আমাকে নিয়ে সমালোচনা অমূলক, ভিত্তিহীন

একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান, তার নিয়োগ নিয়ে সময়ে সময়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, এর জবাবে তিনি বলেছেন এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি আরো বলেছেন, মানুষ ভুল ধারণা থেকেই সংস্থার প্রধান কিংবা আমাকে নিয়ে সমালোচনা করে। তাদের সমালোচনাটা আমি বলব অমূলক। তিনি আরো বলেছেন, ওয়াসার কার্যক্রম কীভাবে ও কোন নীতিমালায় পরিচালিত হচ্ছে, সে সম্পর্কে অনেকের জানা নেই। সেই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই ওয়াসার এমডি কিংবা আমাদের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করতে কেউ কেউ কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। এসব সমালোচনাকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি; কারণ তাদের সমালোচনা আমাকে আরো ভালোভাবে কাজ করতে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগায়।

ভঙ্গুর ওয়াসাকে একটা সাফল্যের জায়গায় নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে সংস্থার প্রভাবশালী এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো বলেন, ওয়াসা একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব পরিম-ল থেকেই ঘোষণা করা হয় অর্থবছরের বাজেট। এ বাজেটের আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকার কিংবা মন্ত্রণালয় নয়, ওয়াসা বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। ঢাকা ওয়াসা পরিচালিত হয় ১৯৯৬ সালে পাস হওয়া ‘ওয়াসা অ্যাক্ট’ অনুযায়ী। এ আইনে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন এমডি। সংস্থার প্রধান দায়িত্বটি সঠিক ও সূচারুরূপে পালন করতে পারছেন না কি না সেটি তদারকি করাই বোর্ডের মুখ্য কাজ। আর সেটা তারা করছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এই তদারকির মাধ্যমে সংস্থার প্রধান ও বোর্ডের মধ্যে সখ্য তৈরি হয়, সে পরিবেশ ওয়াসা পরিম-লে আছে।

সুপেয় পানি সরবরাহ করছে ওয়াসা এ দাবি করে তিনি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় ওয়াসা বিশ্বের কাছে একটি রোল মডেল, সেটি ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। দাতা কিংবা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো এর কার্যক্রমের প্রশংসা জানিয়ে চিঠি দিচ্ছেন। তারা বলছেন, ভারত কিংবা পাকিস্তান অথবা পার্শ্ববর্তী অন্য দেশের তুলনায় পানি সরবরাহ, বিপণন ও ব্যবস্থাপনায় সাফল্য দেখিয়েছে ঢাকা ওয়াসা।

দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার গাজী শাহনেওয়াজ।

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আপনি রেকর্ড করছেন। অথচ প্রতিবার চুক্তির নিয়োগ বৃদ্ধির আগে ও পরে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা হয়েছে। এসব বিতর্ক ও সমালোচনা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন। পাশাপাশি আপনি কি মনে করেন এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে? এবারো কি আপনার চুক্তির মেয়াদ বাড়ছে এ বিষয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী?

জবাবে তাকসিম এ খান বলেন, প্রথমে বলে রাখি, ঢাকা ওয়াসার এমডির নিয়োগটি চুক্তিভিত্তিক নয়। সরকার কিংবা মন্ত্রণালয় চাইলে সরাসরি এ পদে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে না। কেননা এটি একটা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান।

ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের এমডি হিসেবে যাকে যোগ্য মনে করে, তার নামটি (একজনের) প্রস্তাব আকারে সুপারিশ জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আর এটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী সুপারিশকারী ব্যক্তিকে দায়িত্ব পালনের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই অর্থে বলা যায়, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি রুটিনওয়ার্ক। তিনি বলেন, আরেকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ এলজিইডি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীরা মন্ত্রণালয়ের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ; কারণ সেখান থেকেই তাদের নিয়োগ হয়।

এদিক থেকে ব্যতিক্রম ওয়াসার প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ এমডি। কারণ মন্ত্রণালয় নয়, প্রতিষ্ঠানের বোর্ডের কাছে তিনি দায়বদ্ধ। আবার একই ব্যক্তি একই পদে সর্বোচ্চ কতবার বা কত বছর নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যাপারে আইনে কিছু বলা নেই। তাই যোগ্যতা অনুযায়ী বোর্ড উপযুক্ত এবং যোগ্য মনে করায় বারবার আমাকে নিয়োগ দিচ্ছে। তাই বলা যায়, এই নিয়োগ আমার স্বার্থে নয়; প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে হচ্ছে। এতে বোর্ডের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে সমালোচনা করাটা অমূলক।

বোর্ড মনে করছে আমার দায়িত্বকালে ঢাকা ওয়াসা সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিবেচনায় যোগ্য হিসেবে আমাকে বারবার এই পদের (এমডি) জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে। এটিকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার কোনো সুযোগ নেই। কারণ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ঢাকা ওয়াসাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছি বা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি, তা বিশ্বের কাছে ঢাকা ওয়াসা এখন ‘রোল মডেল’।

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ওয়াসার কেনাকাটার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত সব কার্যক্রম স্বচ্ছ ও অনিয়মের ঊর্ধ্বে থেকে আপনি করতে পারছেন, এ বিষয়ে আপনি কতভাগ সৎ বলে মনে করেন?

জবাবে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, কেনাকাটা থেকে টেন্ডার প্রক্রিয়া কোনোটিতেই অস্বচ্ছতার সুযোগ নেই। ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে কেনাকাটাÑ সবকিছুর জন্য বার্ষিক একটা বাজেট ঘোষণা করা হয়। এই বাজেট দিয়ে থাকেন যিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থাৎ এমডি। কিংবা কেনাকাটায় স্বচ্ছতা না থাকলে বোর্ড অবশ্যই ব্যয়িত বাজেট অনুমোদন দিতেন না। এই কাজটি সফলভাবে করতে পারছি এটাই অনেকের কাছে প্রতিহিংসার কারণ বলে আমি মনে করি।

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা ওয়াসা কতটুকু দুর্নীতিমুক্ত এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার প্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপ কী, ব্যাখ্যা করে বলবেন কি?

জবাবে প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, বর্তমান সরকারের নীতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে। সেটি আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে দুর্নীতির দায়ে কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ারকে চাকরিচ্যুত করেছি, এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। দুর্নীতি করলে চাকরিতে বহাল থাকা যায় না সেটি আমিই প্রমাণ করে দিয়েছি। এখনো তিনজন ইঞ্জিনিয়ার বরখাস্ত আছেন, বিভাগীয় তদন্ত চলছে, প্রমাণ হলে তাদেরও চাকরি যাবে।

অনেকটা অনুযোগের সুরে আক্ষেপ করে এই এমডি আরো বলেন, ঢাকা ওয়াসায় কিছু দুর্নীতিবাজ আছেন, যারা আমার স্বচ্ছতার কারণে অবৈধ পন্থায় কোটিপতি হতে পারছেন না, তারাই বিভিন্ন মহলকে কাজে লাগিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তবে, আমি শতভাগ সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি বলেই বোর্ড এমডি হিসেবে আমার বাইরে অন্য কাউকে বিকল্প চিন্তা করছে না। এজন্য বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর তনয়া শেখ হাসিনা এবং মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারাও আমার বারবার প্রতি আস্থা রেখেছেন বা রাখছেন।

তিনি বলেন, আমিই প্রথম ২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে হটলাইন ১৬১৬২ চালু করেছিলাম। আপনাকে নিশ্চিত করেই বলতে পারি, এ ক্ষেত্রেও আমি ‘রোল মডেল’। কারণ ২০১৭ সালে যদি কোনো ব্যক্তি হটলাইনে ফোন করে অভিযোগ জানিয়ে থাকেন, আপনি খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, সেই অভিযোগেরও আমরা নিষ্পত্তি করেছি। আর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে প্রতিনিয়ত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমি নিজেকেও ছাড় দিই না যোগ করেন টানা ষষ্ঠবারের মতো ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাওয়া এই দক্ষ ও চৌকস প্রকৌশলী।

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় ঢাকা ওয়াসা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এর বাজেট প্রণয়ন থেকে সব ব্যয় কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয় এবং কার কাছে প্রতিষ্ঠানটি জবাবদিহি করে থাকে?

জবাবে প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, ঢাকা ওয়াসা দুই ধরনের বাজেটে কাজ হয়, একটি নিজস্ব অর্থায়নে, আরেকটি দাতা সংস্থার অর্থায়নে। এর মধ্যে আগেই বলেছি, নিজস্ব বাজেটের জবাবদিহি বোর্ডের কাছে করে থাকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। সেখানেও কোনো অর্থ নয়ছয় হওয়ার সুযোগ নেই। আর দাতা সংস্থা এডিবি, ইউনিসেফসহ যারা কাজ করেন, তাদের অর্থ সরকার ও ওয়াসা যৌথভাবে তদারকি (সুপারভিশন) হয়। এখানে কাজ না করে অর্থ লোপাট করার সুযোগ নেই। কারণ তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাই করে আরেকটি প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করেন। তাদের কাছে প্রকল্পের সফল সমাপ্তি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানিপ্রাপ্তির জন্য টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকার এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে কাজ করছে, ঢাকাবাসীর জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিতে এই উদ্যোগ কতটুকু ফলপ্রসূ বলে আপনি মনে করেন এবং আপনারা রাজধানীবাসীর জন্য যে পানি সরবরাহ করছেন, সেই পানি কতটুকু মানসম্মত বলে আপনি মনে করেন এবং সরাসরি এই পানি খেলে মানবস্বাস্থ্যের জন্য কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না?

জবাবে ওয়াসার প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, ওয়াসার পানি শতভাগ বিশুদ্ধ ও সুপেয়। পানি উৎপাদন এবং ওয়াসার মেইন লাইনে সরবরাহ পানিও বিশুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় না। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকের সার্ভিস লাইন নির্মাণে মানসম্মত মালামাল অর্থাৎ পাইপ ও ফিটিংস ব্যবহার না করা হলে এবং অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দ্বারা ওয়াসার মূল পাইপে সংযোগের কাজ না করালে এতে লিক থেকে যেতে পারে। আর এসব পয়েন্টে বা কাছাকাছি যদি পয়োলাইন বা কোনো ড্রেন লাইন থাকে, তবে এর মাধ্যমে পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে ওয়াসার পানির লাইনে যদি পানির চাপ কম থাকে অর্থাৎ ভেতরে ফাঁকা থাকে, সে সময় পয়োলাইন/ড্রেনের ময়লা পানি পানির মেইন লাইন/সার্ভিস লাইনে প্রবেশ করে। পরে পানির চাপ ও প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে পাইপে প্রবিষ্ট ময়লা পানি ভালো পানির সঙ্গে মিশে গ্রাহকের রিজার্ভারে ঢুকে পড়ে। মাঝেমধ্যে আমরা এ ধরনের অভিযোগ পেয়ে থাকি, সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করে থাকি। তবে বলে রাখি, ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয়। এর আগে টিআইবি একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানে বলেছিল ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ না। তবে, তাদের ওই প্রতিবেদন আমি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় রাজধানীতে ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ঢাকা ওয়াসা। এজন্য ছয়টি প্রকল্প আপনারা বাস্তবায়ন করছেন। এর মধ্যে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প হচ্ছে সায়েদাবাদ ফেস-৩, পদ্মা যশলদিয়া ও গান্ধবপুর পানি শোধনাগার। এই প্রকল্পগুলোর সার্বিক অবস্থা কী?

জবাবে ঢাকা ওয়াসার এমডি বলেন, রাজধানীতে ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি সরবরাহের টার্গেট নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এজন্য ওয়াসা ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প রয়েছে। মহানগরীর একজন মানুষও যেন নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা হবে। সায়েদাবাদ ফেস-৩, পদ্মা যশলদিয়া ও গান্ধবপুর পানি শোধনাগার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে গান্ধবপুর বাদে বাকি দুটি প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ। বৃহৎ তিনটি প্রকল্প থেকে ঢাকা শহরে পানি সরবরাহ শুরু হলে মানুষ আরো শতভাগ বিশুদ্ধ পানি পাবেন। তখন নগরবাসী সরাসরি কলের পানি পান করতে পারবেন; যোগ করেন এই পরিচালক। পানি আর কাউকে ফুটিয়ে খেতে হবে না। ইতোমধ্যে পুরো ঢাকা শহরে পানির নতুন পাইপ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকার অনেক এলাকায় প্লাস্টিকের নতুন পাইপ বসানো হয়েছে। বাকি এলাকায় এ বছরের মধ্যে পাইপ স্থাপনের কাজ শেষ হবে।

ঢাকা দ্রুত সম্প্রসারণমান নগর, জনসংখ্যাও বাড়ছে। ফলে পানির চাহিদাও বাড়ছে। পানির চাহিদা পূরণে ‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’ কর্মসূচির আওতায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও গণমুখী পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেছে ঢাকা ওয়াসা।

প্রতিদিনের সংবাদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়Ñ রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের দৈনিক পানির চাহিদা কত এবং এর বিপরীতে দৈনিক কত কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছেন আপনারা; চাহিদার বিপরীতে গ্রাহকের পানিপ্রাপ্তিতে কোনো ঘাটতি আছে কি না এবং পানির স্তর দ্রুতই নেমে যাচ্ছে এ অভিযোগ প্রায় বিশেষজ্ঞরা করে থাকেন। সেখান থেকে উত্তরণের জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা ওয়াসা এবং এর সুফল কবে থেকে পাবে ঢাকাবাসী। ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থেকে পানি ব্যবহারের জন্য আপনাদের কোনো চিন্তা রয়েছে কি না?

জবাবে প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার মোট উৎপাদিত পানির শতকরা ২২ ভাগ ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাকি ৭৮ ভাগ পানি ভূ-গর্ভস্থ উৎস তথা গভীর নলকূপের মাধ্যমে আসছে। ২০২১ সাল নাগাদ ঢাকা শহরে সরবরাহ করা পানির ৭০ ভাগ আসবে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থেকে। অবশিষ্ট ৩০ ভাগ ভূ-গর্ভস্থ থেকে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার দৈনিক পানি উত্তোলন-উৎপাদনসক্ষমতা প্রায় ২৫৫ কোটি লিটার। আর দৈনিক গড়ে ২৪৫-২৫২ কোটি লিটার পানির চাহিদার পুরোটাই ঢাকা ওয়াসা সরবরাহ করছে। এর মধ্যে নতুন সংযোজন তেঁতুলঝোরা-ভাকুর্তা প্রকল্প। এখান থেকে বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে দৈনিক ১৫ কোটি লিটার পানি রাজধানীতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পানি মিরপুর এলাকায় সরবরাহ চলছে।

প্রতিদিনের সংবাদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়Ñ বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা লাভজনক নাকি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। লাভজনক হলে সেই অর্থের পরিমাণ কত। আপনার দায়িত্ব গ্রহণের আগে ওয়াসার কোনো সিস্টেম-লস ছিল কি না এবং বর্তমানে কী অবস্থা ?

জবাবে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, প্রধান নির্বাহী হিসেবে এখানে নিয়োগের সময় ঢাকা ওয়াসার আয় ছিল ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমানে আয় ১৪০০ কোটি টাকা। এটা সম্ভব হয়েছে ওয়াসার সিস্টেম-লস কমিয়ে আনা এবং গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায়ের সক্ষমতা অর্জন করা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার অংশ হিসেবে ওয়াসাকে ডিজিটাল অটোমেশন এখন সময়ের দাবি। সেই কাজটি করছি। এটি পরিপূর্ণভাবে করা হলে ওয়াসার সব কার্যক্রম চলবে কম্পিউটার পদ্ধতিতে। তখন চুরি ও অপচয় বন্ধ হবে। ইতোমধ্যে আগে গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায়ের হার ছিল ৬৪ শতাংশ, বর্তমানে ৯৮ শতাংশ। সেই অর্থে বলা যায়, রাজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে ৪০০ কোটি টাকা এবং সিস্টেম-লস কমানোর মাধ্যমে আরো ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করছে ওয়াসা। বিষয়টি টিআইবির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়নি, এটি দুংখজনক। বলে রাখি, ঢাকা ওয়াসা ঋণখেলাপি নয়। সরকারের তহবিল থেকে পাওয়া পুরো অর্থই পরিশোধ করছে। এটি ঢাকা ওয়াসার বড় সাফল্য। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন, অনেক সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ঋণখেলাপি।

তিনি আরো বলেন, ঢাকা ওয়াসা কেন রোল মডেল বলছি এবং রাজস্ব কেন বেড়েছে, তা ব্যাখ্যায় বুঝতে সক্ষম হবেন। আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতা, বেঙ্গালুরু, দিল্লি ও মুম্বাইয়ে এবং পাকিস্তানেও অনেক বস্তি রয়েছে। এই বস্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে সে দেশগুলোর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা মস্তানরা। তারা সেখান থেকে মাসে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। ওইসব দেশে শত শত রাজনৈতিক দল রয়েছে। সেখানে পানি সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করলে কেন্দ্রীয় সরকারই তাদের বিপক্ষে চলে যায়। বস্তিতে হস্তক্ষেপ করলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বলা হয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে যাবে। আমাদের এখানেও মস্তানরা বস্তি নিয়ন্ত্রণ করত। তারা ওয়াসার পানি এসব বস্তিবাসীকে দিয়ে ঘরপ্রতি ৪০০ টাকা আদায় করত। কিন্তু ওয়াসা এক টাকাও পেত না। আমি বেসরকারি সংগঠন এনজিও দিয়ে কড়াইলসহ কয়েকটি বস্তিতে পানির কল বসিয়ে দিয়েছি। সেখান থেকে পানি সøাপাই করছি। বিলের আওতায় আনায় বস্তিবাসীও লাভবান হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বাড়ছে। কারণ আগে যেখানে বস্তির মানুষদের মস্তানদের মাসে ৪০০ টাকা দিতে হতো, এখন ওয়াসাকে দেওয়া লাগছে মাত্র ১০০ টাকা। প্রতি মাসেই তাদের সাশ্রয় হচ্ছে ৩০০ টাকা। প্রকৌশলী তাকসিম এ খান অনেকটা গর্বের সঙ্গে বলেন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আমাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভূয়শী প্রশংসা করেছে। এটার জন্য বলছি, ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহে বিশ্বে রোল মডেল।

এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার এমডি আরো বলেন, ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহের এই সাফল্যের জন্য আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারদের বাইরের দেশে উচ্চ বেতনে হাইয়ার করে নিয়ে যাচ্ছে। পাশের দেশ নেপালে এখানকার ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন। সেখানের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের ইঞ্জিনিয়ারা খুবই দক্ষ এবং সাফল্যের সঙ্গে তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। এ ধরনের প্রশংসা দেশের জন্য গর্বের বলে আমি মনে করি। তাই ওয়াসার এমডি হিসেবে সরকার, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আমিও প্রশংসার দাবিদার। এসব কারণেই আমাকে বারবার নিয়োগ দিচ্ছে ওয়াসা বোর্ড।

প্রতিদিরে সংবাদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটির সভাকক্ষে ২০১৭ সালে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়েছিল; সেখানে ঢাকা শহরের সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ওয়াসা থেকে সিটি করপোরেশনের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত ছিল। বর্তমান দুই সিটির মেয়র এটির নিয়ন্ত্রণ তাদের অধীনে নিতে তৎপর আছেন, এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

জবাবে ঢাকা ওয়াসার এমডি বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহরে সুপেয় পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশনের কাজ ঢাকা ওয়াসা করলেও শুরুতে পানি নিষ্কাশনের কাজটি তাদের কাছে ছিল না। নবাব খাজা আবদুল গনি ১৮৭৮ সালে ঢাকা শহরের চাঁদিনাঘাটে একটি পানি শোধনের প্লান্ট ও পানি সরবরাহের নেটওয়ার্কের কাজ শুরু করেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর দেশের নগর ও গ্রামীণ সব এলাকার জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও জনস্বাস্থ্যের দায়িত্ব দিয়ে ‘জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদফতর’ চালু করে। এসব কাজের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরির দায়িত্বও দেওয়া হয় এই সদ্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিকে। মাত্র ১৬ বছর পার হতে না হতেই তৎকালীন সরকার মনে করল, ঢাকা শহরের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনের জন্য ওয়াসার নামে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান করা প্রয়োজন। তাই একটি বিশেষায়িত ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে ১৯৬৩ সালে ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি ও বর্ষার পানি নিষ্কাশনের কাজ জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় প্রকৌশল অধিদফতরের কাছে রয়ে গেল। তারা তখনকার ঢাকা শহর, নারায়ণগঞ্জ শহর, মিরপুর পৌরসভা ও গুলশান পৌরসভার শহর এলাকায় টাউন কমিটির সঙ্গে একযোগে কাজটি করে আসছিল। কিন্তু ১৯৮৮ সালে একটি বড় বন্যার পর ঢাকা শহরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জল নিষ্কাশনের বড় বড় প্রকল্প হতে লাগল, বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থ আসতে শুরু হলো। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের ইচ্ছায় পানি নিষ্কাশনের দায়িত্বও জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছ থেকে ওয়াসার কাছে চলে এলো। সেই থেকে ঢাকা ওয়াসা সুপেয় পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশন তিনটি কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এ তিনটি বিষয়ের মধ্যে কোনটিতে ওয়াসার সাফল্য-ব্যর্থতা কতটুকু? এ ক্ষেত্রে আমি বলব, ওয়াসার প্রধান যে কাজ, রাজধানীবাসীকে নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ করা, সেটাতে শতভাগ সফল। তবে, ড্রেনেজব্যবস্থা সাতটি সংস্থার সমন্বয়ে কাজ হয়। এখানে ওয়াসার একার কোনো দায় নেই। এটি ২০১২ সালে আমি বিভক্ত দুই সিটির অধীনে এ কাজটি হস্তান্তরের জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। বলে রাখি, একজন মেয়র এটি তার অধীনে নিতে রাজি থাকলেও অন্যজনের আপত্তি ছিল। এখন নতুন দুই মেয়র নিতে যাচ্ছেন, তাহলে আমি আট বছর আগে যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, ওই সময়টা আমাকে ফিরিয়ে দিক। তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটির আর খালে বর্জ্য পড়লে সেটা পরিষ্কারের দায়িত্ব ওয়াসার, এটা কোন ধরনের নিয়ম অপনি বলেন? তিনি বলেন, ড্রেনেজসহ অন্যান্য কার্যক্রমে ওয়াসাকে সম্পৃক্ত না করা হলে ওয়াসা নাগরিক সেবায় আরো বেশি সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।

প্রতিদিনের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

 

 

"