মুখোমুখি বিবি রাসেল

সৌন্দর্য-সম্ভাবনা দেখেছি গ্রামের তাঁতিদের মধ্যে

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

জিনাত জান কবীর

বিবি রাসেল একজন ফ্যাশন ডিজাইনার, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মডেল। ঐতিহ্যবাহী তাঁতের কাপড় এবং ডিজাইনকে আধুনিক ফ্যাশনের আঙ্গিকে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে উপস্থাপনের জন্য কাজ করে চলেছেন তিনি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ এবং বেগম রোকেয়া পদক। এ ছাড়া ইউনেসকোসহ অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন। তার জন্ম ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে। বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায়। তার বাবা মোখলেসুর রহমান এবং শামসুন্নাহার রহমান ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী। সে সুবাধে শৈশব-কৈশোরেই সান্নিধ্য পেয়েছেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের। ছোটবেলা থেকেই নাচ-গান করতেন তিনি। তবে একাডেমিক পড়াশোনার প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না। তিনি পড়ালেখা করেছেন কামরুন্নেসা স্কুলে। ম্যাট্রিক পাস করে পড়ালেখায় ফাঁকি দেওয়ার চিন্তা থেকে গার্হস্থ্য অর্থনীতি নিয়ে পড়তে চান তিনি। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর দেখলেন বিষয়টি আসলে তেমন নয়। পরে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়েছেন বিদেশে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে কথা বলেন এই গুণী মডেল।

প্রতিদিনের সংবাদ : ফ্যাশন ডিজাইনের প্রতি আগ্রহের কারণ কী?

বিবি রাসেল : ছোটবেলায় আমার মা তিন বোনের কাপড় সেলাই করে দিতেন। এতে অন্য বোনেরা খুশি হলেও আমি মায়ের কাজে খুঁত ধরতাম। তখন বাবা আমাকে একটা সিঙ্গার সেলাইমেশিন কিনে দিলেন। ১০ বছর বয়স থেকেই আমি কাপড় সেলাই শুরু করি। প্রথম দিকে ভুল হলেও ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়। এরপর বাবা আমাকে একটা বই এনে দেন। তাতে দেখলাম সেলাইয়েরও একটা গ্রামার আছে। বইটা দিয়ে বাবা মূলত আমাকে এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। পরে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠান।

প্রতিদিনের সংবাদ : ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার পেছনে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল?

বিবি রাসেল : ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ার কারণে বাবা-মা যত দিন বেঁচেছিলেন তাদের আশপাশের মানুষরা বলত, মেয়েকে দর্জিগিরি করতে বিদেশে পড়িয়েছ! তবে সেসব কথায় বাবা-মা কান দেননি। কারণ তারা আমার স্বপ্নকে মূল্য দিতেন। আমি তো ১৯৯৪ সালে দেশে এসেছি। আমার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে দেশেই ফিরে আসব। আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করেছি। লন্ডনে থাকলে উন্নত জীবনযাপন করতে পারতাম। বিদেশে আমার অনেক সুবিধা ছিল। সেখানে আমাকে সবাই চেনেন। সেখানে নিজেকে মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে দাঁড় করিয়েছি। এখনো স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঘুরে বেড়াই গ্রাম-গ্রামান্তরে। বারবার ছুটে গেছি গ্রামের দরিদ্র তাঁতশিল্পীদের কাছে। তাঁতিদের মধ্যে দেখেছি সৌন্দর্য, শক্তি ও সম্ভাবনা। তারাই আমাকে আজকের অবস্থানে এনে দিয়েছেন।

প্রতিদিনের সংবাদ : ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বিবি রাসেল : নতুন প্রজন্ম থেকে ফ্যাশনের উন্নতি ঘটবে। তাদের মাধ্যমেই ফ্যাশনকে আরো উন্নত করতে চাই। দেশের কাপড় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই। এর জন্য দরকার গবেষণার। প্রয়োজন অর্থ। এখন খারাপ সময় যাচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারি দূর হলে নতুন চিন্তা-চেতনায় সবার সহযোগিতায় ফ্যাশনকে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেব।

প্রতিদিনের সংবাদ : ফ্যাশন ডিজাইনে কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন?

বিবি রাসেল : বিদেশে লেখাপড়া মোটেও সহজ ছিল না। ভর্তি হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে। ভালো ফল না থাকায় প্রথমে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার আবেদন খারিজ করে দেয়। তবে ৬ মাস পর আবার ফোন করে জানায়, একজন ফরেন স্টুডেন্ট কোর্স ড্রপ করায় আমার জন্য একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমি ইন্টারভিউ দিতে যাই। তারা আমার আত্মবিশ্বাস দেখে ভর্তি করে নেয়। দেশের বাইরে টিকে থাকা অনেক কষ্টের। আমি বিদেশে পোস্ট বিলি করে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছি। বিদেশে বড় হলে নিজেকে তৈরি করা যায়। ওখানে কার মেয়ে কিংবা কোন পরিবারের মেয়ে কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে বড় হওয়া যায় না; সম্পূর্ণ নিজের মেধা দিয়ে জায়গা করে নিতে হয়। বিদেশে লড়াই করে টিকতে হয়। যেই কলেজে আমাকে ভর্তি করতে চায়নি, সেই কলেজের আর্কাইভে আমার প্রতিটি কাজ রাখা আছে। কাজেই বাধা যতই আসুক নিজের ফোকাস থাকলে তা পেরিয়ে যাওয়া যায়। ব্যর্থতা থেকেই মানুষ সফলতার পথ খুঁজে পায়। এরপর কলেজের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় মডেলিংয়ে কাজ শুরু করি। ভোগ ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন পত্রিকার প্রচ্ছদেও নিজেকে তুলে ধরেছি। ১৯৯৫ সালে বিবি প্রডাকশন শুরু করি। ১৯৯৬ সালে একটি প্রদর্শনী করি প্যারিসে। ইউনেসকোর সহযোগিতায় সেই ফ্যাশন শোতে ‘ওয়েভারস অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে বাংলাদেশের তাঁতিদের কাজ প্রদর্শিত হয়। সেই প্রদর্শনীতে পশ্চিমারা বাংলাদেশের পোশাকের এ আয়োজন দেখে মুগ্ধ হয়। এরপর বিবির দ্বিতীয় প্রদর্শনী ‘দ্য কালারস অব বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠিত হয় স্পেনের রানির সহযোগিতায়। এ রকম প্রতিটি আয়োজনে বাংলাদেশের পোশাক, তাঁতিদের হাতে বুননের ভাঁজ নিয়ে যাই বিশ্বদরবারে।

প্রতিদিনের সংবাদ : আপনাকে ধন্যবাদ।

বিবি রাসেল : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

"