রায়হান আহমেদ তপাদার

  ২৪ জানুয়ারি, ২০২২

পর্যবেক্ষণ

বড় বেশি অস্থিরতায় ভুগছে পৃথিবী

গত শতকের আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে যে গণ-আন্দোলন হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার সঙ্গে কিছুটা তুলনীয়। তবে যথাযথ তুলনাটি টানতে হলে তাকাতে হবে আরো পেছনে। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে বিশ্বব্যাপী যে গণ-আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল দেশ ও আন্দোলনকারীদের সংখ্যার বিচারে এই সময়ের চরিত্রটি তার সঙ্গে অনেকটা মেলে। তবে উল্লিখিত দশকগুলোয় বিশ্বব্যাপী হওয়া গণ-আন্দোলনের সঙ্গে শুধু সংখ্যার বিচারেই এ সময়ের আন্দোলনগুলো তুলনীয়; চরিত্র বিচারে নয়। সে সময়ে আন্দোলনগুলো অনেক বেশি পরস্পর- সম্পৃক্ত ছিল। বিপরীতে বর্তমানে উত্তাল বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে চলা আন্দোলনগুলো অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ও স্বতঃস্ফূর্ত। বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ও লক্ষ্যের মূলটি একই হলেও আন্দোলনকারীরা তা যথাযথভাবে শনাক্ত করতে না পারায় এই বিচ্ছিন্নতা থেকে যাচ্ছে। শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি মানুষ যতটা আশা করেছিল, ততটা স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং শান্তির যুগের সূচনা করতে পারেনি; উল্টো তা আমাদের এমন এক বিশ্ব দিয়েছে, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার চেয়ে হানাহানি বেশি চলছে। পাঁচ বছর আগে বিশ্ব যতখানি অগোছাল ও অস্থির ছিল, সে তুলনায় এখন তা অনেক বেশি অস্থির ও অবিন্যস্ত। বেশির ভাগ প্রবণতাই নেতিবাচক দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই করোনার যুগেও বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ এখনো করোনার টিকার প্রথম ডোজই পাননি। কোভিড-১৯ মহামারি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক প্রস্তুতির অপ্রতুলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। আমরা মহামারির তৃতীয় বছরে পদার্পণ করেছি কিন্তু চীনের অসহযোগিতার কারণে এখনো এর উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে পারিনি।

আমরা যেটি জানতে পেরেছি, সেটি হলো নিশ্চিতভাবে ৫০ লাখের বেশি এবং কারো কারো ধারণা মতে দেড় কোটির বেশি লোক মারা গেছে। আমরা আরো জানতে পারছি, প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ (তাদের অনেকেই আফ্রিকার) এখনো কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজই পায়নি। আমরা জানতে পেরেছি, মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়াও জলবায়ু ঝড়ের গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। শিল্পবিপ্লবের সূচনাকালের তুলনায় এ পর্যন্ত ধরিত্রী ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত হয়েছে এবং সেই উষ্ণায়নের গতি বাড়ছেই। চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ আগের চেয়ে ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারগুলো আরো ভালো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তাদের কাজের মিল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ চীন ও ভারত যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার সঙ্গে তাদের পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। এমনকি বিশ্বের গণতন্ত্র শুধু মিয়ানমার ও সুদানেই কোণঠাসা হচ্ছে তা নয়, লাতিন আমেরিকার একটি অংশে এমনকি ইউরোপেও কর্তৃত্ববাদ হানা দিয়েছে। লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো হাইতি এবং ভেনিজুয়েলাও কার্যত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে পারমাণবিক কার্যক্রমের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ, গুণমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও নির্ভুলতা বাড়িয়েছে। অপরদিকে ২০১৮ সালে ইরান চুক্তি থেকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় বড় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো, এখন তার চেয়েও তা বেশি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়েছে।

এমনকি এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বও বাড়ছে। তাইওয়ান নিয়ে দুই দেশের তিক্ততার পারদ দ্রুত চড়ছে। অন্যদিকে রাশিয়া তর্কাতীতভাবে আগের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের তিন দশক পরে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ন্যাটোর অগ্রযাত্রাকে থামাতে বা সম্ভব হলে অকার্যকর করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুতিন তার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন এমন দেশ ও সরকারকে অস্থিতিশীল করতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং সাইবার আক্রমণ করতে চাইছেন। পুতিনের এখনকার লক্ষ্যবস্তু ইউক্রেন হলেও তার ছুড়ে দেওয়া কৌশলগত চ্যালেঞ্জের বিস্তৃতি আরো ব্যাপক। যুদ্ধ ও দুর্যোগের কারণে বিশ্বব্যাপী ৮০ লাখের বেশি মানুষের, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে একজনের নিজ ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বৈশ্বিক উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার অভ্যন্তরীণ পরিসরে পাঁচ বছর আগে যে অস্থিরতা ছিল, এখন তার চেয়ে তা অনেক বেশি। সেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ভয়ানক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী বিষণœতা রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। শুধু বিষণœতার কারণে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা বা মনোকষ্টে ভুগলে এসব হতে পারে। এ কারণে করোনাকালে সামাজিক অপরাধ বেড়েছে। এদিকে সামাজিক বন্ধন ঢিলে হওয়ার কারণে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারে সামাজিক অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। গোয়েন্দারা জানান, করোনাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে সংখ্যক সাইবার ক্রাইম সংঘটিত হয়েছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এ মাধ্যমেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পও সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তারা। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জানান, সোশ্যাল মিডিয়ার বিষয়ে যথেষ্ট শিক্ষাগ্রহণের আগেই সবকিছু দেশের মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ফলে বেশির ভাগ মানুষই এর দায়িত্বশীল ব্যবহার করতে শিখেনি। ফলে অনেকেই এর যথেচ্ছা ব্যবহার করছে। তাছাড়াও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলের দেশগুলোতে সন্ত্রাসবাদ, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং শাসকদের অপসারণের মতো ঘটনা বেড়েছে। অন্যদিকে আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে সহিংসতা চলতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া। এরপরই রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান। ঝুঁকির তালিকায় শীর্ষ দশে থাকা অন্য দেশগুলো হচ্ছে যথাক্রমে সুদান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, ইয়েমেন, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান ও ইরাক। মিসরকে রাখা হয়েছে ১৫তম স্থানে।

সেই প্রতিবেদনে সিরিয়া, মিসর ও লিবিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ দেশগুলোর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এখন এত খারাপ যে, কয়েক বছরের মধ্যে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আরব বসন্তের তিন বছর পরও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলের ৬০ শতাংশের বেশি দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা গেছে। ম্যাপল ক্রফট ৫২টি সূচক ধরে ১৯৭টি দেশের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বেড়ে যাওয়ায় বেলারুশ, চীন, কাজাখস্তান, সৌদি আরব ও ভিয়েতনামে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ম্যাপল ক্রফটের বিবৃতিতে বলা হয়, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় ধরপাকড়, বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ঠুরতা, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও নিম্নমানের কাজের পরিবেশের কারণে এসব দেশে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক অর্জনগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। এ ছাড়াও বাহরাইন, আজারবাইজান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক অর্জনগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়ায় দেশগুলোতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

যেহেতু মুক্তবাজার পণ্যকেই শুধু অবারিত করেনি, সমস্যা ও সম্ভাবনাকেও অবারিত করেছে, সেহেতু বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের পক্ষে বাকি বিশ্বের সংকটের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা সম্ভব নয়। ফলে একচেটিয়াপনা, কর্তৃত্ব, দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যারও এক ধরনের বিশ্বায়ন হয়। তাই বর্তমান বিশ্বকাঠামোয় অর্থনীতির শক্তি বিচারে বিভিন্ন দেশ আলাদা কাতারে থাকলেও অসাম্য বিবেচনায় সবাই একই কেন্দ্রের সঙ্গেই যুক্ত। তাই এক দেশে শুরু হওয়া গণ-আন্দোলন অন্য দেশগুলোতেও সঞ্চারিত হচ্ছে। কখন কোথায় সঞ্চারিত হবে, তা নির্ভর করছে শুধু ওই নির্দিষ্ট ভূগোলে দৃশ্যমান সংকটের ব্যাপ্তির ওপর। গণ-আন্দোলনের আগের দুটি ঢেউয়ের সঙ্গে এবারের ঢেউটি আলাদা থেকে যাচ্ছে সুনির্দিষ্ট আদর্শের অনুপস্থিতিতে। আগের দুটি ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট আদর্শ সামনে ছিল আন্দোলনকারীদের সামনে। এবার এখনো তেমন কোনো সাধারণ আদর্শের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। তবে বিরোধটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে; আর তা হলো অসাম্যকে বল্গাহীন করা পুঁজির কাঠামো।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close