মোতাহার হোসেন

  ০৪ অক্টোবর, ২০২২

পরিবেশ

কার্বন নিঃসরণ কমানো অপরিহার্য

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি, বদলে যাচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। বাতাসে কার্বন নিঃসরণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় উত্তপ্ত বায়ুমন্ডল, গলছে বরফাচ্ছাদিত পাহাড়। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে। এর কারণে বিগত কয়েক বছর ধরে পৃথিবীর অনেক দেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে উন্নত অনেক দেশের অঞ্চলভেদে কোথাও বন্যা, কোথাও বরফ পড়ছে আবার কোথাও ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে বনাঞ্চল। এই চিত্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিলক্ষিত হয়েছে। যা এখনো বিরাজমান। বাংলাদেশেও বিগত কয়েক বছরে প্রকৃতির মতিগতি বদলে গেছে।

প্রসঙ্গত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনই সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে। এরপরই রয়েছে ভারত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ। এদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে দিন কয়েক আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।’

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তথা বায়ুমন্ডলকে উত্তপ্ত করার জন্য কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো হলেও এই ক্ষতির বেশি মাত্রায় শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। অবশ্য বাদ যাচ্ছে না উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশও। যদিও প্রতি বছর জাতিসংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস (কপ) সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা কার্বন নিঃসরণ ২ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার করে; কিন্তু তা বাস্তবায়নে সামান্য অগ্রগতিও নেই। ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-১৫ সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা ঐকমত্য হয়েছিল বায়ুমন্ডলের তাপমাত্র ২ ডিগ্রির নিচে সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানোরও অঙ্গীকার করে। বাস্তবতা হচ্ছে উল্টো বরং পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো পাল্লা দিয়ে বাড়াচ্ছে শিল্প-কারখানা, বাড়াচ্ছে বাতাসে কার্বন নিঃসরণ। পরিণামে বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হচ্ছে। এতে ধরিত্রী অসহিষ্ণু হচ্ছে এবং রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে। পরিণামে মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে প্রকৃতি।

অন্যদিকে, চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপ ও চীনের অনেক অংশ তাপমাত্রার চরম অবস্থা দেখছে, আফ্রিকার শুষ্কতা লাখ লাখ মানুষকে অনাহারের ঝুঁঁকিতে ফেলছে আর দীর্ঘদিন ধরেই পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে ভুগছে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল। আরো উষ্ণ ও শুষ্ক মৌসুম দিন দিন স্বাভাবিক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা জানালেও বিগত কয়েক মাস অতীত ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক মাস কিনা, বিবিসির এক প্রতিবেদনে এর বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হয়েছে। শুষ্কতা পরিমাপের জন্য বিজ্ঞানীদের ব্যবহৃত পদ্ধতির একটি উপগ্রহের ছবির সাহায্যে মাটির আর্দ্রতা পরিমাপ করা। এই পদ্ধতিতে গত তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শুষ্কতার সঙ্গে এই শতাব্দীর শুরু থেকে এ পর্যন্ত গড় শুষ্কতার তুলনা করে সাম্প্রতিক চরম আবহাওয়ার প্যাটার্নের একটি চিত্র হাজির করেছে বিবিসি। দেখা গেছে, ইউরোপের বেশিরভাগ অংশে চলতি গ্রীষ্মে ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের গড়ের তুলনায় বেশি শুষ্ক পরিস্থিতি দেখা গেছে।

এর বাইরে চীনের পশ্চিম অংশও তীব্র শুষ্ক পরিস্থিতি দেখছে, অনেক এলাকা ভয়াবহ খরায় ভুগছে। সাব-সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন আফ্রিকার কিছু অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রও গুরুতর শুষ্ক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের আরেক অঞ্চল ফ্লোরিডায় সম্প্রতি ভয়াবহ হ্যারিকেনের আঘাতে লন্ডভন্ড হয় অঞ্চলের ব্যাপক এলাকা। এতে মারা যায় প্রায় শতাধিক মানুষ, নদীর লঞ্চণ্ডনৌকা ওঠে ডাঙ্গায়, বাড়িঘর ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশগত কর্মসূচি কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে এবারের গ্রীষ্মের খরা সম্ভবত মহাদেশটির ৫০০ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক অবস্থা। গেল আগস্টের শেষভাগে এই শুষ্ক মৌসুমের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ স্পেনসহ ইউরোপের প্রায় অর্ধেকই ‘মাটির আর্দ্রতার ঘাটতি’ দেখেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপ আরো বেশি ও লাগাতার খরা দেখতে পাবে। আর চলতি বছরের শুষ্ক পরিস্থিতি কৃষি, পরিবহন ও জ্বালানি উৎপাদনে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলবে।

ইউরোপের অন্যতম প্রধান নদী ও মাল পরিবহনের রুট রাইন নদীর পানি চলতি গ্রীষ্মে এতটাই নেমে গেছে যে, জাহাজ চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। জুন থেকে আগস্ট সবচেয়ে উষ্ণ তিন মাস হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং আগস্টে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিবেদনে আরো অন্তত তিন মাস ‘গরম ও শুষ্ক’ আবহাওয়া থাকবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। ইউরোপ আগেও শুষ্ক মৌসুম দেখেছে কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি গ্রীষ্ম ক্রমাগত উষ্ণ হতে দেখা যাচ্ছে। টানা গত ৫ বছর খরা হয়েছে, এই বছর ইউরোপজুড়ে যে খরা, তা কয়েকশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। কেবল কম বৃষ্টিই নয়, দিন দিন বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত ও উষ্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণে সবমিলিয়ে মাটির আর্দ্রতা কমছে, বলেছেন পোস্টড্যাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইম্প্যাক্ট রিসার্চের গবেষক ড. ফ্রেড হাটেরমান।

চলতি গ্রীষ্মে, চীন দীর্ঘ উচ্চ তাপমাত্রার সময়কাল পার করেছে, যা দুই মাসেরও বেশি স্থায়ী ছিল। এটি ১৯৬০ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছিল, বলছে চীনের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা। তীব্র গরম এবং বৃষ্টিপাতের মারাত্মক ঘাটতির ফলে চীনের সবচেয়ে বড় নদী ইয়াংসি সংকোচিত হচ্ছে। চীনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে নদীটির নিষ্কাশন এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৬০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। দেশটির দক্ষিণের বিশাল অংশ যখন খরায় পুড়ছে তখন উত্তরে তুমুল বৃষ্টিপাত নিয়ে এসেছে ভয়াবহ বন্যা।

উত্তর চীনের লিয়াও নদীর পানির স্তর ১৯৬১ সালের পর এবারই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিচের স্তরে পৌঁছেছে। দেশজুড়ে ২০১২ সাল থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে চীনের বার্ষিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা বলছে। গত জুলাইয়ে চীন সরকার ৮টি খরা সতর্কতা ও ১৩ হাজারের বেশি বৃষ্টি সতর্কতা জারি করেছিল। ২০১৯ সালের একই সময়ে দেশটি ২৮টির বেশি খরা সতর্কতা ও ১০ হাজার তীব্র বৃষ্টিপাতের সতর্কতা জারি করেছিল। একই সময়ে ব্যাপক বর্ষা ও শুষ্ক পরিস্থিতি বিশ্বজুড়েই জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে হাজির হয়েছে।

‘যখন সাইবেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে খরা বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানকার পানি সরে অন্যত্র ছোট একটি এলাকায় পড়ে, তাতে বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়।’ এমন অভিমত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের পানি বিশেষজ্ঞ পিটার গ্লিকের। খরা পরিস্থিতি ইথিওপিয়ার পূর্বাঞ্চল, কেনিয়ার উত্তরাঞ্চল ও সোমালিয়ার ২২ লাখ মানুষকে অনাহারের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। ‘মহাদেশের ওই অংশে উচ্চ তাপমাত্রার পাশাপাশি তিন বছর ধরে কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে’ বলে তথ্য দিয়েছে অক্সফাম।

সোমালিয়ায় গত মার্চ থেকে মে মৌসুমে বিগত ছয় দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডার বিশাল অংশও গড়ের তুলনায় বেশি শুষ্ক পরিস্থিতি দেখছে। কিন্তু মাটির আর্দ্রতার পরিমাণ দক্ষিণ সুদান, মৌরিতানিয়া ও সেনেগালের মতো মহাদেশটির কিছু কিছু দেশে যে তীব্র বন্যা হচ্ছে তাও দেখাচ্ছে। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের অনেক অংশ এখন গড়ের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ বৃষ্টিপাত দেখছে। ২০১০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত খরা ও বন্যার পরিমাণ ১৯৭০ থেকে ১৯৭৯ সালের তুলনায় যথাক্রমে তিন ও দশগুণ বেশি হয়েছে বলে ২০২১ সালে দেওয়া বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। বছরের পর বছর ধরে শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া দেখা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে খরা পরিস্থিতি দিন দিন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ১ হাজার ২০০ বছরের মধ্যে গত দুই দশকই যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল সবচেয়ে তীব্র খরা পরিস্থিতি দেখেছে, আবার কোথাও কোথাও তীব্র দাবানলে পুড়েছে বনজঙ্গল ও গাছপালা, পুড়েছে বনজসম্পদ। চলতি গ্রীষ্মেও গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া বেশ কয়েকটি রাজ্যে দাবানল সৃষ্টি করেছে, জলাধারে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।

আরিজোনা ও ইউটাহজুড়ে বিস্তৃত যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাধার লেক পাওয়েলের পানির স্তর ১৯৬০-এর দিকে পানি ভর্তি করার পর সর্বনিম্ন স্তরে আছে বলে জানায় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। জলবায়ু সংক্রান্ত একাধিক মডেল সংস্থা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে সামনের দশকগুলোতেও গড়ের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকবে।

এমনি এক ভয়াবহ অবস্থায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে ধরিত্রী রক্ষা, প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে দেওয়া, বনভূমি রক্ষা, নতুন নতুন বন সৃজন করা পুকুর, জলাশয়, হাওর, নদী, সাগর, মহাসাগরকে রক্ষা করা। একই সঙ্গে ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-১৫ সম্মেলনে প্রদত্ত কার্বন নিঃসরণ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা, সম্ভব হলে সর্বনিম্ন ১.৫ ডিগ্রিতে কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। এসব করতে ব্যর্থ হলে মানুষ ও প্রকৃতি ক্ষতির শিকার হবে। একই সঙ্গে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close