শুভাশিস ব্যানার্জি

  ০৮ ডিসেম্বর, ২০২১

মতামত

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ জরুরি

বাংলাদেশে কী কী কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়- এসব বহুল আলোচিত বিষয়। এসব বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদেরও পরামর্শ আছে। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণা অনুযায়ী দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। ২০১৮ সালে রাজধানীর কুর্মিটোলায় দুজন কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। সরকারি সংস্থাগুলো সে সময় বলেছিল, শিশুদের এ আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সড়কপথে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। দেওয়া হয় প্রতিশ্রুতিও। কিন্তু নতুন একটি সড়ক আইন করা হলেও সড়কে নিরাপত্তা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা এখনো ফিরেনি। অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একচেটিয়া প্রাধান্যের কারণেই এ খাতে শৃঙ্খলা আসছে না। ফলে রক্ষা হচ্ছে না যাত্রীস্বার্থ। অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে সড়কে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে প্রতি বছর দেশের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। যানবাহনের উচ্চগতি, নাজুক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিকল্পনা ও নীতির দুর্বলতা, অসচেতনতা ইত্যাদি বিষয় সড়ক দুর্ঘটনা ত্বরান্বিত করছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষকে সেসব সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০২০ সালে দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন বলে রোডটি সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০’ এ বলা হয়েছে। চলতি বছরের সূচনালগ্নে ৮ জানুয়ারি রোডটি সেফটি ফাউন্ডেশন থেকে পাঠানো সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহত ৫ হাজার ৪৩১ জনের মধ্যে ৮৭১ জন নারী ও ৬৪৯ জন শিশু। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত বছর ১ হাজার ৩৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হয়েছেন। যা মোট নিহতের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫১২ জন পথচারী নিহত হয়েছে। যা মোট নিহতের ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৮৩ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত বছরব্যাপী ১১৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ২৭২ জন নিহত, ১৩৭ জন আহত ও ৬২ জন নিখোঁজ হন। ১০৮টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২২৮ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হন। মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ ঘটেছে ভোরে, ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ সকালে, ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ দুপুরে, ২০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বিকালে, ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ১৭ দশমিক ৭১ শতাংশ ঘটেছে রাতে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। আর সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগেভ জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ময়মনসিংহে এবং সবচেয়ে কম মেহেরপুরে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সাতটি জাতীয় দৈনিক, পাঁচটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রাণহানি বেড়েছে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং আহতের হার বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আগের বছরে তুলনায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। করোনার সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালে দুই মাস সড়কে পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকার পরও দুর্ঘটনা ২০১৯ সালের তুলনায় বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছে এই সংগঠনটি। সেগুলো হলো- দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করতে হবে, বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্বরাস্তা তৈরি করতে হবে, পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; রেল ও নৌপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের ওপর চাপ কমাতে হবে, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে ও ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সিঙ্গাপুরের নামটি সামনে চলে আসে। সিঙ্গাপুরে পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি গঠিত হয় ১৯৯৫ সালে। এক দশকের ব্যবধানে সংস্থাটি দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে এক নম্বর। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশই নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশগুলোয় সংশ্লিষ্ট আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আইন বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসন খুবই কঠোর, কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি নির্দেশকও বটে। বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ। সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, উন্নয়নশীল দেশ বা মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে শামিল হওয়া বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা এখনো বিশৃঙ্খলই রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছে আইনটির বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে দ্রুত। সাজা ও জরিমানার পরিমাণ যা-ই নির্ধারণ হোক না কেন, তা বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ বাস্তবায়ন না হলে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থেকে কোনো লাভ হবে না। পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা এলে এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা গেলে দুর্ঘটনার পরিমাণ এমনিতেই কমে আসবে, যেমন কমে এসেছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে অপরিকল্পিত স্পিডব্রেকার বা গতিরোধকগুলোও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের পাশে হাটবাজার বসা, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব ইত্যাদি কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে জনগণকেও হতে হবে সচেতন। বলা হয়ে থাকে, কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য সুশৃঙ্খল পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থসামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শৃঙ্খল পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ ছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close