ব্রেকিং নিউজ

মুক্তমত

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিছুতেই পিছ ছাড়ছে না কৃষকের। একটার পর একটা দুর্যোগ লেগেই আছে। করোনার ক্ষতি কাটাতে না কাটাতেই আম্পানের আঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আম্পানের পর আসে বন্যা। এবারে তিন দফা বন্যায় আউশ ধান, রোপা আমনের বীজতলা খরিফ সবজির অপূরণীয় ক্ষতি হয় কৃষকের। বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমির ফসল। এরমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮১৪ হেক্টর। সব মিলিয়ে ৩৭ জেলায় তিন দফা বন্যায় ফসলের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৫১ জন।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষক আবার অশেষ আশা নিয়ে আমন ধানের চাষ করেন, রোপণ করেন শীতের আগাম সবজি। ধানগাছ বেড়ে উঠে পলিমাটির পরশে। শিষ বের হতে শুরুর সময়ে আবার গত ২৩ অক্টোম্বর থেকে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে আমন ধান, যা আর ১৫ দিন পড়েই কাটার কথা ছিল। কথা ছিল ওই ধান কেটে নবান্ন উৎসব আয়োজনের। ত্রিশাল উপজেলার নামাপাড়া গ্রামে কৃষক মো. তাইজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও ঝড়োহাওয়ায় তার ব্রিধান ৪৯ জাতের ০.২৫ একর জমির ধান একেবারে নুয়ে পড়েছে। গত বছর এই ০.২৫ একর জমি থেকে তিনি ধান পেয়েছিলেন ১৪ মণ। এবারও ১৪ থেকে ১৫ মণ ধান পাওয়ার প্রত্যাশ ছিল তার। কিন্তু অসময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ওই জমি থেকে ৩ মণের বেশি ধানও পাবেন না তিনি। একই গ্রামের ফজলুল হক নামের আর একজন কৃষক এবার আমন মৌসুমে ০.৮৭ একর জমিতে কিরণমালা জাতের ধান রোপণ করেন। তার প্রত্যাশা ছিল ওই জমি থেকে তিনি কমপক্ষে ৪০ থেকে ৪২ মণ ধান পাবেন। কিন্তু হঠাৎ কার্তিকের এই অতিবৃষ্টি ও ঝড়োহাওয়ায় তার সব প্রত্যাশা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি ওই জমি থেকে ৪ থেকে ৫ মণ ধান পাবেন কি না, তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

দুই দিনের নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক ফুটের বেশি জোয়ারের পানি ওঠায় ভেসে গেছে বিপুলসংখ্যক মাছের ঘের। অল্প কিছুদিন আগে বন্যায় ৩৮২ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয় সারা দেশে। দেশের নানা স্থানে অসময়ে অবিরাম বৃষ্টিপাতে আলু, আগাম আমন, পেঁয়াজ ও শীতকালীন আগাম সবজির বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। আমন ধান যখন পাক ধরেছে, সেসময়ে ভারী বৃষ্টিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে বলা হয়েছে, বন্যার পর অসময়ের বৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃষ্টি ও বাতাসে অনেক এলাকায় নুয়ে পড়েছে আমন ধান। সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে এ সময়। ৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লাগানো হয়েছে আলু। বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় আলু ও সবজি খেতে পানি জমায় পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে পানি নিষ্কাশনের পরামর্শ দেওয়া হলেও তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। কার্তিকের এই ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যা-পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসন কাজ অনেকটা ব্যাহত হবে। সবজি ও পেঁয়াজের বাজারে যে অগ্নিমূল্য চলছে, তা আগামী এক মাসেও খুব একটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়েছে ময়মনসিংহ, জামালপুর, পাবনা, বরিশাল ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আমন ধানসহ শীতকালীন শাকসবজি। বরিশালে তিন দিনের ভারী বৃষ্টির ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে কৃষকের কষ্টে রোপণ করা আগাম শীতকালীন সবজি খেতে। ২১ অক্টোবর বিকাল ৩টা থেকে ২৩ অক্টোবর বিকাল ৩টা পর্যন্ত বরিশালে ২৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অসময়ে অতিবৃষ্টিপাতে আগাম শীতকালীন সবজির সর্বনাশ হয়েছে। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বেশির ভাগ সবজি খেত ছিল পানির নিচে। পুরোপুরি পানি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগাম শীতকালীন সবজির মধ্যে রয়েছে মুলা, পালংশাক, টমেটো, শিম, শসা, খিরা ও গাজর ইত্যাদি। তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, মরিচ ও বেগুনের চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। কৃষক বেশি দাম পাওয়ার আশায় বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে করেছিলেন শীতকালীন আগাম সবজির চাষ। কে জানত কার্তিকের সর্বনাশা বৃষ্টিতে কৃষকের প্রত্যাশা এভাবে মাটিতে মিশে যাবে? এবার বরিশাল জেলার ১০টি উপজেলার ৫০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির আগাম আবাদ করা হয়। এরমধ্যে ৩৭৫ হেক্টর জমি ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বরিশাল সদর, বাবুগঞ্জ ও মূলাদি উপজেলা। মূলাদি উপজেলা কৃষি সমিতির ৮ জন সদস্য লালশাক চাষ করেছিলেন বৃষ্টির আগে, সেই লালশাক ভারী বৃষ্টিতে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। পালংশাক ও টমেটোও শেষ হয়ে গেছে। আমন ধান বের হওয়া পর্যায়ে বৃষ্টিতে নুয়ে পড়েছে। মূলাদি উপজেলার ৪০ হেক্টর জমিতে লালশাক, টমেটো, বেগুন ও ধনিয়া রোপণ করা হয়েছিল, যার পুরোটাই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাবুগঞ্জ উপজেলার ৭০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির আগাম চাষ করা হয়েছিল । তার মধ্যে ৫২ হেক্টর জমি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব খবর দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।

আজ থেকে দুই-আড়াই মাস আগে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় কৃষি ও মৎস্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ধানসহ ১২ ধরনের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাঠে ছিল বোনা আমন, আউশ ধান ও রোপা আমন ধান। ছিল আখ ও গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি। কয়েক দফা বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর আমন ধান ডুবে যায়। একই সঙ্গে ডুবে যায় আমনের বীজতলা। সরকারি প্রণোদনা ও নিজেদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কৃষক। বেশি দামে কেনা সেই ধানের চারা থেকে বেড়ে ওঠা আমনের পাকা ধান ফের ক্ষতির সম্মুখীন হলো মাত্র দুই থেকে আড়াই মাসের ব্যবধানে। তাই কৃষকের মুখে এখন অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।

চলতি আমন মৌসুমে ৫৯ লাখ হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু কয়েক দফা বন্যায় ৩৭ জেলার ৭০ হাজার ৮২০ হেক্টর জমির আমন ও ৭ হাজার ৯১৮ হেক্টর আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে কৃষির সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব করা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির কারণে চলতি মৌসুমে উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। খাদ্য নেট ওয়ার্কের সম্পাদকের কথা দুর্যোগ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না কৃষক। একের পর এক দুর্যোগ লেগেই আছে। আমনের ক্ষতি হওয়ায় করোনা ও বন্যা পরবর্তী লোকসান পুষিয়ে নিতে পারছেন না কৃষক। এখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে বিশেষ সুরক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। আমাদের কথা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যত দিন যাচ্ছে খরা, বন্যা, অসময়ে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও তীব্রতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ। বন্যায় তীব্রতর হচ্ছে নদী ভাঙন। কৃষক ঘরবাড়ি ও ফসলের জমি হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন শহরের বস্তিতে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। সামান্য কৃষি প্রণাদনা এবং বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক দিয়ে এই কঠিন সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এজন্য অবিলম্বে শস্যবিমা চালু করতে হবে এবং বিমার প্রিমিয়াম সরকারকে বহন করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করতে হবে বিমা কোম্পানিগুলোকে। অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের ৪ শতাংশ সুদে পুনরায় কৃষিঋণ প্রদান করতে হবে। যাতে তারা আবার শীতকালীন সবজি, দানাশস্য বিশেষ করে গম, ভুট্টা, ডাল ও তেলবীজ চাষ করে অতিবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। অন্যদিকে নদী ভাঙনের ফলে যেসব কৃষক বাড়ি হারিয়েছেন, তাদের সরকারি খাসজমিতে বাড়ি নির্মাণ করে দিতে হবে সরকারি খরচে। আর যেসব কৃষক নদী ভাঙনের ফলে কৃষিজমি হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিতে খাসজমি বিতরণ করতে হবে। আপৎকালীন সময়ে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে চাল বিতরণ এবং হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশু পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া কৃষকদের অঞ্চলভিত্তিক ঘাতসহিষ্ণু ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যেমন জামালপুর ও সিরাজগঞ্জের মতো নিচু এলাকায় আমন মৌসুমে ব্রিধান ৫১, ব্রিধান ৫২, জোয়ার-ভাটা অঞ্চলে ব্রিধান ৪৪, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় ব্রিধান ৫৩ ও ব্রিধান ৫৪ এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে খরাসহিষ্ণু ব্রিধান ৫৫ ও ব্রিধান ৫৬ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে তাদের আর্থিক প্রণোদনাও প্রদান করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.

[email protected]

 

 

"