মাহমুদুল হক আনসারী

  ২৯ নভেম্বর, ২০২১

মতামত

ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

পৃথিবীতে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে চলেছে। কিন্তু এসবের মধ্যে ভূমিকম্পই হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ। কারণ এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে অনেক বেশি। মাটির নিচ থেকে হঠাৎ করেই যেন কেঁপে ওঠে গোটা পৃথিবী। লণ্ডভণ্ড করে দেয় পুরো এলাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গোটা ভূপৃষ্ঠই কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। আবার প্রতিটি স্তর একাধিক প্লেট। এসব বিশাল আকারের টেকটোনিক প্লেটগুলো যখন একের সঙ্গে অপরে ধাক্কা খায় তখন কেঁপে ওঠে মাটির নিচের তলদেশ। আর আমরা ভূপৃষ্ঠের ওপর ভূকম্পন অনুভব করি। ভূমিকম্পের কারণ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্তরে অনেকগুলো প্লেট আছে এগুলো আবার অনেকগুলো সাবপ্লেটে বিভক্ত। এগুলো সব সময় নড়াচড়া করছে। একটার সঙ্গে আরেকটার ঘর্ষণে এই ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়।’

আবার আগ্নেয়গিরির কারণে ভূ-অভ্যন্তরের ভেতর থেকেও ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো এলাকায় ভূপৃষ্ঠের গভীর থেকে অতিরিক্ত পানি কিংবা তেল উঠানোর ফলে ভূপৃষ্ঠের অবস্থানের তারতম্য ঘটে। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের বেলায় আগে থেকে বোঝা গেলেও ভূমিকম্প এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যায় এই বিশাল দুর্যোগ, যার ফলে পূর্ব সতর্কতা নেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে ক্ষয়ক্ষতিও হয়ে থাকে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে বেশি।

কিন্তু এমনটি কেন হয়? এর উত্তরে বলেছিলেন ভূ-তাত্ত্বিক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে প্লেটগুলো সব সময়ই ছয় থেকে নয় সেন্টিমিটার করে নড়াচড়া করছে এবং এর ফলে ভূত্বকের ভেতরে প্রবল শক্তি জমা হচ্ছে। এই শক্তি যখন ভূত্বকের ভেতরের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন হঠাৎ করে এর বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে আগে থেকে পূর্বাভাষ দেওয়া সম্ভব হয় না।’ বিজ্ঞানীদের মতে ভূমিকম্প যখন সৃষ্টি হয় তখন ভূত্বকের ভেতর তিন ধরনের ওয়েভ বা ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে যে কম্পনের ঢেউ সৃষ্টি হয় তাকে বলে প্রাইমারি ওয়েভ বা প্রি-ওয়েভ। এটি সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরেকটি ওয়েভ বা ঢেউ সৃষ্টি হয়, সর্বশেষ সারফেস ওয়েভটি গিয়ে আঘাত হানে ভূপৃষ্ঠে। এবং এটিই আমরা বুঝতে পারি যাকে আমরা ভূমিকম্প বলে থাকি।

উৎপত্তিস্থল থেকে ভূপৃষ্ঠে আসতে ভূমিকম্পের সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডের মতো। বিশেষজ্ঞরা এই মাঝখানের সময়টাকেই চিহ্নিত করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে করে আগে থেকেই ভূমিকম্পের পূর্বাভাষ দেওয়া সম্ভব হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিনই ভূপৃষ্ঠের ভেতরে কোথাও না কোথাও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সবগুলো অত জোরালো নয়। ভূমিকম্পের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে জমে থাকা শক্তি নির্গত হয়। এই শক্তিকে মাপা হয় রিখটার স্কেলের মাধ্যমে। সাধারণত ভূমিকম্পকে ১ থেকে ১২ মাত্রা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। তিন থেকে চার মাত্রার ভূমিকম্প বোঝা গেলেও ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয় না। তবে পাঁচ কিংবা ছয় পর্যন্ত পৌঁছে গেলেই সেগুলোকে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়। রিখটার স্কেলের এক মাত্রা পার্থক্যের অর্থ হচ্ছে আগেরটির চেয়ে পরেরটি ভূত্বকের ভেতর ৩২ গুণ বেশি শক্তিশালী। তবে ভূপৃষ্ঠে এই তীব্রতার পরিমাণ হয় ১০ গুণ বেশি। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা কিন্তু সব জায়গায় এক রকম নয়। এটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট জায়গাটি ভূপৃষ্ঠের টেকটোনিক প্লেটগুলোর কোনখানে অবস্থিত তার ওপর। টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থলগুলোতেই ভূমিকম্পের প্রচ-তা থাকে সবচেয়ে বেশি। তাই এসব জায়গায় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে অন্য জায়গার তুলনায় বেশি।

এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘যদি ঢাকা শহরের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে ভূপৃষ্ঠে যে পরিমাণ কম্পনের সৃষ্টি হবে তাতে নিচু ভবনগুলো ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর যদি ৩০০-৪০০ কিলোমিটার দূরে আট মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে এর ফলে দূর থেকে লং ওয়েভের ধাক্কা লাগবে এবং এর তীব্রতায় ভিন্ন ধরনের কম্পন সৃষ্টি হবে এবং উঁচু ভবনগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে তবে নিচু ভবনগুলো টিকে থাকবে।’

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের একাংশের নিচ দিয়ে টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল গিয়েছে। এই প্লেটের নড়াচড়ার কারণে প্রতি এক হাজার বছরে বাংলাদেশ ৩ থেকে ১৫ মিটার করে সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকোচনের ফলে ভূঅভ্যন্তরে প্রবল শক্তি জমা হচ্ছে। জমে থাকা এই শক্তি যেকোনো সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বের হয়ে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। ঘনবসতি দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হবে বলে তাদের আশঙ্কা। ভূমিকম্প নির্ঘাত সৃষ্টিকর্তার একটি আকস্মিক আজাব। বন্যা, সাইক্লোন, মহামারি, দুর্যোগ এসবও সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পৃথিবীর জন্য বড় ধরনের আজাব এবং গজব।

অনেকের মতে, মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য ভুলে যায়, তখন মানব সমাজে নানাবিধ আজাব ও গজব অবতীর্ণ হয়। পৃথিবীর শুরু থেকে গবেষণায় বিশ্লেষণ করলে জানা যায় বিভিন্ন সময়ে নানা জাতির ওপর ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি ও ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে। এটা মানবজাতির কর্মের ফল। আজকের যুগেও পৃথিবীতে মানবজাতি বেপরোয়া এক হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। পাপাচারে লিপ্ত হয়েছে। সীমাহীন পাপাচার করছে। অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণ করছে অধীনস্থদের ওপর। সুদ, ঘুষ, রাহাজানি, হত্যা, ছিনতাই এমন কোনো অপরাধ নেই যা সৃষ্টি কর্তার জন্য সংঘটিত করছে না সৃষ্টির সেরা মানবজাতি। এসব অন্যায়-জুলুম ব্যাভিচার যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে আসমানি ও জমিনি আজাব ও গজব অবতীর্ণ হয়। মানবজাতির উচিত হবে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অনুগতশীল হওয়া। তার আদেশ নির্দেশ এবং আপনাপন ধর্মের অমূল্য বাণী ও শৃঙ্খলা বাস্তবায়ন করা। মানুষে মানুষে হানাহানি, অন্যায় জুলুম, ব্যাভিচার বন্ধ করা। সৃষ্টির প্রতি আপন ক্ষমতা থেকে সদাচরণ করা। অহেতুক অধীনস্থদের ওপর অন্যায়-ব্যাভিচার না করা। এসব যদি মানবজাতি নিজ নিজ অবস্থান থেকে অনুসরণ অনুকরণ করে তাহলে অনেক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

লেখক : গবেষক, কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close