ইসমাইল মাহমুদ

  ১৯ মে, ২০২২

ফিরে দেখা

চা-শ্রমিকদের মুল্লুক চলো আন্দোলন

তৎকালীন সরকার, প্রশাসন ও চা বাগান মালিক পক্ষ চাঁদপুর জাহাজঘাটে আন্দোলনরত চা-শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায় ১৯২১ সালের ২০ মে। এতে নিহত হন শত শত চা-শ্রমিক। নিরীহ চা-শ্রমিকদের রক্তেভেজা এ আন্দোলন চা-শিল্পাঞ্চলে ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন হিসেবে পরিচিত।

চা-শিল্পাঞ্চলে ২০ মে ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলন সম্পর্কে জ্ঞাত হতে একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক। ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশরা সিলেট এবং আসামের বনজঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে চায়ের বাগান গড়ে তোলে। চা বাগানগুলোতে আবাদ ও অন্যান্য কাজের জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর শ্রমিকের। স্থানীয় লোকজন এসব পরিশ্রমের অনাগ্রহী ছিলেন। ফলে দারিদ্র্যপীড়িত ভারতের বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজসহ বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনকে উন্নত জীবনযাপনের লোভ দেখিয়ে কৌশলে নিয়ে আসা হতো এসব চা বাগানে কাজের জন্য। এ ছাড়া দলিত এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজনও উন্নত জীবনের প্রলোভনে পা দিয়ে পাড়ি জমাত চা-শিল্পাঞ্চলে। দারিদ্র্যপীড়িত এসব মানুষ প্রলোভনে পড়ে যখন বন-জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ে শ্রম দিতে এলেন তখনই বাস্তবতা বুঝতে পারলেন। পাহাড়ের হিংস্র প্রাণী ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। চা বাগান মালিকের দেওয়া ছোট এক মাটির কুটিরে সপরিবারে বসবাস করতে হতো এ শ্রমিকদের। দিনের পর দিন বৃষ্টিতে ভিজে-রোদে শুকিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হতো শ্রমিক পরিবারের। বাগানের বাইরে যাওয়া ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ। পারিশ্রমিক হিসেবে ‘টি-টোকেন’ নামক এক ধরনের ধাতব বস্তু দেওয়া হতো তাদের। এসব ধাতব বস্তু দিয়ে বাইরে কেনাকাটা করার কোনো সুযোগ ছিল না। শুধু চা বাগানের অভ্যন্তরে স্থাপিত নির্ধারিত দোকান থেকেই তারা কেনাকাটা করতে পারতেন।

তৎকালীন সময়ে চা বাগানের শ্রমিকদের শ্রমিক না বলে বলা হতো ‘কুলি’। চা বাগান কর্তৃপক্ষ ও ম্যানেজাররা কুলিদের ওপর চালাতেন একচ্ছত্র নির্যাতন। সব পেশায় ইচ্ছাকৃত ইস্তফা দেওয়ার বিধান থাকলেও চা-শ্রমিকরা ইচ্ছে করলেও তাদের চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে পারবেন না। এক ধরনের বন্দিদশায় তারা কাজ করতে বাধ্য হতেন। বাগান অভ্যন্তরে শ্রমিকদের ইচ্ছে-অনিচ্ছার কোনো মূল্য থাকত না। কোনো শ্রমিক যদি কোনো কারণে চা বাগান থেকে পালিয়ে যেতেন, তবে তাদের ধরে এনে দেওয়া হতো চাবুকের আঘাত বা বুটের লাথি ইত্যাদি অমানসিক শাস্তি। চা-শ্রমিকদের সঙ্গে বাগান কর্তৃপক্ষ বা ম্যানেজারের এমন আচরণ রাষ্ট্রীয় আইনে কোনো ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো না। চা বাগানে মালিক পক্ষ বা ম্যানেজারের হাতে কোনো শ্রমিক নিহত হলে এ ঘটনাকে দেখা হতো অতি সাধারণ একটি ঘটনা হিসেবে। ওই সময় চা বাগানের শ্রমিকরা বাগান এলাকায় রোদণ্ডবৃষ্টি কোনো সময়ই ছাতা মাথায় দিতে পারতেন না। ছাতা ব্যবহার ছিল চরম বেয়াদবি। এসব নিয়ে চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে জমা হতে থাকে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।

১৯২১ সালে ভারতবর্ষে চা-শিল্পের ইতিহাস পা দেয় ৬৭ বছরে। ওই ৬৭ বছর ধরেই ভারতবর্ষে চা বাগানের শ্রমিকরা চরম নিপীড়ন অবস্থায় দিনানিপাত করেন। ওই বছরে টি-টোকেনপ্রথা বিলুপ্ত করে ভারতবর্ষের চা বাগানে শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা কমিয়ে করা হয় তিন আনা। চা বাগানে অমানসিক শ্রম দেওয়া শ্রমিকরা এটা মেনে নিতে পারেননি। আসাম এবং সিলেট অঞ্চলের চা-শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে শুরু হয় তীব্র অসন্তোষ। বাগান মালিক পক্ষের সব ধরনের নির্যাতন অগ্রাহ্য করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যেকোনো মূল্যে বাগান মালিক পক্ষের গোলামির শৃঙ্খল ছেড়ে জন্মভূমি বা ‘মুল্লুক’-এ ফিরে যাবেনই। এদিকে চা-শ্রমিকরা যখন দেশে ফিরবেন বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তখন চা বাগান মালিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের সহযোগিতায় রেলওয়ে ও নৌপরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করে। ‘মুল্লুক’ যাওয়ার জন্য করিমগঞ্জে আসা প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিককে আটকে দিতে বন্ধ করে দেওয়া হলো সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। চা-শ্রমিকরা যখন করিমগঞ্জ রেলস্টেশনে এসে পৌঁছালেন, তখন তাদের জানিয়ে দেওয়া হলো ধর্মঘট চলছে। তাদের কোনো ধরনের টিকিট দেওয়া হবে না। এ অবস্থাতেও প-িত দেওশরন এবং প-িত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিতের নেতৃত্বে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সিদ্ধান্ত নিলেন তারা হেঁটেই দেশে ফিরবেন। আসাম থেকে ৩০ হাজার শ্রমিক করিমগঞ্জ, বদরপুর, কুলাউড়া হয়ে যখন হবিগঞ্জে পৌঁছেন হবিগঞ্জের তৎকালীন কংগ্রেস নেতা শিবেন্দ্র বিশ্বাস শ্রমিকদের কল্যাণে এগিয়ে আসেন এবং তার নেতৃত্বে তার কর্মীরা পথে পথে শ্রমিকদের খাদ্য সরবরাহ ও রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় স্বদেশি কর্মীরাও শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং শ্রমিকদের মানসিক শক্তি ও সাহস জোগান। খাদ্য ও পানির অভাবে পথে পথে মৃত্যু হয় অনেক শ্রমিকের। তবু থেমে থাকেনি তাদের মুল্লুকে চলার সংগ্রাম।

১৯২১ সালের ১৯ মে শ্রমিকরা গিয়ে পৌঁছান চাঁদপুর জাহাজ ঘাটে। সে সময় চাঁদপুর মহকুমার প্রশাসক ছিলেন সুশীল কুমার সিংহ। তিনি প্রাথমিকভাবে শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কিন্তু পরদিন চা বাগান মালিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে মি. ম্যাকফারস চাঁদপুরে এসে হাজির হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। ২০ মে রাতে জাহাজে উঠতে থাকা শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আসাম রাইফেলস এর গুর্খা সৈন্যরা। যার নেতৃত্ব দেন চাঁদপুর মহকুমার প্রশাসক সুশীল কুমার সিংহ। এ সময় জাহাজের পাটাতন সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে শত শত শিশু, বৃদ্ধ ও নারী-পুরুষ মেঘনার জলে ভেসে যায়। এ ছাড়া গুর্খা সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং বেয়নেট চার্জ করে। এতে শত শত শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন। শ্রমিকের রক্তে লাল হয়ে ওঠে প্রমত্তা মেঘনার জল। তবে এ আন্দোলনে কতজন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছিলেন আর কতজন আহত হয়েছিলেন তার কোনো হিসাব কোথাও নেই।

নির্মম এ হত্যাযজ্ঞের পর তৎকালীন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের নেতৃত্বে রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ধর্মঘট ডেকে কর্মবিরতি পালন করে। ২৪ মে থেকে একটানা আড়াই মাস আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘট পালন করে। চা-শ্রমিকদের সঙ্গে রেল শ্রমিকদের কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা না থাকলেও শুধু মানবিক কারণে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ধর্মঘটের কারণে রেলওয়ের কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। কার্যত অচল হয়ে পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী রেল শ্রমিকদের কোয়ার্টার ছেড়ে দেওয়ার আদেশ এবং চট্টগ্রামে ১৪৪ ধারা জারি করে। এ ছাড়া চা-শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদ করায় ৫ সহস্রাধিক রেল কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে ব্রিটিশ সরকার। পরে এসব শ্রমিকের খোঁজ নেয়নি কেউ।

যে মেঘনার জল চা-শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই মেঘনা পাড়ে এর কোনো স্মৃতিচিহ্নই এখন আর নেই। এমনকি সেখানে গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতিস্তম্ভও। তবে ২০০৮ সাল থেকে দেশের ২৪১টি চা বাগানের শ্রমিকরা প্রতিটি বাগানে অস্থায়ী বেদি নির্মাণ করে এই দিনটিকে চা-শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close