কাব্য সাহা

  ১১ মে, ২০২২

মুক্তমত

বাড়েনি আয় : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সহজ ভাষায় বলতে হয় জীবনভর জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষরাই হলেন মধ্যবিত্ত। যেখানে সব সময় সবকিছুর জন্যই মানুষগুলোকে নিখুঁত হিসাব-নিকাশ করে বাঁচতে হয়। নির্দিষ্ট উপার্জনের সমান বিন্যাস করে হাসিমুখে জীবনযাপন করা মানুষগুলোই সমাজের মধ্যবিত্ত। সেই নিখুঁত হিসাব-নিকাশ কিংবা সমান বিন্যাসের মাঝে ভোগ্যপণ্যের দাম যখন আকাশচুম্বী হয় তখন সমাজের এই শ্রেণির মানুষের বিপাকে পড়া ছাড়া উপায়ন্তর নেই।

দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি হলেও বৃদ্ধি পায়নি আয়। অর্থের নেই বাড়তি কিংবা আলাদা উৎস। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যম বা নিম্নআয়ের মানুষের হাহাকার ছাড়া কিছুই করার থাকে না। বাঁচার জন্য মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা এবং বাসস্থান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষেদের। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংসের বাজারে কোথাও নেই স্বস্তি। পাশাপাশি শহরে বসবাসরত অধিকাংশ মানুষদের রান্নার একমাত্র উপায় গ্যাসের চুলার ব্যবহার করা। সেই গ্যাস-সিলিন্ডারের মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত মানুষ উপায়হীন প্রায়। নিত্যপণ্যের সবকিছুর ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে বাজারে মানুষের দীর্ঘশ্বাস লক্ষণীয়।

বেড়েছে নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীর দাম। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে বেড়েছে বাড়ি ও যাতায়াত ভাড়া। এমনকি বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়ও। বাজারে ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে খেটে খাওয়া মানুষের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে দিন দিন। হঠাৎ করে তেলের চড়া দামে বিপাকে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নআয়ের মানুষ। মধ্যবিত্ত পরিবার কিংবা নিম্নআয়ের মানুষের বাইরে বের হলেই যেন গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। কাজের ব্যস্ততায় কর্মজীবী মানুষদের অধিকাংশই সকালের নাশতা কিংবা দুপুরের লাঞ্চ বাসার বাইরে করে থাকেন। বিশেষ করে চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষই বাইরে হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার সংগ্রহ করেন। সেই হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁর মূল্য তালিকায়ও পরিবর্তন এসেছে। সকালের নাশতার জন্য ৫ টাকার পরোটায় গুনতে হচ্ছে ১০ টাকা। আবার হালকা খাবার শিঙাড়া, সমুচা, আলুর চপ প্রায় সব খাবারের অতিরিক্ত অর্থ সংযোজন হয়েছে। অজুহাত ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। কিন্তু তেলের দাম স্বাভাবিক হলেও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা এই মূল্য সংযোজন অব্যাহত রাখবে। যা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি চিন্তার।

শিক্ষার্থীরা স্বভাবতই পড়াশোনার তাগিদে সকালের নাশতা কিংবা দুপুরের লাঞ্চ বাইরে করে এবং তারা চেষ্টা করে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার খেতে তাই অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়। তাদের সেই সাশ্রয়ী মূল্যেও এসেছে পরিবর্তন। প্রতিক্ষেত্রেই গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। শুধু তাই নয় খাবারের সাইজ কিংবা মানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিনের খাবারের মূল্যে এবং মানে পরিবর্তন আসলে, তাহলে শখ করে বড় কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়াটা নেহাত স্বপ্ন সমান। আসলে কোথায় গেলে মিলবে এর সমাধান! কারাই-বা যথাযথ সমাধানে এগিয়ে আসবে!

মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঊর্ধ্বগতির সবকিছুর মধ্যেই যখন সন্তানের পড়াশোনার জোগান দিতে হয়, টিউশন ফিসহ নানা কিছুর অর্থ গুনতে হয় তখন ওই পরিবারই শুধু ভেতরের হাহাকারটা বুঝতে পারে। পাশাপাশি পড়াশোনার তাগিদে যাদের বাড়ির বাইরে থাকতে হয় সেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরাই জানে পরিস্থিতি কতটা শোচনীয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অজুহাতে মেস বা বাসা ভাড়া বাড়াতে শুরু করেছে মালিকপক্ষ। রান্নার উপকরণ, গ্যাস অর্থাৎ খাবারের জন্য গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। প্রায় প্রতিটি পদে পদে গুনতে হচ্ছে এই বাড়তি অর্থ। মৌলিক চাহিদা পূরণেই একরকম হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এদিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি না পারে কোথাও এই আক্ষেপ প্রকাশ করতে, না পারে লোকচক্ষুর লজ্জাবোধ কাটিয়ে কারো সাহায্য নিতে। সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত সম্মানটাও তাদের আটকে দেয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি একরকম মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আছে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জরুরি। নাহলে মানুষ নানা রকম খারাপ পেশায় নিজেদের জড়িয়ে ফেলবে। নিম্নআয়ের মানুষ সাহায্যের জন্য বিভিন্ন কাতারে দাঁড়ালেও, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সেটি করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে বাঁচার তাগিদে তাদের বিপথগামী হয়ে ওঠার আশঙ্কাবার্তা বহন করে। দিন দিন চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ভয়াবহ ঘটনা অহরহ বেড়েছে। সুতরাং এখনই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সমাধান খুঁজতে হবে। যেহেতু সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, সেহেতু দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধি তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করে যত দ্রুত সম্ভব এর প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশের বহু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম অভাব সৃষ্টিতে তৎপর। তারা অনেক সময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখে। তারপর দেশজুড়ে যখন হাহাকার তৈরি হয় তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে মজুদ পণ্য বাড়তি দামে বাজারে ছাড়ে। যারা মজুদ করে সংকট তৈরি করছে এবং সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধি করে চলছে, এদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অপরাধ বিবেচনায় এবং প্রয়োজনে এমন ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করতে হবে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বাড়ালে সব প্রকার কারসাজি বন্ধে অসাধু ব্যবসায়ীদের পতন ঘটবে। অধিক মুনাফা লোভে যারা সাধারণ মানুষকে বিপদের সম্মুখীন করছে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে অন্য ব্যবসায়ীদের সতর্ক করতে।

সর্বোপরি মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে কীভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী রাখা যায় সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুনজর রাখতে হবে। মানুষের জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখতে হলে দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানা অতি জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়সীমার বাইরে গেলেই, পরিবারের খাদ্যের জোগান দিতে হিমশিম খেয়ে মানুষ বিপদগামী হয়ে উঠতে পারে সুতরাং বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে বাজার নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close