সুকান্ত দাস

  ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২

দৃষ্টিপাত

পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকেও ভয়াবহ

পৃথিবীতে কালে কালে অনেক মহামারি এসেছে এবং তার থেকে মানুষের মুক্তিও মিলেছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে পরিবেশকে যে দূষিত করে পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলা হচ্ছে তার থেকে মনে হয় খুব সহজে পরিত্রাণ মিলবে না। বিশ্বজুড়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে পরিবেশদূষণের লঙ্কাকান্ড। হারিয়ে যাওয়া সবুজ পৃথিবী এখন আর নেই। দূষণের কালো চাদরে ঢাকা পড়েছে পৃথিবী। দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। উন্নত জীবনযাপনে অতিরিক্ত নগরায়ণ করতে গিয়ে বেঁচে থাকার ভিত্তি পরিবেশকে হত্যা করছে মানুষ।

বেঁচে থাকার একমাত্র নিরাপদ অবলম্বন পরিবেশ। কিন্তু প্রকৃতি এবং পরিবেশবিরোধী কিছু কাজ আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে দূষিত করছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশদূষণের ভয়াবহতা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্প কলকারখানার বজ্র পানিতে ফেলা, ইটভাটার কালো ধোঁয়া, অবাধে প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহারসহ ইত্যাদি। পরিবেশদূষণের সবচেয়ে বড় কারণ হলো নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন এবং বনভূমি উজাড়। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। গত ৬০ বছরে ৮০টির বেশি প্রজাতির প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কয়েকশ প্রজাতির গাছপালা বিলুপ্ত হয়েছে। বাতাসে প্রতি বছর পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর ২২ কোটি টন কার্বন মনো অক্সাইড সঞ্চিত হচ্ছে। অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর যত মানুষ মারা যায় তার মধ্যে পরিবেশদূষণজনিত কারণে ২৮ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে তারা সে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। পরিবেশদূষণজনিত কারণে মালদ্বীপে এই হার ১১.৫ শতাংশ, ভারতে ২৬.৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ২২.২ শতাংশ, আফগানিস্থানে ২০.৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৩.৭ শতাংশ।

গবেষকরা মনে করেন, বিশ্বজুড়ে শহরাঞ্চলের ৮০ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করছে। বায়ুদূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। যানবাহন ও কলকারখানার ধোঁয়া বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। বায়ুদূষণকে অদৃশ্য ঘাতক বর্ণনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, প্রতি বছরে ৭০ লাখ মানুষ অপরিণত বয়সে মারা যায়। পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত মাত্রা চেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বায়ু সেবন করেন। এছাড়া বায়ুদূষণের ফলে সৃষ্ট শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত কারণে মৃত্যু ঘটে ২২ লাখের মতো মানুষের।

খাবার থেকে শুরু করে ওষুধ, প্রসাধনী অথবা প্রযুক্তিপণ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ব্যবহার করছে প্লাস্টিক। আর এই প্লাস্টিক পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে প্রসাধনী সামগ্রীতে। দিন দিন বেড়েই চলেছে। দেশে দিনে ৩৫০০০ প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহৃত হয়। এটি মাটি দূষণও করে। এটি মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। মাটিতে পানি ও প্রাকৃতিক যে পুষ্টি উপাদান রয়েছে তার চলাচল বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে মাটির গুণগত মান হ্রাস পায়। প্লাস্টিক মানুষের শরীরে আরো অনেক মরণব্যাধির পাশাপাশি ক্যান্সারের জন্য দায়ী। যদিও রিসাইকেলের মাধ্যমে প্লাস্টিক দিয়ে পরিবেশদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু ব্যবহারের সমানুপাতে প্লাস্টিক রিসাইকেলের ব্যবস্থা নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদপ্তরের গত বছরের জরিপে দেখা যায়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে শব্দের মাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে এরই মধ্যে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে যে, গার্মেন্ট খাত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সেই খাত থেকে প্রতি বছর ২৮ লাখ টনেরও বেশি বর্জ্য তৈরি হয়। দূষণের কারণে বাংলাদেশের বছরে ৬০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়, যা জিডিপি বা মোট জাতীয় উৎপাদনের ৩.৫ শতাংশ।

ঢাকা শহরে যত জলাভূমি ছিল গত চল্লিশ বছরে তার ৭৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। খাল দখল করা হয়েছে। যার ফলে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেখা যায় তীব্র জলাবদ্ধতা। কল কারখানার বর্জ্য, মানুষের বর্জ্য, ময়লা-আবর্জনা ও মৃত জীবজন্তু, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে পানি দূষিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখ। যার শতকরা ৭০ ভাগ পানিদূষণের ফলে হয়ে থাকে। জাতিসংঘের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে পরিবেশদূষণের ফলে এশিয়ার আকাশে তিন কিলোমিটার পুরু ধোঁয়াশা জমেছে, যা অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটাতে পারে। এটা পৃথিবীতে বসবাসকারী সব প্রাণী এবং উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর।

বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রিন হাউস ইফেক্টের কারণে তাপ বৃদ্ধির ফলে খুব তাড়াতাড়ি মেরু অঞ্চলের ও পর্বত শ্রেণির বরফ গলে সাগরের উচ্চতা ১-২ মিটার বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ এবং উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রের লোনা পানির নিচে ডুবে যাবে। কোটি কোটি মানুষের খাদ্য সংকট দেখা দিবে। এতসব দূষণের মধ্যে পরিবেশ চরমভাবে দূষিত হচ্ছে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন এবং বনভূমি ধ্বংসের কারণে। বনভূমিই সমগ্র পৃথিবীকে টিকিয়ে রেখেছে। সব কাজে আমরা বৃক্ষের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যের উৎস, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিত্ত বিনোদন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়া বেঁচে থাকার সর্বপ্রথম চাহিদা অক্সিজেন আমরা বৃক্ষ থেকে পাই। বৃক্ষ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ ১০ জন মানুষের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করে। প্রতিদিন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ পরিবেশ থেকে ৫৫০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণ করে। বাণিজ্যিকভাবে যার দাম প্রায় চার লাখ টাকা। আর আমরা পরিবেশ থেকে এই অক্সিজেন বিনামূল্যে পাই।

একটি গাছ বাতাস থেকে ৬০ পাউন্ডের বেশি বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে এবং ১০টি এসির সমপরিমাণ তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ শব্দদূষণ রোধ করে। এক হেক্টর পরিমাণ মাঝারি মানের বনভূমি ১০ ডেসিবল শব্দ হ্রাস করতে পারে। পরিবেশ রক্ষার জন্য দেশের শতকরা ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি দরকার। দেশে কাগজে-কলমে ১৭ শতাংশ থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা ৮ থেকে ১০ শতাংশের বেশি নয়। প্রতি বছর ১.৪৭ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতি স্থাপন এবং শিল্পায়নের ফলে ১ শতাংশ হারে আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস ও ৩.৩০ শতাংশ বন নিধন হচ্ছে। প্রতি মিনিটে ২১ হেক্টর কৃষিজমি বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর ৭৫ লাখ হেক্টর জমি মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। প্রতি মিনিটে ৫০ হেক্টর জমি বালুকাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশের রক্ষাকবচ হলো সুন্দরবন। সে সুন্দরবনের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। আমরা নিজে হাতে আমাদের বেঁচে থাকার সম্বল নষ্ট করে দিচ্ছি। প্রতি বছরই কোনো না কোনো সময় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের ওপর আঘাত হানে। কিন্তু আমাদের রক্ষাকবচ সুন্দরবন তা প্রতিহত করে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। আর আমরাই সেই রক্ষাকবচকে ধ্বংস করছি। পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে একসফঙ্গ অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার নিক্ষিপ্ত দুটি পারমাণবিক বোমা জাপানের হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে ওই এলাকায় বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে। মাটি কয়েক মিটার পর্যন্ত পুড়ে লাল হয়ে গিয়েছিল। এই ক্ষতি একসময় পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু পরিবেশদূষণের জন্য পৃথিবীর যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। পৃথিবী আজ হুমকির মুখে। পরিবেশদূষণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখনই পরিবেশদূষণ রোধ না করতে পারলে একসময় পৃথিবীর মানচিত্রই বদলে যাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close