ড. মো. শাহ কামাল খান

  ৩০ নভেম্বর, ২০২১

বিশ্লেষণ

বন্ধুত্ব ও মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত

মানসিক ভারসাম্যহীন শিকলবন্দি কৃষিবিদ বজলু বন্ধুদের সহায়তায় অনেকটাই সুস্থ। এখনো পাশে আছেন ড. কামাল। মানসিক ভারসাম্যহীন প্রায় দেড় যুগ ধরে শিকলবন্দি কৃষিবিদ বজলু বন্ধুদের সহায়তায় অমানবিক জীবন থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে পেয়েছেন স্বাভাবিক জীবন। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের টুংরাপাড়া গ্রামে প্রায় দেড় যুগ ধরে নিভৃত পল্লীর নির্জন একটি কক্ষে শিকলবন্দি হয়ে মানবিক জীবন কাটাচ্ছিলেন সাফল্যের সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ থেকে ১৯৯৬ সালে বিএসসিএজি পাস করা একজন মেধাবী কৃষিবিদ মৃত আবদুল মালেকের ছেলে বজলুর রহমান। মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে প্রায় ১৮ বছর আগে জোর করে বজলুর পায়ে পরানো হয় শিকল। একটি অন্ধকার ঘরের ভেতরে উলঙ্গ শরীরে পাতলা কাপড় জড়িয়ে শিকলবন্দি বসে থাকতে দেখা যেত তাকে। মেঝের মাঝখানে পুঁতা একটি বাঁকা লোহার সঙ্গে আনুমানিক দেড় ফুট লম্বা শিকল পায়ের সঙ্গে লাগানো ছিল। স্বাভাবিকভাবে শোবার সুযোগ ছিল না, সারাক্ষণ বসে থাকতে হতো, ঘরের মধ্যেই মলমূত্র ত্যাগ করতে হতো। অযত্ন, অবহেলা আর অপুষ্টিতে শরীরে বাসা বেঁধে ছিল বিভিন্ন রোগবালাই, চেহারায় পড়েছিল বার্ধক্যের ছাপ। যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন এই মেধাবী ব্যক্তি। কিছু জানতে চাইলে প্রলাপ বকতেন। স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ায় নিজ পরিবারের কথাও বলতে পারতেন না। এক চরম অমানবিক জীবনের জলন্ত উদাহরণ যেন এই বজলু।

উল্লেখ্য, কৃষিবিদ বজলু শিকলবন্দি সংক্রান্ত বিভিন্ন শিরোনামে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ দুপুরে ১৯৮৮-৮৯ ব্যাচের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহতে বিএসসিএজি অনার্স পড়ুয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. শাহ কামাল খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব) মো. আতাহার হোসেন, উপপরিচালক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ঢাকা এ কে এম ইউছুফ হারুন, উপপরিচালক বিএডিসি জামালপুর রিয়াজুল ইসলাম টুটুল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম ফারুক মানিক, ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান বাকৃবি ময়মনসিংহ খাইরুল আলম নান্নু বজলুকে দেখতে যান। এক থেকে দেড় ফুট শিকলবন্দি বজলুর সঙ্গে উপস্থিত কর্মকর্তারা কথা বলার সময় এক আবেগঘন মুহূর্তের অবতারণা ঘটে। তার এ অবস্থা দেখে অনেকেই কেঁদে ফেলেন।

বজলুর চিকিৎসা ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শাহ কামাল খান। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রায় ১৭-১৮ বছর ধরে দেড় হাত শিকল দিয়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটা শূন্য ঘরের মেঝেতে আবদ্ধ থেকে অমানবিক জীবনযাপন করছিল বজলু; সেই করুণ পরিস্থিতির কথা বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরে তিনি জরুরিভিত্তিতে সহপাঠীদের সঙ্গে মিটিং করেন, বিষয়টি শেয়ার করেন এবং সশরীরে বজলুকে দেখতে আসেন। বজলুর করুণ পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না, তার দুই নয়ন গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রুজল। অনেকেই বলেছিলেন, দীর্ঘদিনের মানসিক রোগী বজলুকে চিকিৎসা করে লাভ নেই, সে কখনো সুস্থ হবে না। সেই নির্মম পরিস্থিতি থেকে ওকে মুক্ত করে তারা বন্ধুরা হাসপাতালে ভর্তি করে সুচিকিৎসাসহ সার্বিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন, বজলু পায় এক নতুন জীবন, অন্ধকার ভেদ করে আশার আলো দেখেন উনি। কৃষিবিদ শিকলবন্দি বজলুর রহমানকে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা ধীতপুর টুংরাপাড়া থেকে ১ অক্টোবর ২০১৯ সালে মঙ্গলবার ভোরে নেওয়ার পর ঢাকা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (শেরেবাংলা নগর) ভর্তি করা হয়। সে কেবিন : ৪-এ থেকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. আবদুল মুহিতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা গ্রহণ করে। বজলুর রহমান পরদিন অর্থাৎ ২ অক্টোবর ২০২০ সালে রাতে প্রায় ৬ ঘণ্টা ঘুমায়। যার স্বাদ সে হয়তো বিগত ১৭-১৮ বছর পায়নি। ৩ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে দিনের বেলায়ও ঘুমিয়ে সবাইকে অবাক করে এবং আশার আলো সঞ্চার করে। তাকে নিয়মিত ওষুধ ও খাবার খাওয়ানো হয়। স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি ফলমুল ও তরল খাবারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তার বন্ধু ড. মো. শাহ কামাল খান নিয়মিতভাবে খোঁজখবর নিতেন, সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগসাপেক্ষে পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা নিতেন, বন্ধুদের সাথে সমন্বয় করে অর্থের সংস্থান করতেন এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতেন। এমনকি ড. কামাল শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ হাতে বজলুকে খাওয়ায়ে এবং সঙ্গ দিয়ে আত্মতৃপ্তি পেতেন।

বজলুর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালাতে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না- সে প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারের মন্তব্যে এটুকু স্পষ্ট যে, তার অনেক দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। আমাদের বন্ধুদেরও এতে সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি ছিল না। তবে এতে একটা অভিনব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, সেটি হলো- বজলুকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য তার তিন ভাইয়ের একজনকে হাসপাতালে রাখা। নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের মারধর করার প্রবণতা লক্ষ করার মতো। তিনিও নাছোড় বান্দা। উদ্বুদ্ধকরণসহ নরম-গরম নানা কথার মাধ্যমে এমনকি প্রশাসনের সহযোগিতায় ওদের যেকোনো একজনকে পর্যায়ক্রমে বজলুর সঙ্গে অবস্থান করাটা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বজলুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হওয়ার পর বিগত ২০-৩-২০২০ সাল থেকে বজলু ময়মনসিংহে ভালুকার নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং তখন থেকে সে সেখানেই অবস্থান করছে। ওকে সেবা-শুশ্রুষার কাজটি সুন্দরভাবে চালিয়ে যাচ্ছে ওর ছোট ভাই মো. হারুন অর রশিদ। দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ওকে যথারীতি ওষুধ ও পথ্য দেওয়া হচ্ছে। ওর সার্বিক তত্ত্বাবধায়নসহ ওষুধ ও পথ্যের জন্য ড. কামাল ও তার বন্ধুরা যথারীতি খরচ বহন করে যাচ্ছেন। ওর পা অনেকখানি সোজা হলেও ‘ও’ এখনো হাঁটতে পারে না, যা সত্যিই বেদনাদায়ক। ওর চলাফেরার জন্য হুইলচেয়ার ক্রয় করে দেওয়া হয়েছে। হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে পেরে ‘ও’ ভীষণ খুশি। ওর বেডরুমে অ্যাটাস্ট বাথ ছিল না, সম্প্রতি সেটি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।

করোনা পরিস্থিতিতে বজলুর অবস্থা সম্বন্ধে জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, বর্তমান করোনার মহাসংকটে নিজের ও পরিবারের পাশাপাশি যার জন্য মনটা ভীষণ ব্যাকুল ও শঙ্কিত সে আর অন্য কেউ না সে তার বন্ধু বজলু। করোনার মহাসংকটে বজলুকে নিয়ে তিনি খুব টেনশনে থেকেছেন, একটা অজানা আশঙ্কায় বুকটা দুরুদুরু কম্পমান থেকেছে, কায়মনে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন ‘ও’ যেন ভালো থাকে, নিরাপদে থাকে। করোনাকালীন বজলুকে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে। মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বজলু ভালো আছে।

বজলুর বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, বজলুকে দেখার জন্য সম্প্রতি ভালুকার নিজ বাড়িতে গিয়েছিলাম। বজলুর সঙ্গে অনেক কথা হলো। এক টুকরো কাগজ ও কলম এগিয়ে দিয়ে ওকে স্বাক্ষর দিতে বললাম। ‘ও’ সুন্দর করে ইংরেজিতে ওর নাম লিখল। ওর ছোট ভাই হারুনের সঙ্গে বজলুর সার্বিক পরিস্থিতি জানলাম। ‘ও’ বর্তমানে ক্ষুধা লাগলে খাবার চায়, টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন হলে বলে বা নিজেই যায়; যা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। একপর্যায়ে বজলু অত্যন্ত অবাক ভরা কণ্ঠে অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমাকে প্রশ্ন করল, আমি কি কখনো হাঁটতে পারব না? ওর প্রশ্নে আমি চমকে উঠলাম, চক্ষুযুগল অশ্রুসজল হয়ে উঠল। ওর মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হলেও ‘ও’ এখনো হাঁটতে পারে না, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। দীর্ঘদিন ছোট্ট শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার কারণে ওর এই করুণ পরিণতি, পুরোনো ব্যথাটা আবারও নতুনভাবে অনুভূত হলো।

অর্থোপেডিকস ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক পায়ের বিশেষ ব্যায়াম অব্যাহত রয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ/আতঙ্ক কমলে বজলুকে ঢাকায় নিয়ে এসে একটা প্রসিদ্ধ ক্লিনিকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হবে। যাহোক, ‘ও’ এখন নিকট আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের চিনতে পারে। ওকে মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ওর বড় মেয়ের নাম ধরে ডাকতে থাকে। ওর বড় মেয়ে সিফাত ও তার দুই ছেলে এগিয়ে এলো। মেয়ে ও নাতিদ্বয়কে দেখে বজলু ভীষণ খুশি হলো, নাতিদ্বয়কে আমরা কোলে নিয়ে আদর করলাম। বজলুর মা অর্থাৎ খালাম্মাও এগিয়ে এলেন, তিনিও ভীষণ খুশি। আমরা সবাই মিলে ছবি তুললাম। পরিবারের সবাই খুশি। এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আমার যে কী আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না! বজলুর সফলতা যেন আমার সফলতা! বজলুর হাসি-কান্না-আনন্দ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া কেন যেন আমার মনের দর্পণে এক অন্যরকম প্রতিফলন ঘটায়! জানি না, কেন? বজলু পরিপূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে আছি এবং থাকব। ওর সঙ্গে এবং ওর পরিবারের সঙ্গে আমার এক আত্মিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ওর পরিবারকে আমার নিজের পরিবার মনে হয়। যাহোক, অনেক শুভাকাক্সক্ষী পরামর্শ, শ্রম, সময়, উৎসাহ ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন বা করে চলেছেন। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ১৯৮৮-৮৯ ব্যাচের বন্ধুদের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা। ওর দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য সবার কাছে দোয়া ও আন্তরিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য!

ড. শাহ কামাল একটি জনদরদি, পরোপকারী ও ভালো বন্ধুর নাম। এ প্রতিবেদন নিশ্চয়ই অনেক ব্যক্তিকে জনহিতকর কর্মকান্ডে উৎসাহিত করবে- সেই প্রত্যাশা রইল। জয় হোক বন্ধুত্বের, জয় হোক মানবতার।

লেখক : প্রকল্প পরিচালক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close