি টাকা, তবে পরের বছর এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬৩২ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালে এই পরিমাণ ১০ হাজার ৫০৪ কোটি এবং ২০১৯ সালের ১৩ হাজার ১৮৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। তবে করোনাকালে গত বছরে এটি দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা।

দেশে ই-কমার্স খাতের বয়স গোনা যায় ১০ থেকে ১১ বছর। এই সময়ের মধ্যে ই-কমার্স খাত যে জায়গায় এসে পৌঁছায় তা ছাপিয়ে গেছে গত ৫ মাসে। করোনাকালে সারা দেশে বিশেষ করে রাজধানীতে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষ ই-কমার্স নির্ভর কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। এ খাতে বেশি আলোচিত ছিল গ্রোসারি প্রডাক্ট (নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও মুদিপণ্য), যা প্রায় শতভাগ প্রবৃদ্ধি এনে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এই খাতের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, সংগঠকরা।

দূর-প্রযুক্তি নির্ভর কার্যাবলি সম্পর্কে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলক বলেন, শুধু পণ্য কেনাকাটায় নয়, করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই এখন চলছে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছেন অনলাইনে, পরীক্ষাও চলছে ডিজিটাল মাধ্যমে। স্বাস্থ্যসেবায়ও ব্যবহার হচ্ছে টেলিমেডিসিন। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামের রোগীরা এখন রাজধানীসহ বড় বড় হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে অনলাইনেই যোগাযোগ করছেন, সমাধানও নিচ্ছেন ভার্চুয়াল মাধ্যমে। মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে শুরু করে বড় থেকে ছোট প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলো হচ্ছে অনলাইনে। একইভাবে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনলাইন পেমেন্ট, চলাচলের ক্ষেত্রে রাইড শেয়ারিং সবগুলোরই ব্যবহার বেড়েছে।

এদিকে ব্যাংকিং, লজিস্টিক কমিউনিকেশন এবং পেমেন্ট মেথডের উন্নতির কারণে ই-বিজনেস সেক্টরের উন্নয়নে অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্র, বিশেষ করে ব্যাংকিং ক্ষেত্রটি ইন্টারনেট পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করছে। গ্রাহকদের কাছে এখন ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড সেবা এবং ডিজিটাল ওয়ালেট আরো বেশি সহজলভ্য হওয়ায় ক্যাশ অন ডেলিভারির (সিওডি) পরিসরও বাড়ছে।

ই-কমার্সের গ্রোথ সম্পর্কে চালডাল ডটকমের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) জিয়া আশরাফ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, গত কয়েক মাসে ই-কমার্সে প্রায় শতভাগ গ্রোথ হয়েছে। এটা এই খাতের জন্য ইতিবাচক। আশা করি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এই গ্রোথটা থাকবে। কারণ মানুষের এখন অভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। ঘরে বসেই সব পাচ্ছেন। তাহলে কষ্ট করে কেন আর বাইরে যাবেন।

ই-কমার্সে আসা প্রসঙ্গে বি৭১বিডি ডটকমের প্রধান নির্বাহী মো. মনিরুজ্জামান মৃধা বলেন, ই-কমার্স নিয়ে এখন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় ই-কমার্স সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া অনলাইন শপে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই।

নতুন নতুন কোম্পানি ই-কমার্সে আসাকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদ তমাল বলেন, উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, এটা ভালো দিক। ঢাকার বাইরেও ই-কমার্স তৈরি হচ্ছে। সবাই প্রতিষ্ঠা পাক, দাঁড়িয়ে যাক এটাই চাই। তবে ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে সবাইকে নিয়ম মানার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে মহামারি করোনা। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পরিসর কমিয়েছে, ছাঁটাই হয়েছে কর্মী, কমানো হয়েছে বেতন। আর্থিক সংকটের কারণে হাহাকার করেছে প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠানই। এর বিপরীত চিত্র দেখেছে ই-কমার্স খাত। এ সময়ে যেমন এই ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, অন্যদিকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ই-কর্মাস কোম্পানি। এর মধ্যে রয়েছে সেরাবাংলা ৬৪ ডটকম, সেলেক্সট্রা ডটকম ডট বিডি, বি৭১বিডি ডটকম, ধামাকা শপিং, আলিশামার্ট ডটকম ইত্যাদি। এখনো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইন মার্কেটে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলেও জানা গেছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close