হাসান ইমন

  ০৩ ডিসেম্বর, ২০২০

জনঘনত্ব কমানোয় জোর নতুন ড্যাপে

রাজধানীর জনঘনত্ব কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবারের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ)। ২০১৬-৩৫ সালমেয়াদি এ পরিকল্পনায় ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জনঘনত্ব জোনিং প্রণয়ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর, নির্বিঘ্ন ও যানজটমুক্ত করার লক্ষ্যে ঢাকার সঙ্গে আশপাশের বিভিন্ন শহরকে যুক্ত করতে রেল, সড়ক ও নৌপথের মাধ্যমে বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি ওয়ার্ডে তিন থেকে চারটি করে স্কুল এবং ২৫টি মাঠ ও পার্ক রাখার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় খালের ওপর বানানো বক্স কালভার্টগুলো উঠিয়ে দেওয়া হবে। এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে নতুন ড্যাপে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু ইমারতের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করে নয়, বরং ঢাকার চারপাশের বিদ্যমান শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ ও বহুমুখী করে জনঘনত্ব কমাতে হবে।

------
ড্যাপ সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত নতুন ড্যাপে ঘনবসতিপূর্ণ (ডেনসিটি জোনিং) ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যক্তিপর্যায়ে ভবনের সর্বোচ্চ অনুমোদনযোগ্য উচ্চতা আটতলা। এ ছাড়া গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং সাভার পৌরসভার জন্য ব্যক্তিপর্যায়ে সর্বোচ্চ অনুমোদনযোগ্য উচ্চতা ছয়তলা। তবে শর্তসাপেক্ষে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আরো দোতলা বাড়ানো যাবে। ঢাকা কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ কমাতে, বিভিন্ন এলাকায় সুষম উন্নয়নে সহায়তা করতে এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র মেট্রোপলিটন এলাকাকে একটি বাসযোগ্য এবং কার্যকর নগর হিসেবে গড়ে তুলতে জনঘনত্ব জোনিং প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ করে জনঘনত্ব কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এরই মধ্যে পাঁচটি মেট্রো, দুটি বিআরটি, ছয়টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের সমান্তরালে দুটি প্রধান সড়ক দুটি রিং রোড, রিং রোডের সঙ্গে সংযুক্ত রেডিয়াল রোড এবং বৃত্তাকার নৌপথের প্রস্তাব করা হয়েছে এই ড্যাপে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খাল ভরাট করে কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তৈরির কারণে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তাই সব কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তুলে দিয়ে সেখানে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে ড্যাপ এলাকায় ৫৬৬ কিলোমিটার নতুন নৌপথ সৃষ্টি হবে। এসব নৌপথে যাতায়াত ব্যবস্থা চালু হলে রাজধানীর যানজট এবং জলাবদ্ধতাও নিরসন হবে। এ ছাড়া যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২ হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরি করারও প্রস্তাব রয়েছে। বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য পছন্দমতো স্কুল পাওয়া এবং শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করা নগরবাসীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে ড্যাপ এলাকায় ৬২৭টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে সরকারি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ থাকবে। এজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে এ রকম তিন থেকে চারটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। স্কুলের সঙ্গে থাকবে খেলার মাঠ। এ ছাড়া কিশোরদের মানসিক-শারীরিক বিকাশ ও সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রস্তাবিত নতুন ড্যাপে ২৫টি পার্ক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মোহাম্মদ খান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু ইমারতের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করে নয়, বরং ঢাকার চারপাশে বিদ্যমান শহরগুলোর সঙ্গে কমিউটার লাইট রেল এবং এলিভেটেড রোডের মাধ্যমে যুক্ত করতে হবে। ঢাকাকে প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় রেখে বিকেন্দ্রীকরণ করেই জনঘনত্ব কমানো সম্ভব।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে হাইরাইজ বিল্ডিং করতে কমপক্ষে এক বিঘা জমি থাকতে হয়। তাহলে ওই দেশটি উঁচু ভবনের অনুমোদন দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে এক, দুই ও তিন কাঠা জমিতে ৭-১০ তলা পর্যন্ত ভবন করে। অথচ সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রটি এসব জমিগুলোতে সর্বোচ্চ তিন তলা ভবনের অনুমতি দিত। সুতরাং এখানে আমাদের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে বেশি জোর দিতে হবে।’

ড্যাপ প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, রাজধানীর যেখানে-সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও এর বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেই। একটি বহুতল ভবনে যত যানবাহন যাতায়াত করে, তাতে আশপাশে প্রয়োজনীয় রাস্তা না থাকলে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। এ রকম অন্যান্য নাগরিক সুবিধারও সংকট আছে। এ অবস্থার নিরসনে আবাসিক বহুতল ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। জনঘনত্ব এবং মাটির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী এসব ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, জনঘনত্ব কমাতে গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ঢাকার পাশের শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার জন্য মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও নৌযান চলাচলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব শহরের সঙ্গে যখন যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হবে, তখন সহজে মানুষ ওইসব জায়গায় স্থানান্তর হবে এবং একই সঙ্গে চাপ কমবে কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাকে বসবাস অযোগ্যতার হাত থেকে বাঁচাতে হলে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। ঢাকার খোলা জায়গা, জলাভূমি কমে যাওয়ায় এবং পরিকল্পনামাফিক অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা তৈরি না করায় জনসংখ্যার ধারণক্ষমতা কমে গেছে। তাই এলাকাভিত্তিক জনঘনত্বকে গুরুত্ব দিয়ে জনসংখ্যার আকার ঠিক করতে হবে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের সব শহর ও পৌরসভা পর্যায়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নে জনসংখ্যার আকার বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। সেটা না করতে পারলে ব্যর্থ হবে সব পরিকল্পনা। ঢাকাকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়সহ সবাইকে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে পাশের শহরগুলো যেন পরিকল্পিত বাসযোগ্য শহর হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

তারা আরো বলেন, জনঘনত্বের মানদন্ডে এরই মধ্যে বাসযোগ্যতা হারিয়েছে ঢাকা। ভারবহন ক্ষমতার চেয়ে ঢাকায় জনসংখ্যার ভার এখন চার গুণ বেশি। এ ছাড়া যেকোনো শহরের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় রাস্তার প্রশস্ততা বিবেচনায় নেওয়া হলেও ঢাকার ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮-এ ভবনের উচ্চতা নির্ধারণে রাস্তার প্রশস্ততার বিবেচনা বাদ দিয়ে সুউচ্চ ফ্লোর এরিয়া অনুপাত (এফএআর) প্রস্তাব করায় ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। সিঙ্গাপুরে এফএআর দেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ ২ অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা ৩.১৫ থেকে ৬.৫ পর্যন্ত।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়