নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

বাড়াতে হবে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) পাঁচ দিনের বৈঠক শেষে গত শুক্রবার রাতে এ সুপারিশ করেছে। সিডিপির এলডিসি-সংক্রান্ত উপ-গ্রুপের প্রধান টেফেরি টেসফাসো ওই রাতেই এক অনলাইন ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে বেরোতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ তুলনামূলক দুর্বল, সেসব দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করা হয় ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে পাঁচ বছর পর এলডিসি থেকে বেরিয়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে যাবে বাংলাদেশ। তবে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

------
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হওয়া একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এর ইতিবাচক দিক হলো, এতে দেশের সম্মান বাড়বে। বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ প্রসারিত হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হবে। এর মধ্যে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। বিশেষ করে রপ্তানি খাতে এ চ্যালেঞ্জ বেশি। ফলে তৈরি পোশাক খাত, ওষুধ খাতসহ অন্যান্য খাতে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এ স্বীকৃতির ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। আবার কিছু চ্যালেঞ্জও আসবে। তবে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশের সামনে যে সময় রয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়টিকে প্রস্তুতিকাল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য আগামী বাজেটেই সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জোর দিতে হবে। পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে নজর দিতে হবে কম মূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে। রপ্তানি পণ্যের নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। মানবাধিকার সূচকের উন্নয়নে শ্রম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সোচ্চার হতে হবে অভ্যন্তরীণ আইন সংস্কারসহ বাস্তবায়নে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশ বেশ কিছু সুবিধা পাবে। তবে এর ফলে কতটুকু সফলতা আসবে সেটা ভবিষ্যতে বলা যাবে। বাংলাদেশের সতর্ক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। বেশকিছু চ্যালেঞ্জ আছে সামনে। এর মধ্যে আমরা যে বৈদেশিক সাহায্য পেতাম সেটা কমে যাবে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা আর পাব না। বিশ্ব বাজারে আমাদের একটি নতুন প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের নতুন করে আলোচনা করতে হবে। ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাক্ট সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। আপাতত এটা বন্ধ না হলেও আমরা কিছু সময় পাব। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই বন্ধ হবে। সেটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি আরো বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আগামী রিভিউ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে যেন কোনো সংকটে পড়তে না হয়। সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি থাকলে বাংলাদেশ এলডিসিমুক্ত রাষ্ট্র হলে আমরা বেশি সুবিধা পাব।’

সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আগামী পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ‘এলডিসি রূপান্তর কৌশলপত্র’ তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ এখন মাত্র এই উত্তরণ যাত্রা শেষের শুরু হলো। এই কৌশলপত্রে শুধু সম্ভাব্য প্রতিকূল ফলাফলগুলোর মোকাবিলা করার বিষয়গুলো থাকবে না বরং বাংলাদেশের জন্য একটি মসৃণ এবং টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা থাকবে। কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা এবং প্রোগ্রামগুলো এই রূপান্তর কৌশলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরো বলেন, উৎপাদনশীল সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৌলিক এবং মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও শ্রম উৎপাদনশীলতার উন্নতি হবে। দেশীয় বাজার সম্প্রসারণ এবং একত্রীকরণের ওপর ফোকাস এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অবশ্যই ‘এলডিসি রূপান্তর কৌশলপত্র’ তৈরির জন্য গাইড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রূপান্তরের প্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়া শুরু হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ এরই মধ্যে বাণিজ্যের ধাক্কা মোকাবিলার জন্য ব্যবসার বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, এলডিসি গ্রুপ থেকে কোনো দেশ বেরিয়ে আসার অর্থ মূলত এর উন্নয়ন সাফল্য সম্পর্কিত বৈশ্বিক স্বীকৃতি। এটি সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতি অন্যান্য দেশের আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সুতরাং এলডিসি গ্রুপ থেকে বের হওয়ার পরে আন্তর্জাতিক রেটিং সাধারণত আপগ্রেড হয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহও বাড়ে। দেখা গেছে, এলডিসি গ্রুপ ছেড়ে যাওয়ার পরে দেশগুলোর দেশীয় কর আদায় এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের হার বাড়ে।

সিপিডি বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরকে প্রস্তুতিকাল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এলডিসি থেকে বের হলে অনেক বাণিজ্য সুবিধা থাকবে না। তখন বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।

সাধারণত ইউএন-সিডিপির চূড়ান্ত সুপারিশের তিন বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু করোনার প্রভাব মোকাবিলা করে প্রস্তুতি নিতে বাড়তি দুই বছর সময় দেওয়া হয়েছে। সিডিপির সঙ্গে গত ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বাংলাদেশও বাড়তি দুই বছর সময় চেয়েছিল।

এবার বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও লাওসও এলডিসি থেকে বের হওয়ার সুপারিশ পেয়েছে। সিডিপির পরপর দুবারের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নির্দিষ্ট মান অর্জন করলে এ ধরনের সুপারিশ করা হয়। ২০২১ সালের সিডিপির এ মূল্যায়নে বাংলাদেশের পাশাপাশি লাওস ও মিয়ানমার নির্দিষ্ট মান অর্জন করেছে। কিন্তু মিয়ানমারকে সুপারিশ করেনি সিডিপি। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করায় উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এলডিসি থেকে দেশটির বের হওয়ার সুপারিশের বিষয়টি ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে নেপাল ২০১৮ সালেই দ্বিতীয়বারের মতো মান অর্জন করেছিল। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দাঁড়াতে ওই বছর সুপারিশ করা হয়নি।

এলডিসি থেকে কোন কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে থাকে সিডিপি। এজন্য প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এই তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্টসীমার দ্বিগুণ করতে হয়। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা এর নিচে থাকতে হবে। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট পেতে হবে। মাথাপিছু আয় সূচকে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার থাকতে হবে। মাথাপিছু আয় হিসাবটি জাতিসংঘ করেছে অ্যাটলাস পদ্ধতিতে। সেখানে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করে তিন বছরের গড় হিসাব করা হয়। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ৭৫ দশমিক ৩। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ২৫ দশমিক ২।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close