মো. হাছিবুল বাসার

  ৩০ জুলাই, ২০২১

ফিরে দেখা

মুসলমানরাই আধুনিক বিজ্ঞানের পথিকৃৎ

আজকের এই পৃথিবীতে মুসলিম জনসংখ্যা ২০০ কোটির মতো। পুরো বিশ্ব এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় মত্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ এ কথা কেউ আর ভাবে না যে, এই জ্ঞান-সভ্যতার অন্বেষণে শুরুটা কে করেছিল? মুসলমানরা এখন পাশ্চাত্যের সাফল্যে গর্ব করাতেই ব্যস্ত। কিন্তু হায়! যখন ইউরোপবাসীরা দস্তখত তো দূরের কথা দুহাতের সাহায্যে টিপসইও দিতে জানত না, তখন মুসলিম স্পেনে একজন নিরক্ষর লোক পাওয়া যেত না। আজ মুসলিম সমাজ তাদের মূল পুঁজি কোরআন-হাদিসকে অবহেলা করে বিশ্ববাসীর হাসির খোরাক ও হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। নানারূপ নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়গুলো। ফলে আড়ালে ঢেকে গেছে মুসলমানদের উদ্দীপ্ত ইতিহাস।

একবিংশ শতাব্দীর মানুষের ধারণা ও বিশ্বাস যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান নেই। এ বিশ্বাস ও চেতনা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। রসায়ন, পদার্থ, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে মুসলমানদের অবদান অবিস্মরণীয়; যা আমরা অনেকে জানি না। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান অন্যান্য ধর্ম ও জাতির তুলনায় অনেক বেশি। ইসলামের সূচনা থেকেই শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের যাত্রা হয়। মুসলিম দার্শনিকদের সৃষ্টিশীল প্রতিভার ফলেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অভাবনীয় সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের গুরুত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে মধ্যযুগের মুসলমানরা আপন হৃদয়ের জ্ঞানরূপ আলোকবর্তিকা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেন। পৃথিবীর সব জ্ঞান আহরণ করে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন। খলিফা মনসুর, হারুন অর রসিদ, মালিক শাহ ও মামুনের সময় জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা চরমে পৌঁছেছিল। বাগদাদ, মিসর, মরক্কো, স্পেন, পারস্য, সিসিলি, গ্রানাডা প্রভৃতি স্থান ছিল সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, উদ্ভিদবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, অংক, বিজ্ঞান, বীজগণিত, জ্যামিতি, চিকিৎসাশাস্ত্র, সামরিক শিক্ষা, তফসির, হাদিস, ফেকাহ, শিল্পকলা, নৌবিদ্যা, শিল্প-বাণিজ্য ইত্যাদি শিক্ষা লাভের প্রাণকেন্দ্র। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইউরোপে যখন জ্ঞানের আলো পৌঁছেনি; তখনো আরববাসী জ্ঞান-বিজ্ঞানে ছিলেন অনেক অগ্রগামী।

রসায়নশাস্ত্রকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রাচীন ভ্রান্ত ধারণা থেকে উদ্ধার করে পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে উন্নত করতে মুসলিম বৈজ্ঞানিক জাবির ইবনে হাইয়ানের রয়েছে অভূতপূর্ব অবদান। তিনি ২ হাজারেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে রয়েছে ২৬৭ খানা রসায়নশাস্ত্র নিয়ে রচিত। মধ্যযুগে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে গভীর সাধনা করেন ইবনে সিনা, ইবনে জাহর, আল জাহরাওয়ী, উবায়দুল্লা জেব্রিল, আলী ইবনে সহল রব্বান আল-তাবায়ী, আল রাজী, আলী বিন-আব্বাস ও আল মজসী। চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে ইবনে সিনার লিখিত গ্রস্থ ‘আল কানুন’কে চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল বলা হয়। আরববাসীর মধ্যে গণিতশাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন খোয়ারীজমি ও ইবনে মুল্লাহ। খোয়ারীজমির লিখিত ‘হিসাবুল জবর ওয়াল মু কাবল’ গ্রন্থটি সর্বপ্রথম বীজগণিতের পাঠ্যপুস্তকরূপে সমাদৃত হয়। পৃথিবী যে গোল, তাও তিনি ১১৮৬ সালে তার রচিত ‘সুরাত আল আরদ্ধ’ নামক গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণ করে দেখান। তাছাড়া ইবনে মুসা একধারে গণিতবিদ, ভূগোলবিদ, জ্যোর্তিবিদ ও দার্শনিক ছিলেন। ৮৫০ সালে তিনিই প্রথম মানচিত্রের ব্যবহার দেখান।

নৌ-সংক্রান্ত কম্পাস আবিষ্কার করে মধ্যযুগের মুসলমানরা সমুদ্রযাত্রা করে বিভিন্ন দেশ আবিষ্কার করেন। আব্দুর রহমান, জায়হানী, আল ইদ্রিসী, আল বকরী, খুরদেচ্ছি, আল মামুদী, হাওকল আল-মুকদ্দসী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভূগোলজ্ঞ ছিলেন। আরবি নাবিক আব্দুর রহমানের নির্দেশে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন। ১৫১৩ সালে নায়ক পিরি রইস দূরত্ব ও কম্পাস নির্দেশনার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা উপকূল চিত্র হরিণের চামড়ার ওপর অঙ্কন করেন। তিনি নৌবিজ্ঞান, আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগর নিয়ে অতি মূল্যবান কয়েকখানা গ্রন্থ রচনা করেন। বৈজ্ঞানিক আব্দুর হাসান টিউব থেকে টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ ও ইবনে বয়তার মুসলিম স্পেনে উদ্ভিদবিদ্যায় অসাধারণ পা-িত্য দেখিয়েছিলেন। আল-মাজিরিত, আল জারকালি ইবনে আফলাহ মোহাম্মদ বিন ইব্রাহিম ও আল ফাজারি সে যুগের প্রসিদ্ধ জ্যোর্তিবিদ ছিলেন। ১০৬৮ সালে স্পেনের সঈদ আসসাফি একটি আন্টোলের তৈরি করেন, যা দ্বারা বছরে সূর্যের গতিপথ নির্দেশিত এবং ২৮টি তারকার অবস্থান বোঝা যায়। বর্তমানে এটা অক্সফোর্ডের মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি অব সায়েন্স-এ সুরক্ষিত আছে।

মধ্যযুগে কাব্য ও সাহিত্য সাধনায় অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন ইবনে আবদে রাব্বি, আবু ওয়ালিদ, শেখ সাদী, ইসফেহানী, ইবনে খালিকান, ফেরদৌসী, আবু নেওয়াজ, আল বুহতারী, দাকিকি, জালাল উদ্দিন রোমী ও মোহাম্মদ বিন ইসহাক। সাদীর গোলস্তান, বোস্তান এবং ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ গ্রন্থ পৃথিবীতে বিরল। মুসলিম বিশ্বের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ হামাদান, মামুদি, তাবারী ইবনে আলকাতুহার আব্বাসী যুগে জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে আল কাতিব, ইবনে খালদুন আবু উবায়দুল্লাহ, আবু মারওয়ান, আলী ইবনে হাজম স্পেনের সমুন্নত ঐতিহাসিক ছিলেন। হাজন ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, তর্কশাস্ত্র ও কবিতা নিয়ে চারশ অধ্যায়ের গ্রন্থ রচনা করেন। মুসলিম মনীষীদের মধ্যে ওমর খৈয়ামের দান অতুলনীয়। তিনি গণিতবিদ, জ্যোর্তিবিদ, ঔপন্যাসিক ও প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন। পদার্থবিদ্যা, অংক, রসায়নশাস্ত্র মুসলিম সাধক আল কাবরীর রয়েছে অসংখ্য অবদান। আরববাসীর মধ্যে দর্শন নিয়ে গভীর সাধনা করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছেন ইমাম গাজ্জালী, আলফারাবী, ইবনে সিনা এবং আলকিন্দি। মালিক শাহ নিজামুল মুলকের সরকারের নিয়মকানুন ও কৌশল-সংক্রান্ত ‘সিয়াসতনামা’ গ্রন্থটি রাজনীতিবিদদের পথপ্রদর্শনস্বরূপ।

খলিফা মনসুর পৃথিবীর প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ বিভাগ স্থাপন করেন। খলিফা হারুন ও মামুনের সময় তা আশাতীত প্রসার লাভ করে। মামুন লুকের ছেলে কাতাকে আর্কিমিদিস, ইউক্লিড, এরিস্টটল, প্লেটো, গ্যালন প্রমুখ গ্রিক মনীষীদের গ্রন্থাবলি অনুবাদের পদে নিযুক্ত করেন। পন্ডিত হোসাইনকে বিদেশি বিজ্ঞানের গ্রন্থাবলি, আহয়া নামক পারসিককে ফারসি গ্রন্থাবলি এবং ভারতের ব্রাহ্মণ দুবানকে সংস্কৃত ভাষায় মূল্যবান গ্রন্থ অনুবাদের জন্য নিয়োগ করেছিলেন। তিনি ‘বায়াতুল হিকমত’ বাগদাদে স্থাপন করে আধুনিক ফারসি কবিতায় প্রতিষ্ঠাতা কবি আব্বাস ও আলকিন্দিকে নিযুক্ত করেন। প্রসিদ্ধ জ্যোর্তিবিদ মোহাম্মদ বিন ইব্রাহিম আল ফাজারী খলিফা মামুনের অনুরোধে ভারতীয় জ্যোর্তিবিদ্যার ‘সিদ্ধান্ত’ গ্রন্থটি আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন।

৭১২ সালে আরবরা যখন ভারতের সিন্ধু, মুলতান ও পাঞ্জাব জয় করে, তখন থেকে আরব জাতি ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। আল বেরুণী মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে সংস্কৃত ভাষায় পান্ডিত্য লাভ করে আরবি ভাষায় সংস্কৃতের অনেক নীতিমূলক গল্প ও তত্ত্ব তুলে ধরেন। বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও ভারতের মান-মর্যাদাগুলো পৃথিবীর মানুষের সম্মুখে তুলে ধরেন। তাছাড়া আল বেরুণীর ‘আল-হিন্দ’ গ্রন্থটি বিশ্ব আল বেরুণীর ইন্ডিয়া নামে পরিচয় লাভ করে। বিভিন্ন বিজ্ঞানে, গণিত, জ্যোর্তিবিদ, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভূগোল, ইতিহাস নিয়ে গভীর সাধনা করেন আল বেরুণী। তার গণিত ও জ্যোর্তিবিদ্যা সম্বন্ধে লিখিত ‘আলমামুদ ফিল হায়াৎ ওয়ান্নাজুম’ এবং ‘কানুন’ গ্রন্থদ্বয় এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য; যার মধ্যে ছিল জ্যোর্তিবিদ্যা, ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি ও অংক।

সবদিক বিবেচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান বিশ্বের বিশেষ করে ইউরোপের নবজাগরণই হচ্ছে মধ্যযুগের মুসলিম মনীষীদের ৭০০ বছরের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার অমৃত ফল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম মানবসভ্যতাকে উন্নত শিখরে পৌঁছে দিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান বর্ণনাতীত। তবে একবিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানান। যা মোটেই কাম্য নয়। কারণ মুসলিম মনীষীরা বিজ্ঞানের উৎকর্ষে যে অবদান রেখেছে, তা ভুললে আজকের বিজ্ঞানের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তবে বর্তমান মুসলমানদেরও অবশ্যই তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে তাদের পূর্ব মনীষীদের দেখানো পথে হাঁটতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close