রেজাউল করিম খান

  ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

দৃষ্টিপাত

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর হুশিয়ারি

গত ১৮ আগস্ট সচিব সভায় ব্যাপকহারে বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে দুর্নীতির বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুশিয়ার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেহেতু আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি, অর্থনৈতিকভাবে অগ্রগতি হচ্ছে, এজন্য কোনো ধরনের দুর্নীতিকে আমরা সহ্য করব না। সেটিকে মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। যেখানে দুর্নীতি দেখবেন সেখানেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগেও একাধিকবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের সাম্প্রতিক কিছু ব্যবস্থাা গ্রহণ ও ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ মতো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আশঙ্কা সম্পর্কে বেশ কিছু খোলামেলা মন্তব্য করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি এটুকু বলতে পারি যে, ওয়ান-ইলেভেন হওয়া লাগবে না। কোনো অন্যায় হলে, তার ব্যবস্থা আমি নেব। সে আমার দলের হোক, আর যেই হোক। ঘুষ খাবে, দুর্নীতি করবে, আর ওদিকে হালাল মাংস খুঁজবে। আমার ওপর অনেকে অখুশি হতে পারে। কিন্তু আমার কিছু আসে যায় না। তারপর কোনো ট্যাক্স দেবে না। এগুলো তো হতে পারে না।’ ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ২১টি দফার মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি উল্লেখ করা হয়। কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

দৃশ্যমান উন্নয়নের ফলে দলগতভাবে না হলেও ব্যক্তি শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তবে দেশে নানা খাতে দুর্নীতি ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। এ নিয়ে দেশে অসন্তোষ আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন শেখ হাসিনার ৯ জন নিকট আত্মীয়। তাদের কাউকে তিনি মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেননি। স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী ও আমলাদের কাছে এমন বার্তা দিয়েও তেমন ফল হয়নি। নতুন সরকারে শেখ হাসিনা তার দল আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সৈয়াদা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিমকে মন্ত্রী করেননি। তারা সবাই তার চেয়ে বয়সে বড় এবং প্রভাবশালী নেতা। অনেক সময়েই তাদের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বলা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার প্রধানকে তিনটি বাধা অতিক্রম করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনরা মনে করেন। প্রথমত, দলীয় নেতাকর্মী, বিশেষ করে মন্ত্রী-এমপি ও তাদের নিকটজনরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটি বাহিনী তৈরি করে নেয়, এলাকাভিত্তিক টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যটা এরা নিয়ন্ত্রণ করে। দুর্নীতির এই ক্ষেত্রটি দেশের তৃণমূল পর্যন্ত আলোচনার খোরাক জোগায়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে। তাদের দুর্নীতির কাছে অনেক সময় রাজনীতিকদের অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়। নতুন মন্ত্রিসভায় বেশির ভাগই নতুন মুখ। মন্ত্রিত্ব চালানোর অভিজ্ঞতা তাদের নেই। অনেকেই মনে করছেন, আমলারা এই সুযোগ পেয়েছে বলেই দুর্নীতি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় অংশ ব্যাপকভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এদের সামাল দেওয়া কঠিন কাজ। সরকারি চাকরি আইন-২০১৮-এর ৪১ ধারার (১) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সহিত সম্পর্কিত অভিযোগে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হইবার পূর্বে, তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে হইলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করিতে হইবে।’ এই আইনের ফলে তারা অনেকটাই নিরাপদ বোধ করেন।

২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি সরকারি চাকরিজীবীদের পে-কমিশনের সুপারিশ প্রকাশিত হয়। সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন শতভাগ বাড়ানো এবং মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে চক্রাকারে ইনক্রিমেন্টের সুপারিশ করা হয়। পে-কমিশন সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা মূল বেতনের সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি পদোন্নতি হোক বা না হোক, সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরির বয়স ১৫ বছরে বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশ করে। এ ছাড়া বাড়ি নির্মাণ, পেনশন ও বিমার ক্ষেত্রে কিছু সুবিধার কথা বলা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল নজীরবিহীন ঘটনা। সরকারের তরফ থেকে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, বেতন-ভাতা বৃৃদ্ধি করলে সরকারি অফিসে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে সেটির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। ২০১৮ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন ২১৬টি মামলা দায়ের করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির যে ব্যাপকতা সে তুলনায় এই মামলার সংখ্যা সমুদ্রের কয়েক ফোটা পানির মতো। তবে কমিশনের যুক্তি হচ্ছে, মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে তারা বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছেন এবং এ ক্ষেত্রে দালিলিক প্রমাণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তারা বলছেন, সরকারি খাতে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির ফলে দুর্নীতি তো কমেইনি বরং আরো বেড়ে গেছে। এর একটি বড় জায়গা হচ্ছে, বেতন বৃদ্ধির কারণে সরকারি চাকরি পেতে অনেকে মরিয়া হয়ে উঠছেন। ফলে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় ঘুষের লেনদেন বেড়েছে। এ ছাড়া বেতন বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঘুষের পরিমাণও বেড়েছে। ‘দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হবে’ দুর্নীতিবাজরা এটি মনে করে না। দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললেই তাদের মুখ থেকে চরম হতাশা এবং ক্ষোভ শোনা যায়। দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতই কথা বলুক তাতে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না সাধারণ মানুষ।

সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার সামান্য একটি অংশ মাত্র। তাদের বর্ধিত বেতন-ভাতার অর্থের সংস্থান করতে সরকার নানাভাবে কর বৃদ্ধির আয়োজন করেছে। যার চাপে পিষ্ট হতে হচ্ছে গোটা দেশের মানুষকে। যাদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যাই বেশি। তারা সরকারি চাকরির বেতন-ভাতার সুবিধাভোগী নন কোনোভাবেই। পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর স্বাভাবিকভাবে বাড়িভাড়া বেড়েছে, বেড়েছে যানবাহনের ভাড়াও। কাক্সিক্ষত হারে সরকার যদি রাজস্ব আদায় করতে না পারে তাহলে বর্ধিত বেতন-ভাতার অর্থের সংস্থানের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ বা সামাজিক খাতের বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। অন্য দিকে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা থাকে।

১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী চাকরি বিধিমালায় বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় এবং প্রতি পাঁচ বছর পরপর সবাই সম্পদের হিসাব দেবেন। ফলে চাকরি শুরুর সময় সম্পদ কেমন ছিল এবং পরে কত বাড়ল তা স্পষ্ট হবে। আর এই হিসাব দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফরম থাকার কথাও আছে বিধিমালায়। অথচ গত ৪০ বছরে সেই ফরম তৈরি হয়নি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় একবার সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছিল। আর সর্বশেষ কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের সম্পদের হিসাব নিয়ে দুদককে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একজন সাংবাদিককে নির্যাতনের অভিযোগ আছে। তবে এর বাইরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একবার সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনে সম্পদের হিসাব না দিলে শাস্তির বিধান থাকলেও ৪০ বছর ধরে কেউ সম্পদের হিসাব দেননি।

বড় ব্যবসায়ীরা সব সময়ই রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন। অর্থের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা একবারে কম নয়। ব্যবসা ও রাজনীতির এই পরস্পর নির্ভরশীলতাকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন অর্থনীতিতে নতুন একটি পুঁজিবাদী ধারা তৈরি হয়েছে। এর নাম ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ। সহজ অর্থে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বলতে বোঝায় রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বড় বড় ব্যবসা ও প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেওয়া। স্বজনতোষী পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো নীতিনৈতিকতার লঙ্ঘন। একটি বড় ব্যবসা বা প্রকল্পের কাজ পেতে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে, এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কাজ দেওয়া হয়। সে কারণে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অনৈতিক লেনদেনেও জড়িয়ে পড়েন। রাষ্ট্রের জন্য যা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। বাস্তবতাও সে কথাই বলছে। সুতরাং...;

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close