ক্রীড়া ডেস্ক

  ২৭ নভেম্বর, ২০২০

কিংবদন্তির মৃত্যু নেই

বিশ্ব ফুটবলেরই আরেক নাম ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। ফুটবল বিশেষজ্ঞ, সমালোচক, সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং ফুটবল অনুরাগীরা তাকে সর্বকালের সেরা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফিফা ডট কমের ভোটাররা তার একটি গোলকেই শতাব্দীর সেরা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।

কিন্তু সেরাদের সেরাকেও যে এক দিন থামতে হয়! সেটা জানতেন ম্যারাডোনাও। নিয়তির ঠিক করে রাখা সেই দিনটা এলো গত বুধবার। জীবনের অনিবার্য নিয়ম মেনে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৬০ বছর বয়সি ফুটবল জাদুকর ওই দিন চলে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে। তবে রেখে গেলেন তার অনন্য সব কীর্তি। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলেন, ম্যারাডোনাই দুনিয়াজুড়ে আকাশি-সাদা জার্সির কোটি কোটি ভক্ত তৈরি করে গেছেন। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার চোখে বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তার পাশে ছিলেন কেবল ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে।

------
ম্যারাডোনা দুবার ট্রান্সফার ফির বিশ্বরেকর্ড গড়া একমাত্র ফুটবলার। প্রথমবার বার্সেলোনায় স্থানান্তরের সময় পাঁচ মিলিয়ন ইউরো এবং দ্বিতীয়বার নাপোলিতে যাওয়ার সময় ৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ইউরো। নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া এবং নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন এ কিংবদন্তি।

চারটি বিশ্বকাপে (১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ ও ১৯৯৪) আর্জেন্টিনার হয়ে টানা ২১টি ম্যাচে মাঠে নামেন ম্যারাডোনা। ১৬ ম্যাচে জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নেমেছেন, যা বিশ্বকাপের রেকর্ড। বিশ্বকাপের ২১ ম্যাচে আটটি গোল করেন এবং অন্য আটটি গোলে সহায়তা করেন। যার মধ্যে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে করেন পাঁচটি গোল এবং পাঁচটি সহায়তা।

আর্জেন্টিনার হয়ে ৯১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ৩৪টি গোল করেছেন ম্যারাডোনা। চারটি বিশ্বকাপ খেলা এ ফুটবলার দেশটি একক নৈপুণ্যে বিশ্বসেরার ট্রফি জিতিয়েছেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার অবদান শুধু আর্জেন্টিনাতেই নয়, বিশ্ব ফুটবলে রাজার আসনে আসীন করেছে তাকে।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয় লাভ করে। দলের পক্ষে দুটি গোলই করেন ম্যারাডোনা। দুটি গোলই ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে দুটি ভিন্ন কারণে। প্রথম গোলটি ছিল হ্যান্ড বল, যা “হ্যান্ড অব গড” নামে খ্যাত। দ্বিতীয় গোলটি ম্যারাডোনা প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে ড্রিবলিং করে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করেন।

ম্যারাডোনার জন্ম ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েন্স আয়ার্সের লানুস শহরের একটি দরিদ্র পরিবারে। তিনি বেড়ে ওঠেন ভিয়া ফিওরিতোতে, যা বুয়েন্স আয়ার্সের দক্ষিণ প্রান্তের একটি উপশহর।

বাবা-মায়ের তিনটি মেয়ে সন্তানের পর তিনিই ছিলেন ছেলে। তার ছোট দুই ভাই রয়েছে হুগো (এল তুর্কো) এবং রাউল (লালো)। তারাও পেশাদার ফুটবলার ছিলেন।

১০ বছর বয়সে যখন এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলছিলেন, তখন ম্যারাডোনাকে খুঁজে বের করেন একজন স্কাউট। এরপর তিনি দ্য লিটল অনিঅনের (আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের যুব দল) মূল খেলোয়াড়ে পরিণত হন।

আর্জেন্টিনার প্রথম বিভাগের খেলায় বল বয় ছিলেন ম্যারাডোনা। তখন তার বয়স ১২ বছর। তখন খেলার অর্ধ বিরতির সময় বল নিয়ে জাদুকরি কারুকার্য দেখিয়ে তিনি দর্শকদের সন্তুষ্ট করতেন।

১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর নিজের ১৬তম জন্মদিনের ১০ দিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে অভিষেক হয় ম্যারাডোনার। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। ১৬৭ ম্যাচে গোল করেন ১১৫টি। আর এরপর এক মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়র্সে পাড়ি জমান। ১৯৮১ মৌসুমের মাঝামাঝি সময় বোকায় যোগ দিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন।

১৯৮৫ সালে নাপোলির হয়ে মাঠে নামেন। এই ক্লাবেই ম্যারাডোনা তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শিখরে পৌঁছান। খুব দ্রুত ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার জাদুতে নাপোলি হয়ে ওঠে জায়ান্ট ক্লাব। ম্যারাডোনার অধীনে ১৯৮৬-৮৭ ও ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে সিরি ‘আ’ শিরো জেতে নাপোলি। কোপা ইতালিয়া জেতে ১৯৮৭ সালে। আর ১৯৯০ সালে ইতালিয়ান সুপার কাপও জিতে নেয় নেপলসের ক্লাবটি।

ওই বছরেই চোটে পড়েন ম্যারাডোনা। তাই বিশ্বকাপে তার সেরাটা দেখা যায়নি। তবু শেষ ষোলোর ম্যাচে এক মুহূর্তের এক জাদুতে ব্রাজিলকে ছিটকে দিলেন বিশ্বকাপ থেকে।

পরের বছর কোকেন ব্যবহার করার ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন ম্যারাডোনা। নিষেধাজ্ঞা শেষে আর নাপোলিতে ফেরেননি। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সেভিয়ায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘আমি এখন বিশ্বসেরা নয়, দশ হাজারতম খেলোয়াড়।’

১৯৯৩ সালে নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাব দিয়ে আর্জেন্টিনায় ফেরেন ম্যারাডোনা। পরের বছর অংশ নেন নিজের শেষ বিশ্বকাপেও। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে গ্রিসের বিপক্ষে গোল করেন ম্যারাডোনা। দ্বিতীয় ম্যাচে ক্যানিজিয়াকে দিয়ে গোল করান। তবে ওই ম্যাচের পরই ডোপ টেস্টে ধরা পড়েন ম্যারাডোনা। নিষিদ্ধ এফিড্রিন নেওয়ায় বিশ্বকাপ থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাকে। এরপর আর্জেন্টিনার জার্সিতে ম্যারাডোনাকে আর দেখা যায়নি।

নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার বোকা জুনিয়র্সে ফেরেন তিনি। নিজের প্রিয় ক্লাবে ফেরার এ মুহূর্তটা উদ্?যাপন করেছেন বিখ্যাত এক মন্তব্যে, ‘এ ফেরা অনেকটা ১৪ বছর গর্ভ ধারণ করে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মতো।’ তবে ঘরের ক্লাবে ফেরার পর থেকেই নিষ্প্রভ হতে থাকেন। যেন আর পেরে উঠছিলেন না। ১৯৯৭ সালের ২৫ অক্টোবর ৩৭তম জন্মদিনের পাঁচ দিন আগে বিদায় বলে দেন ফুটবলকে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা আজ আর নেই। আর কখনো ফিরবেনও না। কিন্তু তার স্মৃতিগুলো রয়ে যাবে আজীবন। আসলে কিংবদন্তিদের প্রস্থান হয়, মৃত্যু হয় না।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়