মো. আতিকুর রহমান

  ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

বিশ্লেষণ

পানি সংরক্ষণ ও সুষম বণ্টন জরুরি

বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সুপেয় পানি প্রাপ্যতায় শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ইতোমধ্যে সারা দেশে পানির চরম হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। রাজধানীতে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাহিদার কারণে এর আশপাশের এলাকাগুলোতে পানির এই সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে নদীতে পানি না থাকা, অতিমাত্রায় দূষণ ও খরা মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি ও আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে হটলাইনে কিংবা সশরীরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। আর ওয়াসা কর্মকর্তারা বলছেন, লোডশোডিংয়ের কারণেও কমেছে পানির উৎপাদন ও সরবরাহ।

বর্তমানে রাজধানীর বাসাবাড়িতে সারা দিনে এক থেকে দুবারের বেশি পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সারা দিনে এসব এলাকায় যেটুকুইবা পানি সরবরাহ করা হয়, তাও আবার ব্যবহারের অনুপযোগী। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে চাহিদানুযায়ী পানি উত্তোলন ও সরবরাহ নিশ্চিত করাও সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে কম বৃষ্টিপাত, সেই সঙ্গে জনসংখ্যা ও চাহিদা বাড়ার কারণে ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নামছে। এজন্য শতাধিক পাম্প বিকল হয়ে পড়েছে। লোডশোডিংয়ের কারণেও পানির উৎপাদন ও সরবরাহ কমছে। পাশাপাশি নতুন পাম্প বসানোরও জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রেশনিং করে পাম্প চালাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পানির স্থির স্তর ২৬০-২৮০ ফুট নেমেছে আর পানি ওঠানো হচ্ছে ৯৫০-১০০০ ফুট নিচ থেকে।

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, তাদের দৈনিক পানির চাহিদা ২৬৫ কোটি লিটার। এর ৬৪ শতাংশ আসে ভূগর্ভের পানি থেকে। পানির স্তর বেশ নিচে চলে যাওয়ায় প্রায় এক হাজার ফুট নিচ থেকে পানি তুলতে হচ্ছে ঢাকা ওয়াসাকে। রূপগঞ্জের গন্ধবপুর পানি শোধনাগার চালু হলে ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরতা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে আসবে বলে আশাবাদী তারা। এদিকে মেঘনা নদীর পানি পরিশোধন করে রাজধানীতে সরবরাহ করতে ৯ বছর আগে সোয়া পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল ওয়াসা। তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পরও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৫ শতাংশ। এই প্রকল্প ব্যয় বেড়ে হয়েছে আট হাজার কোটি টাকা। শোধনাগার ও পানির লাইনের নির্মাণকাজ শেষে কবে নাগাদ মেঘনা নদীর পানি ঢাকাবাসী পাবে, সেটি নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

শুধু তাই নয়, পদ্মা নদীর পানি রাজধানীতে সরবরাহ করতে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে শোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু শোধনাগার থেকে পানি রাজধানীতে নিতে সরবরাহ লাইনই স্থাপন করেনি ওয়াসা। এতে শোধনাগারের সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশই অব্যবহৃত থাকছে দুই বছরের বেশি সময় ধরে। ফলে নির্ধারিত সময়ে ভূ-উপরিস্থ পানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না ওয়াসা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা শহরে চাহিদার ৮০ শতাংশ পানি ভূর্গভস্থ থেকে মেটায় ওয়াসা। এতে প্রতি বছর পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে কমতে থাকলে ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক ঝুঁকি বাড়তে থাকবে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ওয়াসাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। পদ্মা থেকে ঢাকায় পানি সাপ্লাই দেওয়ার যে প্রকল্পের কাজ চলছে, তা শেষ করতে হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে।

যদিও এ কথা ঠিক, নিজেদের ও সংশ্লিষ্টদের অনৈতিকতা, অধিক অর্থ জালিয়াতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অধিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং এ ধরনের কাজে উচ্চ মহলের অধিক সংশ্লিষ্টতা, কর্তৃপক্ষের অধিক উদাসীনতা ও চরম অবহেলার কারণে পানির সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও বণ্টন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। যদিও সরকার জাতীয় পানিনীতিতে (১৯৯৯) পানিকে একটি পণ্য হিসেবে গণ্য করে পানির ওপর কর এবং চাহিদানুযায়ী বাজারমূল্যে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু বিপরীতে এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যথাযথ পানি সম্পদ উন্নয়ন, সংরক্ষণ, বণ্টন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে দেশ ও জনগণের ওপর।

মূলত জাতীয় পানিনীতি ও জাতীয় পানি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে দেশ ও জনগণের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ওই খাতে বিরাজমান সংকট উত্তরণে সব ধরনের প্রভাব দূর ও দুর্নীতি ভুলে দেশের মৃতপ্রায় ছোট-বড় নদ-নদী, পানির উৎস, জলাধার, খাল-বিলসহ সব ধরনের জলাভূমির উন্নয়ন, দূষণরোধ, সংরক্ষণ, পানির সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দিকে অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। এই কাজে সরকারের সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব বুঝে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পানির পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা, পার্শ¦বর্তী দেশগুলোর সঙ্গে পানির হিস্যা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান এবং নদ-নদীসহ সব ধরনের জলাধারে পানি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা স্থির করতে হবে। সেই সঙ্গে পানিসম্পদ রক্ষায় এ খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির দিকে সরকারকে আরো অধিক দৃষ্টি দিতে হবে। এই খাতে অধিক দক্ষ ও সৎ লোক নিয়োগ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্টদের অধিক উদাসীনতা, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে স্থায়ী বিরোধ, স্থানীয় প্রভাবশালী দৌরাত্ম্য ও ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতা, দোষীদের যথাযথ আইনের আওতায় না আনা ও তাদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া, আইনি দুর্বলতা, ঘুষ বাণিজ্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থলিপ্সা এবং অধিক নজরদারির অভাবে এ দেশের এমন অনেক নদ-নদীকে অবলীলায় হত্যা করা হচ্ছে। মূলত এ দেশের কিছু অর্থলোভী অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে বলি দিচ্ছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে সংশ্লিষ্টদের সার্বিক সহযোগিতায় তারা অবাধে এই কাজগুলো চালিয়ে গেছে, যা দুঃখজনক। এমন এক অবস্থায় যদিও বর্তমান সরকার ধ্বংস বা মৃতপ্রায় নদ-নদীগুলোকে পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ স্বরূপ নদ-নদী খনন, নদী শাসন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ভূমিদস্যুদের তৎপরতা রোধ, দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত, পরিবেশ রক্ষা আইনের দুর্বলতা দূরীকরণ, শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য শোধনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ পাশাপাশি অধিক জনসচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে, যা ইতিবাচক। এখন সরকারের পাশাপাশি পরিবেশবিদ, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন, বিত্তবান, শিক্ষিত যুবসমাজ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোকে সেবার মনোভাব এবং দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসতে হবে এবং এই কাজে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে হবে।

যদিও ইদানীং প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘনঘন বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোনের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় আমাদের প্রায়ই গ্রাস করছে। এতে দেশ ও জাতি হচ্ছে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও কৃষি খাত হচ্ছে বিপর্যস্ত। অনুরূপভাবে ভূগর্ভস্থ পানি অধিক ব্যবহারের ফলেও পানির আর্সেনিক দূষণ জনগণের জীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ভয়াবহ পানি দূষণের ফলে দেশে বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানির সংকটও দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। প্রতি বছর প্রয়োজনীয় নদী শাসন না হওয়ায় অধিক বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে সরকার যে পরিমাণ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যয় করছেন সেই পরিমাণ অর্থ দিয়ে সরকার যদি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নদ-নদীগুলোকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ, নদী শাসন বিশেষ করে নদীর দূষণরোধ, নদী খননের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে নদীনালাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষায় উদ্যোগী হতো; তবে অধিক সুফল পাওয়া যেত। এতে সরকারের অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি আবাদি জমির ভাঙনরোধ, কৃষিতে প্রয়োজনীয় সেচ ঘাটতি পূরণ, আর্সেনিক দূষণরোধ, নদীপথে জীবিকা অর্জনকারীদের রক্ষাকরণ, স্বল্প ব্যয়ে নৌপথে পণ্য আনা-নেওয়াকরণ, ভবিষ্যতে পানির সংকট মোকাবিলাসহ নদীপথে যোগাযোগ সুরক্ষা পেত।

যদিও ইদানীং প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অধিক তৎপরতা ও নদীর দূষণরোধে কিছু ঝটিকা ও উচ্ছেদ অভিযান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা ইতিবাচক। সরকারের ওই কর্মপ্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক- এমনটিই অধিক প্রত্যাশা করি। এরপরও যদি আমরা প্রকৃতির আশীর্বাদস্বরূপ পাওয়া এসব নদ-নদীকে রক্ষায় ব্যর্থ হই, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ এই নদীগুলোই এক দিন আমাদের মাঝে বড় ধরনের অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে। যার খেসারত তখন সবাইকে দিতে হবে, যা কাম্য নয়। তাই অতিদ্রুত সমস্যা সমাধানে এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও বণ্টনের জন্য সব ধরনের অপতৎপরতা রোধ করতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের যেমন সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, ঠিক তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে অধিক আন্তরিক হতে হবে।

কেননা আমরা চাই না আমাদের সামান্য ভুল ও অবহেলায় প্রকৃতির আশীর্বাদস্বরূপ পাওয়া এসব নদ-নদী অভিশাপ হয়ে আবার আমাদের মাঝে বিরাজ করুক। আমরা চাই না যে, নদ-নদীগুলো তার অপার মহিমা, সেবা ও বুক দিয়ে আমাদের এত দিন আগলে রেখেছে তা সামান্য ভুলের কারণে করুণ মৃত হোক। তাই সবাই মিলে মৃত নদ-নদীগুলোকে বাঁচাতে একটু দরদি ও সচেতন হই এবং নিজেদের ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করি। যার যতটুকু সাধ্য আছে, তা দিয়েই মৃতপ্রায় নদীগুলো রক্ষায় আত্মনিয়োগ করি। কেবলমাত্র আমাদের সবার অধিক সচেতনতা, সততা এবং সদিচ্ছাই পারে এ দেশের মৃত ও দূষিত নদ-নদীকে রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে। প্রকৃতির এই ঋণ শোধে সবার ভেতরে সেই সদিচ্ছাটুকু জাগ্রত হবে- এমনটিই প্রত্যাশা।

লেখক : কলামিস্ট ও সাবেক

জনসংযোগ কর্মকর্তা বিইউএফটি

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close