বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না মাধ্যমিকেও

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশে দেশে। বাংলাদেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে কয়েক মাস ধরে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মূল্যায়ন পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণার পর এবার মাধ্যমিকের সব স্তরের বার্ষিক পরীক্ষাও বাতিল করেছে সরকার। তবে পরীক্ষা বাতিল হলেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত পাঠ্যসূচির ওপর এক মাসের মধ্যে চারটি অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন করার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি। তাই এবার পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা পরবর্তী ক্লাসে উঠতে যাচ্ছে।

কারিগরি শিক্ষা এবং অনার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অবশ্য পরীক্ষায় বসতে হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। গতকাল বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়ে এ কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষাও এবার হচ্ছে না। তবে ৩০ কর্মদিবসের জন্য একটি পাঠ্যসূচি করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত এই পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে শিক্ষার্থীদের। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। প্রতি সপ্তাহে এই অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া ও জমা নেওয়া হবে। তবে এই মূল্যায়ন-পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রভাব ফেলবে না। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে মূলত শিক্ষার্থীদের কী ঘাটতি আছে, তা দেখা হবে। যাতে পরবর্তী ক্লাসে সেটা পূরণ করা যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই পাঠ্যসূচি দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছেও তা পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।

বার্ষিক পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। তারা বলছেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পিএসসি-জেএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এ অবস্থায় মাধ্যমিকে বার্ষিক পরীক্ষা না হওয়াই স্বাভাবিক। নির্দিষ্ট একটি পাঠ্যসূচির ওপর এক মাসে চারটি অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা খুঁজে বের করার যে পদ্ধতি বের করা হয়েছে, তা ভালো উদ্যোগ। তবে এর সফলতা নির্ভর করে অভিভাবকের ওপর। এ বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল খালেক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সরকার যে পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে জানা যাবে গত আট মাস থেকে ক্লাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরা কতটা তাদের পাঠ্যসূচির ওপর জোর দিয়েছে। অভিভাবকরাও বুঝতে পারবেন তার সন্তানের লেখাপড়ায় কতটা উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির মাধ্যমে এটাও জানা যাবে অনলাইন ক্লাস বা শিক্ষাটিভি কতটা আপডেট করতে পেরেছে শিক্ষার্থীদের।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা না নিয়ে অর্জিত শিখন ফল মূল্যায়নের মাধ্যমে পরবর্তী ক্লাসে তুলে দেওয়া হবে। তবে যারা অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠবে, অর্থাৎ যাদের জেএসসি বা জেডিসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, তাদের গ্রেডিং ছাড়াই সনদ দেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সনদ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব। অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষা দিলে তারা সনদ পেত। এবার পরীক্ষা দিচ্ছে না বলে সনদ পাবে না, তা তো নয়। জেএসসির সনদটি কারো কারো জন্য খুব জরুরি হতে পারে। এবার যেমন সবাই পরবর্তী ক্লাসে যাবে, সেজন্য পরীক্ষা যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শেষ করেছে, কৃতকার্য হয়েছে সেটি উল্লেখ থাকবে।’

শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা উন্নত বিশ্বের কথা বলি, উন্নত দেশ হতে চাই। উন্নত বিশ্বের অংশ হতে চাই। আবার উন্নত বিশ্বের যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানে কিন্তু প্রত্যেক ক্লাসে গ্রেডিং পরীক্ষা, পাস, ফেল, জিপিএ ৫ এ ধরনের উন্মাদনা নেই। কাজেই এদিকে আমরা আধুনিক হব ভাবছি, তাই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দিকে যেতে হবে। বছরের শেষে, বছরের মাঝখানে পরীক্ষা নিয়েই যে সেটি মূল্যায়ন করা যায়, তা নয়। আরো অনেক ধরনের মূল্যায়নের পদ্ধতি রয়েছে। আমরা ধারাবাহিক মূল্যায়নের যে পদ্ধতিগুলো রয়েছে সেগুলোতে যেতে চাচ্ছি। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে, সামগ্রিকভাবে সেগুলো চিহ্নিত করে দুর্বলতা দূর করতে চাই। আমরা পরীক্ষাভীতি, পরীক্ষার চাপ, শারীরিক-মানসিক চাপ চাই না। শিক্ষার্থীরা আনন্দের মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করবে, দক্ষতা অর্জন করবে, সুযোগ্য নাগরিক হবে।’

পরীক্ষা হবে কারিগরি শিক্ষার্থীদের : মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল করা হলেও কারিগরির পরীক্ষা হবে। এ শিক্ষা হাতে-কলমে শিখতে হয় বলে তাদের পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী ক্লাসে উন্নীত করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সাধারণ বিষয়ে পরীক্ষা ছাড়া ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হলেও কারিগরি শিক্ষায় তা সম্ভব নয়। কারিগরি শিক্ষার্থীদের লেখার চেয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেটি না শিখলে তাকে পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন দেওয়া সম্ভব হবে না। এ কারণে বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে এ স্তরের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন দেওয়া হবে। কারিগরি স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে।’

নভেম্বরেও খুলছে না স্কুল-কলেজ : মহামারির কারণে নভেম্বর মাসেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে না বলে আভাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখন খোলা হবে, সেটি বলা মুশকিল। যেখানে যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছিল, অধিকাংশ জায়গায় সেখানে বন্ধ করার পর্যায়ে আছে। যেহেতু শীতকাল নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা আছে সব জায়গায়, বিশেষজ্ঞ মহলও বলছে করোনার প্রকোপ বাড়তে পারে। সে কারণে আমাদের কোভিডবিষয়ক যে জাতীয় পরামর্শক কমিটি রয়েছে, আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

দীপু মনি বলেন, আমরা যখন মনে করব যে আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই বা খুবই সামান্য, হয়তোবা যে ঝুঁকিটুকু নেওয়া সম্ভব, সে রকম একটা অবস্থায় যদি যায়, তখন আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারব। সেটি কবে হবে সেটি আমাদের কারো পক্ষেই এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।

দেশে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে ৮ মার্চ। ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নবম শ্রেণিতে পছন্দমতো বিভাগ বাছাই : শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, চলতি বছর জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। সবাইকে অটোপাস দেওয়া হবে। এসব শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিভাগ পরিবর্তন করতে পারবে। সাধারণত শিক্ষার্থীরা ভালো ফলের ভিত্তিতে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগ পেয়ে থাকেন। চলতি বছর থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক সুবিধা রাখা হচ্ছে। অষ্টম শ্রেণি থেকে পাস করার পর একজন শিক্ষার্থী যেকোনো বিভাগ থেকে রেজিস্ট্রেশন করলেও অন্য বিভাগ থেকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

অনার্সে পরীক্ষা ছাড়া ডিগ্রি নয় : শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, অনার্সের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছাড়া ডিগ্রি দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ এই ডিগ্রি নিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবেন। এ ক্ষেত্রে তাদের কর্মক্ষেত্রেও অন্যভাবে দেখা হতে পারে। এ পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে, তা ভেবে দেখা হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অনার্সের শিক্ষার্থীদের কিছু পরীক্ষা হয়ে গেছে। কিছু পরীক্ষা বাকি। সার্বিক বিবেচনায় অনার্সের শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত করা হবে, নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে নেওয়া হবে, তা ভেবে দেখা হচ্ছে।

 

 

"