আবদুর রউফ

  ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

পর্যবেক্ষণ

লোভে পাপ পাপে মৃত্যু

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই লোভ মানব প্রজাতির অনেক পুরোনো প্রবৃত্তি। লোভ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে ফেলে। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। এটি একটি বহুল প্রচলিত প্রবচন। যার প্রতিফলন বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই হচ্ছে। নিত্যদিনই টেলিভিশনের পর্দা বা খবরের পাতায় লোভে পড়ে মানুষের প্রতারিত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্র এখন আধুনিকতায় ভরপুর। প্রতারণার সংবাদগুলো এত প্রচারের পরও বারবার মানুষ লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন জেনেশুনে বিষপান করার মতো। মানুষের লোভ বেড়ে যাচ্ছে ও মানবিকতা হ্রাস পাচ্ছে। স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উন্মোচিত হওয়ার পর মানুষের মানসিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ইতিহাসে যারাই পরিশ্রম ছাড়া স্বল্প সময়ে অধিক সফলতা অর্জনের পেছনে ছুটেছে তারাই ঠকেছে। এরই মধ্যে স্বল্প ইনভেস্টে অধিক লাভের আশায় যারা যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ও এসান গ্রুপের মতো প্রতারকদের হাতে অর্থ দিয়েছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকেই শেষ পুঁজিটুকু হারিয়ে পথে বসেছে।

বাংলাদেশে এমএমএল বা মাল্টি-লেভেল কোম্পানির সঙ্গে পরিচিতি খুব একটা বেশি দিনের নয়। এ দেশে জিজিএন বা গ্লোবাল গার্ডিয়ান টিসি ও টং সং নামের দুটি কোম্পানির মধ্যমে ১৯৯৮ সালে এমএমএল ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। তবে বিশ্বব্যাপী এই পদ্ধতিতে ব্যবসা আবিষ্কার করে আমেরিকার হেনরি হেইনজ নামের একজন ফেরিওয়ালা ১৮৬০ সালে। তবে ১৯৪৩ সালে আধুনিক এলএলএম ব্যবসার আবিষ্কার করেন ড. কার্ল রেইনবর্গ নামের একজন আমেরিকান। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালে শ্রীলঙ্কার বংশোদ্ভূত নারায়ণ দাস নামের একজন ব্যক্তি কানাডা থেকে খবর পান বাংলাদেশ এমএলএম ব্যবসার জন্য একটি উপযোগী দেশ। কারণ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন তখন এতটা বেশি ছিল না। তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি টং চং কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে গেলে নিউওয়ে প্রাইভেট লিমিটেড বাংলাদেশ ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড নামের দুটি কোম্পানি এ দেশের সাধারণ মানুষদের অতি দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখায়। সেই প্রতারণার জালে শহর থেকে গ্রামের কৃষক থেকে চাকরিজীবী অনেকেই পা দিয়েছেন। ২০০৯ সালের সরকারি হিসাব মতে গত এক যুগে বাংলাদেশ ৭০টির বেশি এমএলএল কোম্পানির জন্ম হয়েছে। সে সময় থেকেই বাংলাদেশ ধরনের কোম্পানির অনুমোদন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু তথ্য বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত দেশে প্রায় পনেরো শো এমএলএল কোম্পানির জন্ম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বব্যাপী ই-কমার্স ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়ের ব্যবধানে নতুন মোড়কে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে এমএলএম কোম্পানিগুলো।

সার্বিক বিষয় আলোচনা করলে মনেই হতে পারে এ দেশের মানুষ প্রতারিত হতেই পছন্দ করেন। গত ১৫ বছরের পরিসংখ্যান দেখলেই অনেকটা আন্দাজ করা যায়। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এখনকার ই-কমার্স, বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) কোম্পানি ও সমবায় সমিতির সব কটি মিলিয়ে মোট ২৮০টি প্রতিষ্ঠান দেশের মানুষের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা করেছে। যুবক নামের একটি কোম্পানির তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য দিয়েছে। এ সময় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অন্তত ২১ হাজার ১৭ কোটি টাকা লোপাট করেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক আকৃষ্ট করার প্রধান হাতিয়ার ছিল অধিক মুনাফা ও ছাড়ের লোভ দেখানো। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৬ সালে যুবকের ২ হাজার ৬০০ কোটি, ২০১১ সালে ইউনিপে টু ইউর ৬ হাজার কোটি, ২০১২ সালে ডেসটিনির ৫ হাজার কোটি এবং ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল সময়ে ২৬৬টি সমবায় সমিতির গ্রাহকদের ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা। এ ছাড়া চলতি বছর ১১টি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা ফেরত দিচ্ছে না বলে বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে রয়েছে ই-অরেঞ্জের গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, ইভ্যালির ১ হাজার কোটি টাকা, ধামাকার ৮০৩ কোটি টাকা, এসপিসি ওয়ার্ল্ডের ১৫০ কোটি টাকা, এহসান গ্রুপের ১১০ কোটি টাকা, নিরাপদডটকমের ৮ কোটি টাকা, চলন্তিকার ৩১ কোটি টাকা, সুপম প্রোডাক্টের ৫০ কোটি টাকা, রূপসা মাল্টিপারপাসের ২০ কোটি টাকা, নিউ নাভানার ৩০ কোটি টাকা এবং কিউ ওয়ার্ল্ড মার্কেটিংয়ের গ্রাহকদের ১৫ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে আরো কিছু প্রতিষ্ঠান নাম সামনে আসছে যারা গ্রাহকদের অতি লোভের ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

বাস্তবতা বলছে, আমাদের অতি দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। অতি লোভের আশায় বারবার আমরা প্রতারিত হচ্ছি। কিন্তু সেখান থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করছি না। ফলে ওই কোম্পানিগুলোই যখন ভিন্ন নামে মাঠে নামছে তখন আবারও আমরা তাদের বিশ্বাস করছি। আবার অতি লোভের আশায় প্রতারিত হচ্ছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মূল কারণ দুটি। প্রথমত. নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি এবং কোনো প্রতিষ্ঠানে এ রকম অস্বাভাবিক লেনদেন দেখলে স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা। দ্বিতীয়ত. এসব প্রতিষ্ঠান নজরকাড়া বিজ্ঞাপনে দেশের নামিদামি সেলিব্রিটি যাদের মানুষ বিশ্বাস করে এমন কাউকে ব্যবহার করা। অনেকেই তাদের বিশ্বাসে না বুঝে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে থাকে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় শুধু যে স্বল্পশিক্ষিত মানুষই প্রতারিত হচ্ছে এমনটি নয়, বরং অনেক শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত মানুষ অতি লোভের আশায় এসব প্রতারকের ফাঁদে পা দিচ্ছে। অথচ একটু মাথা খাটিয়ে দেখলেই এদের প্রতারণার কৌশল ধরে ফেলা যায়। কিন্তু মানুষের সৃষ্টিগত চরিত্র হচ্ছে বিশ্বাস করা এবং প্রতারিত হওয়া। কোনো কিছু বিশ্বাস করার আগে যাচাই-বাছাই করা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ কখন প্রতারিত হয়, অতি দরিদ্রতা, কর্মসংস্থানের অভাব, গণতন্ত্রের অভাব মোটকথা মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে যখন বঞ্চিত হয় তখন না বুঝেই লোভের ফাঁদে পা দেয়। যদি মানুষ তাদের রাষ্ট্রীয় অধিকারগুলো সঠিক মতো ভোগ করতে পারত তাহলে হয়তো এই লোভের ফাঁদে পা দিত না।

বারবার মানুষ প্রতারিত হলেও কেন আগে থেকেই দায়িত্বশীল প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। যখন এসব প্রতারক কোম্পানির কার্যকলাপ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করা হয়, তখন তারা বলেন অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব। স্বপ্রণোদিতভাবে কখনোই ব্যবস্থা গ্রহণ করার নজির বাংলাদেশ তেমন নেই। এর আগে যেসব এমএলএম কোম্পানি গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে এখন পর্যন্ত একটি টাকাও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। তাই রাষ্ট্র কোনোভাবে দায়ভার এড়াতে পারে না। এ ক্ষেত্রে দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিক অফারের বিজ্ঞাপন দেখলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে দেশের নামিদামি ব্যক্তিবর্গকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে যেন তাদের ব্যবহার করে কেউ প্রতারণা করতে না পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আলেম-ওলামা মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ব্যবহার করে একদল প্রতারক হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। ধর্মকে ব্যবহার করে গ্রামের সহজ সরল মানুষদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। সে ক্ষেত্রে ইসলামিক স্কলার্স মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদেরও সতর্ক হতে হবে।

অতি লাভের আকাক্সক্ষা থেকে আমাদের সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মেই লোভ-লালসা বর্জন করতে বলা হয়েছে। লোভ-লালসা বর্জন করা একজন ইমানদারের চিহ্নও বটে। তাই পারিবারিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি ও ধর্মীয় অনুশাসনে অভ্যস্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এসব প্রতারক কোম্পানির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতার আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, তেমনি আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোথাও বিনিয়োগ করার আগে জেনেবুঝে বিশ্লেষণ করে বিশেষ করে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে তারপর করতে হবে। অতি দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এর আগে যারা প্রতারিত হয়েছেন তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। দেশের একটি মানুষও যেন প্রতারণার শিকার না হয় সেদিকে সরকার বিশেষ নজর দেবে- এমনটিই প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও

সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close