ড. শাহরীনা আখতার

  ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

গবেষণা

অ্যাকুইফার স্টোরেজ অ্যান্ড রিকভারি

বাংলাদেশে কৃষি জমি ক্রমশ কমছে কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ছে। ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে কৃষি জমির সর্বোত্তম ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা (Cropping Intensity) ১৯৪ ভাগ। এই নিবিড়তা আরো বাড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেচের সুবিধার অভাব, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে অনেক জমিই একবারের বেশি চাষ করা যায় না। এসব এলাকাকে আবাদের আওতায় এনে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব।

ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর অন্যতম উপাদান হলো ভূগর্ভস্থ পানি। যা দ্বারা সেচের ৭৮ ভাগ ও পানির ৯৫ ভাগ চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে। এ পানির উৎস হলো স্থানীয় বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ সেচযন্ত্র দিয়ে সেচ কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা ওয়াসা ও বিভিন্ন কল-কারখানায়ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত পানির প্রায় পুরোটাই বর্ষাকালে রিচার্জড হয়ে যেত। বর্তমানে দেশের অনেক স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির শূন্যতা শতভাগ রিচার্জ হয় না। ক্রমপুঞ্জিভূত এই ঘাটতির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। আর ধান চাষের প্রধান উপকরণ হচ্ছে সেচের পানি। দেশের মোট খাদ্য চাহিদার প্রায় ৩০ ভাগ উৎপাদিত হয় উত্তরাঞ্চল থেকে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এখানে কিছু এলাকায় অগভীর নলকূপ (স্যালো টিউবওয়েল) দ্বারা সেচ কাজ পরিচালনা করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত অনেক এলাকায় হাজার হাজার হ্যান্ড টিউবওয়েল পানি উত্তোলন করতে পারে না এবং অগভীর নলকূপ (স্যালো টিউবওয়েল) দ্বারা পানি উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। এই সমস্যাগুলো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (যেমন- বরেন্দ্র অঞ্চল) এবং উত্তর-মধ্যাঞ্চলে (যেমন- মধুপুর ট্র্যাক্ট) আরো প্রকট। অন্যদিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অনেক জমিই লবণাক্ততার কারণে বছরে শুধু একবার চাষ করা সম্ভব হয়।

রিচার্জ-ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারকেই দায়ী করা হয়। ফলশ্রুতিতে, ওইসব এলাকায় বিএডিসি ও বিএমডিএকে নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন করতে নিষেধ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৫৪ সেমি, তা সত্ত্বেও আমরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে পারছি না। কারণ বাংলাদেশের ভূমি সমতল। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সেচ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সেচ কাজে তা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

নাটোরের নলডাঙ্গা এবং রাজশাহীর পবা এলাকায় একটা সমস্যা দেখা যায়। এখানে একদিকে যেমন বর্ষাকালে পানি জমে থাকার কারণে কৃষকেরা উচ্চফলনশীল আমন ধানের আবাদ করতে পারে না, অন্য দিকে জমে থাকা পানি দেরিতে নিষ্কাশনের কারণে এসব এলাকায় বোরোধানের আবাদও ব্যাহত হয়। এসব এলাকার কৃষকরা এই জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য পাইপ বোরিং করে এই জমে থাকা পানিকে সরাসরি ভূগর্ভে ঢুকিয়ে দেয়। এতে করে ভূর্গস্থ পানির ব্যবহারিক উপযোগিতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা।

এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য কিছু এনজিও বিদেশি ফান্ডের সহায়তায় প্রকল্প এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি (Managed Aquifer Recharge) ব্যবহারের উদ্দেশে রিচার্জ অবকাঠামো স্থাপন করেছে। এটি একদিকে যেমন বর্ষাকালে ভূর্গস্থ পানি রিচার্জের কাজে ব্যবহৃত হয়, পরে শুষ্ক মৌসুমে পানি উত্তোলন করে সেচের কাজেও ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে Surface Runoff কে রিচার্জের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রথমে Surface Runoff কে ফিল্টার চেম্বারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে পরিশুদ্ধ করে তারপর ভূগর্ভে প্রেরণ করা হয়।

কৃষিতে এই প্রকল্পের অবদান কী : রিচার্জ পদ্ধতিতে খরাপ্রবণ এলাকায় বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিকে সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ওপরে তুলে আনা সম্ভব। যেহেতু একই নলকূপের সাহায্যে রিচার্জ ও সেচ প্রদান করা হবে, তাই আলাদা কোনো অবকাঠামো স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সেচের অভাবে অনেক জমিই পতিত থেকে যায়। এসব এলাকায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রেরণ করে লবণাক্ততার পরিমাণ হ্রাস করা যেতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে শুষ্ক মৌসুমে এই পানি দিয়ে সেচ প্রদান করা যেতে পারে। ফলে যেসব জমি এক ফসলি ছিল সেগুলোকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করা সম্ভব। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা সেচ কাজে ব্যবহারের এই উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেজন্য যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রিচার্জ প্রক্রিয়াটি মনিটরিং করা প্রয়োজন। কেজিএফের অর্থায়নে সে কাজটিই করছে বুয়েট ও বিএডিসি।

বুয়েট ও বিএডিসি কেন যৌথভাবে কাজ করছে : ২০১৮ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, নাটোরের নলডাঙ্গায় বর্ষাকালের বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন (৪-৬ মাস) ফসলের জমিতে জমে থাকে। স্থানীয় জনগণ এই জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য একটি পাইপ সরাসরি ভূগর্ভে ঢুকিয়ে দিয়ে তার সাহায্যে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করছে। বুয়েট ও বিএডিসির গবেষকরা এটা পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখতে পায় যে, এই এলাকায় একদিকে যেমন বর্ষাকালের জমে থাকা পানি দেরিতে অপসারিত হয় (অনেক সময় জানুয়ারি পর্যন্ত)। অন্য দিকে মার্চণ্ডএপ্রিল মাসে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে শ্যালো টিউবওয়েল দিয়ে সেচ প্রদান করা সম্ভব হয় না।

গবেষকরা পরিদর্শনের সময় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারে যে, এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য স্থানীয় এনজিও বিদেশি ফান্ডের সহায়তায় প্রকল্প এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি রির্চাজের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি (Managed Aquifer Recharge) ব্যবহারের উদ্দেশে রিচার্জ অবকাঠামো স্থাপন করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি ফান্ডের আর্থিক সহায়তায় এ রকম আরো অনেকগুলো ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। যা মোটেও কাম্য নয়। কারণ ভূগর্ভস্থ রিচার্জ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত। যে কেউ চাইলেই এটি যেখানে সেখানে করতে পারে না। এটির জন্য অবশ্যই সরকারের অনুমতির প্রয়োজন। সরকারকর্তৃক নির্দেশিত নিয়মকানুন মেনেই ভূগর্ভস্থ রিচার্জ প্রক্রিয়াটি করা উচিত। যেমন- অস্ট্রেলিয়াতে ভূগর্ভস্থ রিচার্জের জন্য সরকারের থেকে লাইসেন্স নিতে হয়, সেটাও দুই ধাপে হয়। প্রথমে তিন বছরের জন্য পাইলট প্রকল্প আকারে প্রজেক্ট নেওয়া হয়। এই তিন বছরের ফলাফল যদি ভালো হয়, তবেই দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ রিচার্জের জন্য সরকারের কোনো সংস্থা দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। এছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো গাইডলাইনও প্রস্তুত করা হয়নি। এর প্রধান কারণ দেশের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর ব্যাপকভাবে টেকনিক্যাল এনালাইসিস করা হয়নি। এজন্যই এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এনজিও কর্তৃক স্থাপনকৃত ভূগর্ভস্থ রিচার্জ প্রক্রিয়াটি মনিটরিং এবং টেকনিক্যাল এনালাইসিস করা হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ রিচার্জ প্রক্রিয়ার বিজ্ঞানটা কী : ভূগর্ভস্থ রিচার্জ প্রক্রিয়াটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। কোনো রকম টেকনিক্যাল এনালাইসিস ছাড়া যদি ব্যাপক হারে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে কারণ একবার ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হলে, তা পরিশোধনযোগ্য নয়। এনজিওরা শুধু রিচার্জ অবকাঠামোটি স্থাপন করেছে বিদেশি সহায়তায়। যেকোনো রিচার্জ অবোকাঠামো স্থাপনের পূর্বে উপকারভোগীদের এই পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিলক্ষিত হয় যে, তারা এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে অবহিত নয়। তাদের কাছে এটি শুধুমাত্র দ্রুত জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং সেচনলকূপ হিসেবে পরিচিত। কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ করার সময় অবশ্যই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। যা এনজিও কর্তৃক করা হয়নি।

বাংলাদেশে এ প্রকল্প কীভাবে অবদান রাখবে : পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিভিন্ন নীতিমালা, গাইডলাইন, ম্যানুয়াল, রুলস, রেগুলেশন ইত্যাদি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো গাইডলাইন তৈরি করা হয়নি। কারণ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে টেকনিক্যাল এনালাইসিস করা হয়নি যা অতিব জরুরি। কারণ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারের ওপর অনেক চাপ পড়ছে যা হ্রাস করা যেতে পারে এই রিচার্জ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সঠিক গাইডলাইন। এই প্রকল্পের ফলাফল এই গাইডলাইন তৈরিতে সহায়তা করবে।

এই প্রকল্পে কী কী পর্যালোচনা করা হচ্ছে : এ­ই প্রকল্পে রিচার্জকৃত পানির গুণাগুণ প্রতি তিন মাস পরপর (Pre-monsoon, Monsoon, Post monsoon, Dry season) টেস্ট করা হচ্ছে, পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও মনিটরিং করা হচ্ছে। রেইনগেজ এর সাহায্যে বৃষ্টির পরিমাপ মনিটরিং করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে একুইফার পাম্পিং টেস্ট, লিথোলোজি টেস্ট এবং ইনফিল্ট্রেশন রেট মনিটরিং টেস্টের এর মাধ্যমে রিচার্জ প্রক্রিয়া ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে। যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কি পর্যায়ে রয়েছে এবং এর গুণাগুণে কোনো প্রভাব পড়ছে কি-না সে ব্যাপারে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

লেখক : টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close