ব্রেকিং নিউজ

ঝুঁকিতে প্রবাল দ্বীপের জীববৈচিত্র্য সৌন্দর্য

* পর্যটকের ভারে কাবু সেন্টমার্টিন * যথেচ্ছভাবে গড়ে উঠছে হোটেল-মোটেল * নির্বিচারে চলছে গাছ কাটা * দ্বীপ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

সমুদ্রের উঁচু-নিচু জলতরঙ্গের বুকে সবুজের চিরায়ত সমারোহ নিয়ে দাঁড়িয়ে দ্বীপটি। নীল জলরাশি বেষ্টিত একখ- সবুজ ভূমি মুহূর্তেই মনে করিয়ে দেয় অপার সৌন্দর্যময়ী বাংলাদেশের কথা। সৈকতের শামুক-ঝিনুক, স্বচ্ছ পানির নিচে রকমারি শৈবাল আর সাগর তীরের ঝাউগাছ মিলে দ্বীপটি যেন এক স্বর্গপুরী। যার রূপ-সৌন্দর্য এক দেখাতেই পাগল করে যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে। এটি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশের প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। দেশের অসংখ্য দ্বীপের ভিড়ে সেন্টমার্টিনের রূপ ঐশ্বর্যে অতুলনীয়। এখানে সাগরের জলতরঙ্গের সঙ্গে গাছগাছালির সবুজের সমারোহ অপরূপ মিতালী তৈরি করে দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশকে করেছে আরো বেশি মোহনীয় ও আকর্ষণীয়। কিন্ত এই অপার রূপ-সৌন্দর্য মলিন হতে চলেছে। মানুষের নানা আঘাতে দগদগে ক্ষত এখন এই দ্বীপটিকে করছে সৌন্দর্যহীন।

অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ, যথেচ্ছভাবে হোটেল-মোটেল নির্মাণ ও নির্বিচারে গাছ কেটে বন উজাড় করায় হুমকিতে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য। এছাড়া মানুষের মলমূত্র ও প্লাস্টিকসহ নানা বর্জ্য বিষিয়ে তুলছে এই আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রটি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ-প্রতিবেশে। তবে দ্বীপটি রক্ষায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনা নিয়ে গত বছরের ৩ মার্চ পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সভা করেছিল। কিন্তু দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আশানুরূপ সিদ্ধান্ত আসেনি এখনো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ৮ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটিতে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার পর্যটক সেখানে অবস্থান করেন। এতে ১৮ হাজার মানুষের চাপ নিতে হয় দ্বীপটিকে। স্বচ্ছ পানি ও চারপাশজুড়ে প্রবাল পাথরবেষ্টিত পুরো দ্বীপটিই যেন নৈসর্গিক। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার সীমান্তের পার্শ্ববর্তী ৮.৩ বর্গকিলোমিটারজুড়ে এটির অবস্থান। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্রও। তবে দ্বীপটি এখন হারাতে বসেছে তার প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য। চারদিকের বাতাসে দুর্গন্ধ। যেন দ্বীপটিই মুমূর্ষু হয়ে পড়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং সিপিআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুদ্দোহা প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, সেন্টমার্টিন দ্বীপের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ আগে থেকেই শুরু করা উচিত ছিল। কারণ এরই মধ্যে হুমকি শুরু হয়ে গেছে। সেই অর্থে বলা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়ে গেছে। এই দ্বীপ বাঁচাতে হলে রাতে পর্যটকরা সেখানে থাকতে পারবে কি না কিংবা বছরের কোন মৌসুমে এটি উন্মুক্ত থাকবে সে বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। শামসুদ্দোহা বলেন, শুধু পর্যটক নন; সেখানে যারা স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছে তারাও পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি। কারণ স্থায়ী বাসিন্দাদের বংশবৃদ্ধির ফলে জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এই দ্বীপের ধারণক্ষমতা কতটুকু সেটাও গবেষণা করে নির্ধারণ করে দিতে হবে। অন্যথায় স্থায়ী বাসিন্দাদের মাধ্যমে বংশবিস্তার হয়ে তারাও এই দ্বীপটির জন্য সবসময় হুমকি হয়ে কাজ করবে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত সংখ্যার বেশি হলে বাড়তি জনবসতি স্থানান্তরের পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে।

পরিবেশ বিষয়ে অভিজ্ঞ এই পরামর্শক বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু আইন করলে হবে না সেটার প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকবে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি করতে হবে, যাতে এই দ্বীপের এখন পর্যন্ত যা ক্ষতি হয়েছে আগামীতে তা আর বাড়তে না পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর এটি নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের পর সম্প্রতি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায়। বিআইডব্লিউটিএ’র সচিব মোহাম্মদ আবু জাফর হাওলাদারের সই করা এক চিঠিতে দ্বীপটির পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষে বিষয়টি তোলা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দীন চৌধুরীর কাছে।

প্রবাল দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিআইডব্লিউটিএর দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দীন চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ পর্যটকদের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। কিন্তু প্রকৃতগত কারণে এবং পর্যটকদের অসচেতনার কারণে আজ এই প্রবল দ্বীপটি হুমকির মুখে। এই কাজটি যদিও পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের কাজ। তবুও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কিছু করণীয় আছে। সেই দিক বিবেচনায় আমরা পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সংরক্ষণে একটি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এটি বাস্তবায়নে কীভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। এ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপদ দ্বীপে উঠার জন্যও কিছু পদক্ষেপ রয়েছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএর চিঠিতে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকসহ সর্বসাধারণকে সচেতন করার জন্য প্রচার, লিফলেট বিতরণ ও পত্রিকায় সতর্কীকরণ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ ছয় ধরনের সতর্কমূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সুপারিশ করা হয়েছে কঠিন তরল বা যেকোনো বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে ফেলার ওপর নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত নির্দেশনা জারির ব্যবস্থা করতে। মূল ভূখন্ড হতে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকবাহী জাহাজ, লঞ্চে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিন স্থাপন ও এর ব্যবহার নিশ্চিত করা। পানি বা অন্য স্থলজ বা জলজ প্রাণীকে চিপস্ বা যেকোনো ধরনের খাবার পরিবেশন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রতিটি জাহাজ বা নৌযানে কমপক্ষে ২-৩ জন স্টাফকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রাখা এবং মূল ভূখন্ড থেকে দ্বীপে ভ্রমণকারীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনলাইন নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করা।

সূত্র মতে, মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশে বলা হয়েছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের রাতযাপন নিরুৎসাহিত করা; যদি কোনো পর্যটক একান্তই সেখানে থাকতে চান তাহলে জাহাজে বা নৌযানে অবস্থান করা এবং টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত নৌরুট এবং সেন্টমার্টিন এলাকাকে অথনৈতিক সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা উচিত। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দুর্যোগকালীন পর্যটকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের জন্য আরোহণ ও অবরোহণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের জেটি স্থাপন করার সুপারিশ রয়েছে যা বিআইডব্লিউটিএ করে থাকে।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য মতে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার।

জানা যায়, সেন্টমার্টিনে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ক বা কড়িজাতীয় প্রাণী, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৫ প্রজাতির ডলফিন, ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২ প্রজাতির বাদুড়সহ নানা প্রজাতির বসবাস ছিল। সেন্টমার্টিন দ্বীপের পাশে ছেঁড়া দ্বীপ। এ দ্বীপের চারদিকে রয়েছে প্রবাল, পাথর, ঝিনুক, শামুকের খোলস, চুনাপাথরসহ প্রায় কয়েক শত প্রজাতির সামুদ্রিক জীব। এখন জনশূন্য এই ছেঁড়া দ্বীপের অপরূপ দৃশ্য দেখতেও কাঠের অথবা স্পিডবোটে ছুটে যাচ্ছে পর্যটকরা। এতে দিন দিন এ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এবং সংবেদনশীল এই দুটি দ্বীপকে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

 

"