আবুজার গিফারী

  ২৫ নভেম্বর, ২০২০

বিশ্লেষণ

গরিবদের আইনগত অধিকার

সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। নাগরিকের আইনগত অধিকার লঙ্ঘিত হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, অধিকারবঞ্চিতদের আইনি অধিকার রক্ষা এবং নিশ্চিতকল্পে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করা। দেশের দরিদ্র ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীরা যখন দেওয়ানি বা ফৌজদারি অধিকার রক্ষার্থে অর্থের অভাবে আইনি প্রক্রিয়ার অংশগ্রহণ করতে পারেন না বা আইনজীবী নিয়োগ দিতে অক্ষম তখন সরকারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা পাওয়া তাদের একটি মৌলিক বা সাংবিধানিক অধিকার। আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২(ক) ধারা অনুযায়ী আইনগত সহায়তা বলতে বোঝায় ‘আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায় সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীকে আইনি সহায়তা প্রদান করা’। যেমন কোনো আদালতে করা বা বিচারাধীন মামলায় আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান কিংবা মামলার প্রাসঙ্গিক খরচ প্রদানসহ অন্য যেকোনো সহায়তা প্রদান। কিন্তু আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার বৃহৎ একটি অংশ নিরক্ষর ও অসচেতন হওয়ার কারণে কীভাবে আইনগত সহায়তা পেতে হয়? বা কারা আইনগত সহায়তা পাবেন? এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় প্রতিনিয়ত অনেকে আইনগত সহায়তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে; ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী’। রাষ্ট্রে সকল জনগণের মধ্যে আইনের সমান অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে ঈধহধফরধহ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ অমবহপু-এর সহযোগিতায় দরিদ্র বিচারপ্রার্থীর জন্য আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ পাস করেন। ওই আইন কার্যকর করার জন্য সরকার ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলি ইত্যাদি) প্রবিধানমালা-২০১১, আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা-২০১৪, আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা-২০১৫, আইনগত সহায়তা প্রদান প্রবিধানমালা-২০১৫, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (চৌকি আদালতের বিশেষ কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলি ইত্যাদি) প্রবিধানমালা- ২০১৬, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (শ্রম আদালতের বিশেষ কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলি, ইত্যাদি) প্রবিধানমালা-২০১৬ পাস করে। কিন্তু আইনগত সহায়তা গ্রহণ বিষয়ে সাধারণ জনগণের সঠিক তথ্য জানা না থাকার কারণে তারা আইনগত সহায়তা পাচ্ছেন না তথা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সুযোগ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

------
ইউরোপীয় মানবাধিকারের ৬ দশমিক ৩ নম্বর নিবন্ধে উল্লেখ আছে, ‘সকলের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইনি সহায়তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ভঙ্গুর’। বাংলাদেশের পাশাপাশি আরো অনেক দেশ আছে যেখানে অসচ্ছল ব্যক্তিদের আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়। যেমন; ভারত, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ভারতের সংবিধানের ৩৯(ক) নিবন্ধে ন্যায়বিচারের সমতা এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া, নাগরিকের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যক্তি বিশেষে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করবেন। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক বা অন্যকোনো অক্ষমতার কারণে যাতে কোনো নাগরিক ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় সেটাও নিশ্চিত করবেন। নিউজিল্যান্ডে যাদের আইনজীবী নেওয়ার সামর্থ্য নেই তাদের আইনি সহায়তা সরাসরি সরকারি অর্থায়নে দেওয়া হয়। সেখানে সব ধরনের আদালতের কার্যক্রম ব্যবস্থায় আইনি সহায়তা রয়েছে। কানাডাতে যারা গরিব ও অসচ্ছল তাদের মামলার খরচ যৌথভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার বহন করেন। ডেনমার্কে বেসামরিক মোকদ্দমার জন্য আবেদনকারীদের আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত মানতে হয়। যেমন; আবেদনকারীর বার্ষিক আয় কেআর. ২,৮৯,০০০ ($ ৫০,০০০)-এর বেশি হতে পারবে না। এমনকি অপরাধমূলক মোকদ্দমার জন্য যিনি অপরাধী তার আয় অনুসারে শুধুমাত্র মামলার খরচটা তাকে দিতে হবে। মামলার খরচ নেওয়ার মূল কারণ হলো, অপরাধী পরবর্তী সময়ে যাতে একই বা অন্যকোনো অপরাধ না করে। ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসেও আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে আইনি সহায়তার জন্য এক বছরে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে কর প্রদানকারীদের খরচ হয় ২ বিলিয়ন, যেটা পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকে অনেকাংশেই বেশি। ১৯৬৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা আইনি সহায়তার গুরুত্ব বুঝতে পেরে দক্ষিণ আফ্রিকা আইনি সহায়তা বোর্ড গঠন করেন। এটি ১৯৭১ সালে কাজ শুরু করে এবং বর্তমানে পুরো দেশে আইনি সহায়তা প্রদান করে থাকে। আইনি সহায়তার সিদ্ধান্ত নির্বাচনে এটি সরকার থেকে স্বাধীন (সূত্র : উইকিপিডিয়া)।

দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণকে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৩ সালে প্রথবারের মতো বাংলাদেশের সরকার ‘আইন সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ কার্যকরের তারিখ ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। সে হিসাব মতে, এ বছর দেশে অষ্টমবারের মতো জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস পালিত হয়েছে। সাধারণত দরিদ্র, অসহায়, ভূমিহীন জনগোষ্ঠী যেন তার আর্থসামাজিক দুর্বলতার কারণে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং প্রভাবশালী মহল যাতে গরিবের ওপর অন্যায়, জুলুম, নির্যাতন চাপিয়ে না দিতে পারে সেসব বিষয় নিশ্চিতকল্পে আইনগত সহায়তা বিধিমালা প্রণীত হয়েছে। দেশের সুবিধাবঞ্চিত অসচ্ছল দরিদ্র জনগণকে আইনগত সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে একটি আইনগত সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা কমিটির চেয়ারম্যান হবে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা ও দায়রা জজ এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হবে সংশ্লিষ্ট পরিষদের চেয়ারম্যান। দরিদ্র জনগণের মধ্যে বাদী-বিবাদী উভয় এ কার্যক্রমের আওতায় বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা পেয়ে থাকেন। জাতীয় আইনগত প্রদান নীতিমালা, ২০১৪ অনুযায়ী যারা আইনগত সহায়তা পায়, তারা হলেন যে কোনো অসচ্ছল ব্যক্তি যার বার্ষিক গড় আয় এক লাখ টাকার ঊর্ধ্বে নয়, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা যার বার্ষিক গড় আয় ১ লাখ ৫০ হাজার) টাকার ঊর্ধ্বে নয়। এ ছাড়া বয়স্ক, অসচ্ছল বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা, দুস্থ মহিলা, সহায়-সম্বলহীন প্রতিবন্ধী বা আদালত কর্তৃক আর্থিকভাবে অসচ্ছল বলে বিবেচিত ব্যক্তি এরূপ সুবিধা ভোগ করবেন। দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, আপিলসহ যেকোনো মামলা দায়েরের আগে কিংবা চলমান মামলায় বাদী-বিবাদী, ফরিয়াদি বা আসামি যে কারো আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে; ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯০ জনকে বিভিন্নভাবে লিগ্যাল এইড তথা আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আইনগত সহায়তা পাওয়া কোনো দান বা করুণা নয়। এটা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার এবং এটি প্রদান করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

যে ব্যক্তি আইনগত সহায়তার মাধ্যমে প্রতিকার পেতে চান তিনি তাৎক্ষণিকভাবেই জেলা জজ কোর্টে অবস্থিত লিগ্যাল এইড অফিসে, কারাগারের কর্মকর্তার কাছে, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয়ে, জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে বা উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয় থেকে বিনামূল্যে ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। যদি জেলা কমিটি কোনো ব্যক্তির আবেদন খারিজ করে দেয় এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি এটিকে অযৌক্তিক বলে মনে করে তবে সে ৬০ দিনের মধ্যে জাতীয় আইনি সহায়তা বোর্ডের কাছে পুনরায় আবেদন করতে পারবেন। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে লিগ্যালএইড অফিসার ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে না। এমনকি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের পরামর্শ ব্যতিরেকে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ব্যক্তিকে অর্থপ্রদান করা যাবে না। অনেকে মনে করেন যে, মামলা করার প্রয়োজন হলেই মূলত জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা থেকে সহযোগিতা পাওয়া যাবে। এই ধারণা সত্য নয় বরং মামলা করার প্রয়োজন ছাড়াও যে কোনো আইনগত পরামর্শের জন্য বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা পাওয়া যায়। সুতরাং কোন ব্যক্তি যখন কোন প্রকারের আইনগত সমস্যার সম্মুখীন হন তখন জাতীয় আইনগত সংস্থা থেকে আইনি পরামর্শ নিতে পারেন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণকর বিচার ব্যবস্থার অন্যতম শক্তি হলো লিগ্যাল এইড তথা আইনগত সহায়তা প্রদান। আইনের দৃষ্টিতে সমতার যে বাণী আমরা বারবার প্রতিধ্বনি করি, আইনগত সহায়তা ছাড়া তা কখনোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে আইনগত সহায়তার প্রতি মানুষকে উৎসাহী করতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিকল্প নেই। সরকার ও বিচার বিভাগকে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইনজীবীরা আইনগত সহায়তা সম্পর্কে মক্কেল বা সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করেন। এটি তাদের থেকে আমাদের মোটেও কাম্য নয়। বিচার বিভাগের একার পক্ষে কখনো আইনগত সহায়তা বিস্তার সম্ভব হবে না যদিনা আইনজীবীরা বিচার বিভাগের পাশাপাশি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বার ও বেঞ্চ মুদ্রার এপিট ওপিঠ। সুতরাং বার ও বেঞ্চকে সম্মিলিত চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রতি বছর আইনগত সহায়তা দিবসটিকে ঘিরে সারা দেশে নানাবিধ আইনি সচেতনতামূলক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সভা-সমাবেশের আয়োজন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর মহামারি করোনার থাবায় বিশ্ব বিপর্যস্ত হওয়ায় সেটার পথ অবরুদ্ধ হয়েছে। আইনি জটিলতায় অসহায় দুস্থদের মাঝে স্বস্তির হাসি ফোটানোর জন্য আইনগত সহায়তার বিকল্প নেই। আজ সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপস করার দিন শেষ। এখন মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়ানোর সময়।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

 

 

"

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close