আবু আফজাল সালেহ

  ২৫ জুন, ২০২২

সফলতা

স্বপ্ন আজ বাস্তবে

ইতিহাস বলে বা অর্থনৈতিক সমীক্ষা মতে, জুতসই অবকাঠামো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সেটি মোট দেশীয় মূলধন গঠন, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং মানব পুঁজির মাধ্যমে ঘটে থাকে। ভালো অবকাঠামো উৎপাদনশীল ক্ষমতা বাড়ায় এবং একটি দেশের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাকে উন্নত করে। ‘পদ্মা সেত’ তেমনই একটা অবকাঠামো। যমুনা সেতু (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু) নির্মাণের আগেরকার ও পরের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে তার পরিস্কার ধারণা পাওয়া যাবে। বরং পদ্মাসেতুর বেলায় আরও ইতিবাচক উন্নতি দেখা যাবে বলে মনে করি।

যমুনা সেতু অবহেলিত উত্তরপদের অনেক পরিবর্তন করে দিয়েছে। উত্তরবঙ্গে মঙ্গা এখন নেই। কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের অনেক লোকজন রাজধানীতে কাজ করছেন। যমুনা সেতুর ফলে অনেক শিল্প-কলকারখানা, ইকোনমিক জোন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করতে বিদেশীরা আগ্রহ দেখিয়েছে। পঞ্চগড়ের সঙ্গে ট্রেন-বাসের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। শধুমাত্র যমুনা সেতু নির্মাণের ফলে উত্তরাঞ্চল এখন আর অবহেলিত জনপদ নয়। পদ্মাসেতু নির্মাণে সারাসরি অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভাব পড়বে। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়বে, বিভিন্ন শিল্পকলকারখানা স্থাপনে অনঘটকের কাজ করে। ফলে নানারকম বৈষম্য কমে যাবে। পদ্মা সেতু দঙ্গিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর বন্ধন দেবে। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়বে খুলনা ও বরশাল, প্রস্তাবিত পদ্মা বিভাগের। অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে। উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত-সহ বিভিন্ন প্রকারের বৈষম্য কমাবে। রাজস্ব বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। পর্যটনখাত হবে আরও সম্ভাবনাময়। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, পদ্মাসেতু নির্মাণের জন্য দেশের দক্ষিনাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ শতাংশ, সার্বিকভাবে দেশের জন্য ১ শতাংশ।

পদ্মাসেতুর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক দ্রুত উন্নতি হবে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের উন্নতি হবে। সম্ভাবনাময় এ খাতে প্রাণসঞ্চারিত হবে। সুন্দরবন-কুয়াকাটা-পায়রা-টুঙ্গিপাড়া-বাগেরহাট সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। বিদেশিদের কাছেও এ অঞ্চল আকর্ষণীয়।দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, গোলপাতাসহ বিভিন্ন প্রকারের বৃক্ষ, প্রাণি, মধু, ইত্যাদি। দেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। প্রথম সূর্য দেখার জায়গা গঙ্গামতী। সুন্দবনের পাশাপাশি বিশ্বঐতিহ্যের আর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা হচ্ছে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ। টুঙ্গিপাড়ায় রয়েছে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর মাজার। আরও রয়েছে পায়রা ও মোংলা সমুদ্র বন্দর। এসব দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এসবে বিদেশীদের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। আমরা জানি, আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলংকা আর থাইল্যান্ডে পর্যটনখাত থেকে প্রচুর আয় করে থাকে। এর প্রধান একটি কারণ হচ্ছে বিদেশী পর্যটক। পদ্মাসেতু খুলে দেওয়ার ফলে উল্লিখিত পযর্টন¯পটে যাতায়াতের সুবিধা হবে। সময় ও খরচ অনেক কমে যাবে। সময়ের জন্য বেশিরভাগ বিদেশী-পর্যটক এসব ¯পট এড়িয়ে যান। এমনকি অনেক দেশীয় পর্যটকও এড়িয়ে যান। পদ্মাসেতু কিন্তু অপার এক সম্ভাবনার দ্বারকে প্রসারিত করে দিচ্ছে। এবার সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে পর্যটনখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি। পর্যটনে বিদেশিদের আকর্ষণ বৃদ্ধি করা গেলে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি দেখা যাবে। পদ্মাসেতু কিন্তু সে সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে।

সেতুটি নির্মাণে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ কমে যাবে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা। রাজধানীর সাথে সরাসরি সংযোগ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, কাঁচামালের সরবরাহ সহজ এবং শিল্পায়নে সহায়তা করবে। দক্ষিণাঞ্চলের অঞ্চলের জেলায় জেলায় গড়ে উঠবে ছোট-বড় শিল্প। কৃষির ব্যাপক উন্নতি হবে। কৃষকরা পণ্যের দাম ভালো পাবেন। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাঁচামালের সহজলভ্যতা হবে, খরচ কমে যাবে। ফলশ্রুতিতে উৎপাদন বাড়বে, মুনাফা বাড়বে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সাথে সহজেই সংযুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাগাযোগ সহজতর হবে। সেতুর দুই পাশে গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও বেসরকারি শিল্প শহর। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। ফলে, পদ্মা সেতুর ফলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন হবে বিশাল। পদ্মা সেতু দেশের জিডিপি এক শতাংশের বেশি বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ উপকৃত হবে। এই জেলাগুলিকে উন্নত কানেক্টিভিটির মাধ্যমে গ্রোথসেন্টারের সাথে যুক্ত করা হবে। এগুলোকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মানুষের চলাচল বাড়ার সাথে সাথে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হবে। পণ্য ও সেবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে চলাচল করবে। এ অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য পরিষেবাগুলিতে আরও বেশি অ্যাক্সেস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অর্জনেও অবদান রাখবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশের আত্মবশ্বাস বেড়ে গেছে। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও বাধা সত্ত্বেও পদ্মা সেতু আজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তায় এটায় সম্ভব হয়েছে। বাঙালির মাথা উঁচু করার আরও একটি উপলক্ষ পাচ্ছি আমরা। দৃঢ় সংকল্প থাকলে সীমিত সম্পদের দেশ কীভাবে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে তারই প্রমাণ এই সেতু।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close