ডক্টর আবু জাফর সিদ্দিকী

  ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০

দৃষ্টিপাত

করোনায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখে শিক্ষার্থীরা

করোনা মহামারির কারণে দেশের অন্যান্য খাতের মতোই শিক্ষা খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে। গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে। করোনার বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর বেশির ভাগেরই পড়াশোনা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক থেকে এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া পুরোপুরি শ্রেণিকক্ষনির্ভর। শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা যখন বিঘিত হয়, তখন তার প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। টেলিভিশন ও অনলাইনে লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এর সাফল্য নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। কারণ সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আদান-প্রদান হয়, তা অনলাইন বা টেলিভিশনে সম্ভব নয়। যার ফলে গত আট মাসে অনেক শিক্ষার্থী বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অনেক অভিভাবক নিজেদের চেষ্টায় শিক্ষার্থীদের সংকট কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হলেও দেশের বেশির ভাগ অভিভাবকের দ্বারা তা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। মহামারির মধ্যে এবার পঞ্চম ও অষ্টমের সমাপনী পরীক্ষা এবং মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা নেবে না সরকার। আর অষ্টমের সমাপনী এবং এসএসসি ও সমমানের ফলের ভিত্তিতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কী হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানই টেস্ট পরীক্ষা নিতে পারেনি। মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে গত ১৪ নভেম্বরের পর সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার চিন্তা এর আগেও করা হয়েছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণের মধ্যে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষাপঞ্জি অনুসারে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি ও সমমানের এবং আগামী ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। নভেম্বর মাসে এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এইচএসসির টেস্ট পরীক্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু এখন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের সিলেবাসও শেষ হয়নি। এটাও দুশ্চিন্তার বড় কারণ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তামুক্ত করতে একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। এখনো করোনার সংক্রমণ থেকে আমাদের জীবন কবে নিরাপদ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই করোনার সংক্রমণে দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। করোনার এই থাবা পড়েছে শিক্ষা খাতেও। গত মার্চের দিকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে না। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশের শিক্ষাকার্যক্রম অনেকটা তছনছই হয়ে গেছে। প্রাথমিক সমাপনীর (পিইসি), অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) ও এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সেই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়নি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাও। দীর্ঘ এক যুগের চেষ্টায় দেশের পুরো ‘শিক্ষা ক্যালেন্ডারে’ ফিরে এসেছিল শৃঙ্খলা। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ক্যালেন্ডারে শৃঙ্খলা ফেরার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় সেশনজটও চলে এসেছিল সহনীয় মাত্রায়। তবে করোনার ছোবলে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে এখন ওলট-পালট পুরো শিক্ষা ক্যালেন্ডার, বিপর্যস্ত শিক্ষাকার্যক্রম। অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার থেকে একটি বছর হারিয়ে যাচ্ছে।

------
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন টানা বন্ধের ঘটনা আর ঘটেনি। করোনার কারণে শিক্ষার সংকট এখন পৃথিবী জুড়েই। তবে বাংলাদেশে সংকট ভিন্ন। একদিকে করোনাভাইরাস, অন্যদিকে বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার মানুষের হাহাকার আমাদের জীবনকে আরো যেন বেশি করে স্বপ্নহীন করে তুলেছে। সবচেয়ে দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোর, তরুণদের ভবিষ্যৎ চিন্তা। অনেক শিক্ষাবিদই আশঙ্কা করছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ফিরবে না। তাদের মতে, অন্য নানা খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও যে করোনার ফলে এক মহাবিপর্যয়ের আগমন ঘটতে চলেছে, সে ব্যাপারে অনেকে বুঝতেও পারছেন না। নিঃসন্দেহে করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার নিকট অতীতের যেকোনো সময়কে ছাপিয়ে যাবে।

দেশে করোনাকালে শিক্ষার সামনে আসা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। করোনার ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য একটি জাতীয় শিক্ষা কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করেছেন তারা। বেশ কিছু ত্রুটি নিয়ে চলা অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের অনেক সমালোচনা থাকলেও এটাকে মন্দের ভালো বলছেন সবাই। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগামীতে ছুটি কমানো, অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রাখা, শিক্ষকদের ইনসেনটিভের ব্যবস্থা করে বিশেষ ক্লাস নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। ছাত্রছাত্রীদের জীবন থেকে যে একটি বছর হারিয়ে যাচ্ছে সেটি আগামী দুই বছরের মধ্যে যাতে সমন্বয় করা যায় সে ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে শিক্ষার এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। এ সংকট নিরসনে জরুরি উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়