রেজাউল করিম খোকন

  ২৭ জানুয়ারি, ২০২২

দৃষ্টিপাত

ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে শঙ্কার মধ্যেও আমদানি-রপ্তানিসহ নানা সূচকে রয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। এমনই অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে আরো কিছুটা উন্নতির পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬.৪ শতাংশ। এর আগে গত বছরে জুন মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই অর্থবছরের জন্য ৫.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল সংস্থাটি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি ও রপ্তানি চাঙা হওয়াই দেশের অর্থনীতিতে ভালো প্রবৃদ্ধির কারণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। অবশ্য তাদের দেওয়া জিডিপি প্রবৃদ্ধির সবশেষ পূর্বাভাস এখনো সরকার ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ কম। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৭.২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক আশা করছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা পরের অর্থবছরেও অব্যাহত থাকবে। সেবা খাতের কর্মকাণ্ড ও তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বাড়ার ফলে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো কিছুটা বেড়ে ৬.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। কোভিড-১৯ অতিমারি শুরুর আগে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে ৭.৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাংলাদেশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয় ৮.১৫ শতাংশ। তবে অতিমারির কারণে ব্যাহত হয় এ ধারা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩.৪৫ শতাংশ। তবে করোনা মোকাবিলা করে এরপরের ২০২০-২১ অর্থবছরে হয় ৫.৪৩ শতাংশ।

২০২১ সালে রপ্তানির অবস্থা ভালো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই ছিল। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে এ দেশ ভালো করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। করোনার মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কাছাকাছি। মাথাপিছু আয় আড়াই হাজার ডলার। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক অবদান রাখছে এই খাত। দেশের অর্থনীতি কৃষি থেকে শিল্পে স্থানান্তরিত হচ্ছে। সেবা খাত এগিয়ে যাচ্ছে। করোনার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি না হলেও অন্য অনেক উন্নত দেশের মতো নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়নি। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ কম হয়েছে। কিন্তু সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপক বেড়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। আগামী দিনে শক্তিশালী আর্থিক পুনরুদ্ধারে চালকের আসনে থাকতে হবে বেসরকারি খাতকে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ সর্বত্র স্বীকৃত। বিশেষ করে করোনাকালীন আমাদের অর্থনীতির উন্নয়ন সারা বিশ্বের চোখে পড়ার মতো। আইএমএফও তাই বলছে। দারিদ্র্য একসময় আমাদের অনেক ভুগিয়েছে। কিন্তু আমরা এখন সে জায়গায় নেই। বাংলাদেশের উন্নয়নকে অনেকেই ম্যাজিক বলে। প্রবাস আয়, রপ্তানি ও কৃষির ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। এই তিন খাতেই সরকারের অবদান রয়েছে। করোনাকালীন প্রবাসীদের আয়ের ওপর প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যে কারণে তারা বৈধপথে দেশে টাকা পাঠিয়েছে এবং তারাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা কিছু ভুল জায়গায় গেলেও তা যদি দেশেই থাকে, তাহলেও অর্থনীতির জন্য ভালো। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আমরা অনেক ভালো করছি। তবে চ্যালেঞ্জ হলো- সুশাসন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রেখে উন্নয়ন ধরে রাখা।

চলতি বছর ২০২২-এ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হবে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সংকট। এ ছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়, সাইবার দুর্বলতা, ডিজিটাল বৈষম্যও অর্থনীতির ঝুঁকির তালিকায় থাকছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রতিবেদন ২০২২ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। বিশ্বের প্রায় এক হাজার বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন খাতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। প্রতিবেদনে সংস্থাটি শতাধিক দেশের প্রধান চারটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এতে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ও উঠে এসেছে। কর্মসংস্থান ও জীবিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে কৌশলগত সম্পদের ভূরাজনৈতিকীকরণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে স্থাপনা নির্মাণে এশিয়ার বৃহৎ দুটি দেশের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এই প্রতিযোগিতার সুবিধা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন বড় প্রকল্পে সহজেই বিনিয়োগ পাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে উন্নয়নের পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এ রকম প্রবৃদ্ধি আরো বৈষম্য সৃষ্টি করবে। বৈষম্য থাকলে সমাজ টেকসই হয় না। জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ চাকরির বাজারের বাইরে থাকলে তাদের অবদান থেকে সমাজ বঞ্চিত হয়। শুধু তারাই নয়, অর্থনীতিও বঞ্চিত হয়। কোনো না কোনো সময় গিয়ে সেই প্রবৃদ্ধি আর ধরে রাখা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় ঝুঁকি। যতই প্রবৃদ্ধি হোক না কেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে না পারলে আমাদের সব অর্জন ধূলিসাৎ হবে। বাংলাদেশে ডিজিটাল বৈষম্যও বাড়ছে, যারা উচ্চ আয়ের মানুষ তারাই বেশি ডিজিটাল সুবিধা পাচ্ছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের স্বার্থে সামগ্রিক ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির যত প্রসার ঘটছে, বৈষম্যও তত বাড়ছে। তবে যেকোনো প্রযুক্তির বিকাশের প্রথম পর্যায়ে এই বৈষম্য থাকবে। কিন্তু ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলেছে, কোভিডের অভিঘাতে বাংলাদেশে কত মানুষের আয় কমেছে বা কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সরকার এ নিয়ে বিশেষ জরিপ করেনি। আবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব জরিপ করেছে, তার ফলাফল সরকার মেনে নেয়নি। সানেম ও ব্র্যাক বিআইজিডি গত প্রায় দুই বছরে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিয়ে ধারাবাহিক জরিপ করেছে। তাদের জরিপে একটি বিষয় পরিষ্কার, দেশের অনেক মানুষের আয় কমেছে। অনেক মানুষ আবার তুলনামূলকভাবে উচ্চদক্ষতার কাজ থেকে নিম্ন দক্ষতার কাজ নিতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি অনেক মানুষ কোভিডের শুরুতে ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে যে গ্রামে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই শহরে ফেরেনি। বাংলাদেশে বেকারত্বের সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এতে দেশের দরিদ্র ও অরক্ষিত মানুষ বিপাকে পড়েছে। ফলে এসব মানুষ খাদ্য ব্যয় কমিয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর।

কোভিডের সংক্রমণ গত বছরের শেষের দিকে অনেকটাই কমেছে। অর্থনীতি এখন সচল হতে শুরু করলেও কোভিডের পূর্ববর্তী অবস্থায় পৌঁছায়নি। ব্যাংক খাত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ। করোনার অভিঘাতের পরে অর্থনীতি এখন সচল হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে। এখন অর্থনীতিতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমাদের দেশে কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়েনি। মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। জামানতমুক্ত এসএমই ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন আবার নতুন করে ওমিক্রন শুরু হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মহামারি থেকে সামলে ওঠা ব্যক্তিরা। তিনি বলেন, যাতে আবার সমস্যা না হয়, সেদিকে সরকারের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে স্বনির্ভর বা ব্যক্তিপর্যায়ে একক আয়ের নির্ভরশীলদের কীভাবে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তা দেখতে হবে। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বিদ্যালয়ে খাদ্য সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যারা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে রয়েছে, তাদের দেখা উচিত। সংক্রমণের সর্বোচ্চ সময়ে করোনা পোশাক খাতের মাঝারি ও ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনেছে বেশি। তারা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি অনেকেই। আবার রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য দেশে আসেনি, যদিও আমদানি দায় স্থগিত করার সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এতে করে তাদের বিরুদ্ধে ফোর্সড লোন তৈরি হয়েছে। অথচ করোনার সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে কারখানা চালু রাখা হয়েছে। এজন্য এখন রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের হার কমে আসা, একই সময়ে ভিয়েতনামে লকডাউনে থাকা, চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব, মিয়ানমারের সমস্যা প্রভৃতি কারণে আমাদের অর্থনীতি দ্রুত সচল হয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আদেশ বেড়েছে। এটি টেকসই হবে কি না, সে বিষয়ে ভাবতে হবে।

আমরা মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ে যাই কি না, সন্দেহ হচ্ছে।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এই অবস্থায় পড়ে থাকতে হয় কি না, এ ব্যাপারে সংশয়, সন্দেহ রয়েছে। লাতিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর বহু দেশ মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে আটকে আছে। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক হয়েছে। এটি দেশের জন্য ভালো, বিশেষ করে বর্তমান সময়ের জন্য। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে ব্যাংক খাতে তারল্য প্রবাহের প্রয়োজন। এদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন সরকারের। বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে আইটি খাতের ফ্রিল্যান্সার অন্যতম। অনেক সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। সেগুলোকে চিহ্নিত করে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে কিন্তু বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বড় বড় কোম্পানি খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, কিন্তু ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান পারেনি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close