জামিন জালিয়াতিতে ক্ষুণ্ণ আদালতের ভাবমূর্তি

আপনার কি দায়িত্ব নেই - আইনজীবীকে হাইকোর্ট

প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক

আদালতের সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে দিনের পর দিন জামিন জালিয়াতি নতুন নয়। তবে এবার মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, জব্দ তালিকা ও রায় বদলে জামিন চাওয়ার ঘটনা বিচার বিভাগের ইতিহাসে বড় ও চাঞ্চল্যকর। এই জালিয়াতিতে বিচারিক আদালতের সংশ্লিষ্ট নথিই বদলে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার একমাত্র আসামিকে জাল নথিতে দুই নম্বর আসামি দেখানো হয়েছে। আর মামলার এক নম্বর আসামি দেখানো হয়েছে অন্যজনকে। আবার অস্ত্র (পিস্তল) উদ্ধার করা হলেও উল্লেখ করা হয়েছে চায়নিজ কুড়াল। এ ছাড়া সাক্ষীদের জবানবন্দিও বদলে ফেলেছে জালিয়াত চক্র। তবে শেষমেশ জামিন হয়নি ওই আসামির।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, একটি পিস্তল, গুলিসহ ২০১৮ সালে গ্রেফতার হন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কায়েতপাড়ার নিজাম উদ্দিনের ছেলে আবদুস সাত্তার। পরে ওই মামলায় একমাত্র আসামি সাত্তারকে ১৭ বছরের কারাদ-াদেশ দেন বিচারিক আদালত। এরপর কারাগারে থেকেই তিনি জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন জানান। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে আসামি সাত্তারকে জামিন দেন হাইকোর্ট। তবে জামিনের আদেশ হলেও পরে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়, এই অস্ত্র মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, জব্দ তালিকা ও রায় পরিবর্তন করে জামিন চাওয়া হয়েছে। পরে ওই জামিন বাতিল করায় আসামি কারাগার থেকে বের হতে পারেনি।

গত বুধবার মামলাটির শুনানিতে আদালতে আসামির পক্ষে হাজির ছিলেন আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমান। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।

জামিন আবেদনের শুনানিকালে হাইকোর্ট বলেন, জামিন জালিয়াতি চক্র নথি জাল করে কত জামিন আদেশ হাসিল করে কে জানে? হয়তো আমরা সব ধরতে পারি না। কিন্তু নথি তৈরি করে এ রকম জামিন জালিয়াতি তো হচ্ছে।

জামিন আবেদনের শুনানিতে আসামি সাত্তারের আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমানকে উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেন, এই জামিন জালিয়াত চক্র আপনাকে চিনল কীভাবে? (এর আগেও এই আইনজীবীর একটি মামলায় জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে) আরো দুটি জামিন জালিয়াতির মামলায় আপনি ও আপনার ক্লার্ক সোহেল রানার নাম এসেছে। একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে কি আপনার কোনো দায়িত্ব নেই? মামলা পেলেন আর দাঁড়িয়ে গেলেন? জালিয়াত চক্র আপনার ওপর ভর করেছে কেন?

জবাবে আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমান বলেন, জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরে আমি আসামির এলাকায় আমার ছেলে ও দুই সহকারীকে পাঠিয়ে তথ্য নিয়ে এসে আদালতে দাখিল করেছি। শেষ বয়সে এসে আমাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, আমি লজ্জিত!

পরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী আদালতকে বলেন, ‘এই অস্ত্র মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, জব্দ তালিকা, সাক্ষ্য ও রায় পরিবর্তন করে জামিন চাওয়া হয়েছে। এর চেয়ে বড় জালিয়াতি বিচার বিভাগে হয়েছে কি না, আমি জানি না!’

এ সময় আদালত বলেন, সব নথিই তো জাল। এ রকম অনেক জালিয়াতি হচ্ছে, হয়তো আমরা ধরতে পারি না।’

এরপর আসামি সাত্তারের আইনজীবী শেখ আতিয়ার রহমানের প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক আদালতকে বলেন, ‘তিনি বৃদ্ধ মানুষ। তিনি জালিয়াত চক্রের তিনজনের নাম আদালতে দিয়েছেন। ওই আবেদন গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দিয়ে দিন।’

জবাবে হাইকোর্ট উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা কক্সবাজারের সাড়ে সাত লাখ ইয়াবা মামলায় জামিন জালিয়াতির ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানানো হয়নি।’

পরে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্টে জামিন জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারকে মামলা দায়েরের এ নির্দেশ দেওয়া হয়। জালিয়াতিতে জড়িতরা হলো আসামি আবদুস সাত্তার, দুই কারারক্ষী বিশ্বজিত ওরফে বাবু ও খায়রুল, জামিন আবেদনের এফিডেভিটকারী আসামির বাবা নিজামুদ্দিন এবং মামলার তদবিরকারক।

এ ছাড়া তদন্তে আসামিপক্ষের আইনজীবী জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা সাত্তারের জামিন বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।

এর আগেও হাইকোর্টে বহুবার জামিন জালিয়াতির এমন ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু সেসব জালিয়াতির ঘটনায় মাদক উদ্ধারের সংখ্যা, পরিমাণ কিংবা আসামির নাম বা সাজা পরিবর্তনের মতো নথি জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সাত্তারের মতো করে বিচারিক আদালতের যাবতীয় সব নথি বদলে ফেলা, তথা জালিয়াতির ঘটনায় এটাই সবচেয়ে বড় বলে মনে করছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী।

এসব জালিয়াতির ঘটনায় বিব্রত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। এ বিষয়ে সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘তদন্ত ছাড়া আইনজীবীকে দায়ী করব না। তবে কোনো আইনজীবী জড়িত থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জামিন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের জালিয়াতিতে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।’

 

 

"