ব্রেকিং নিউজ

আকাঙ্ক্ষা

ভর্তিতে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন চাই

নিগার সুলতানা

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

জীবনে বড় হওয়ার ইচ্ছা প্রত্যেকটি মানুষের থাকে। এই বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজন নিজের মেধা ও মননের যথার্থ পরিচর্যা এবং একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রয়াস। জীবনের বাঁকে বাঁকে ছোট ছোট সাফল্য মানুষের সেই অসীম গন্তব্যের পথে প্রেরণা জোগায়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ করার পর প্রতিটি মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে। দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র হাওয়া। বিশেষ করে বুয়েট, মেডিকেল অথবা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। একদিকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর হাতছানি দেয়; অন্যদিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র হওয়ার অসম প্রতিযোগিতা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রত্যেকের মেধা, মনন, ধ্যান, জ্ঞান একটাই, যেকোনো উপায়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হওয়া।

উচ্চমাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষার ফলাফলের পরই শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধের এক অসম প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও চলতি বছর করোনাভাইরাস মহামারির কারণে নির্দিষ্ট সময়মতো অনুষ্ঠিত হয়নি এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষা। এইচএসসি পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এর আগে কয়েক দফা আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। করোনা মহামারির এ সময়ে এইচএসসির পরীক্ষার মতো বড় আয়োজন করা হলে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা থেকেই এত দিন পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গত ৭ অক্টোবর ২০২০, এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে অনলাইনে ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হবে না, মূল্যায়ন হবে ভিন্ন পদ্ধতিতে। ফলাফল জানানো হবে ডিসেম্বরের মধ্যে।’ তিনি আরো বলেন, মূল্যায়নের জন্য জেএসসি এবং এসএসসির ফলাফল বিবেচনায় নেওয়া হবে।’ তবে এইচএসসি ফলাফলের একটা সুরাহা হলেও অধরা থেকে যায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মতো জটিল সমস্যা।

তবে গত ১৭ অক্টোবর বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে অনলাইনের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। কিন্তু এ রকম সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, সেটা নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। আমরা প্রত্যেকেই খুব করে চাই আমাদের দেশের প্রতিটি সেক্টর ও সেবা খাতে ডিজিটালাইজেশন হোক। উন্নত দেশের মতো দেশের মানুষ সব সুবিধা ঘরে বসে হাতের নাগালে পাক। কিন্তু একুশ শতকে এসে যখন শিক্ষা, সভ্যতা ও প্রযুক্তি সুবিধা ঘরে ঘরে পাওয়ার কথা, সেখানে অধিকাংশই বঞ্চিত হচ্ছেন এসব সুবিধা থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী (আল-আমিন গাজী) তার এক পোস্টে বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হয়েও এখনো আমার বিভাগের অনলাইন ক্লাসগুলো করতে পারছি না নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক প্রবাহের অভাবে, ভালো একটি ডিভাইসের অভাব ও ডেটা কেনার অর্থের অভাব আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেসময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মতো একটি মহাযজ্ঞ অনলাইনে করার যৌক্তিকতা কতটুকু!’

প্রতি বছর দেখা যায়, দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ আসন দখল করে নেন প্রান্তিক অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা। অথচ গ্রামের কৃষকের অধিকাংশ মেধাবী গরিব সন্তানরা এইচএসসির আগে স্মার্টফোন দূরের কথা একটি সাধারণ ফোনও ব্যবহার করার সামর্থ্য রাখে না। সন্ধ্যার পরে পড়ার মতো আলোও হয়তো অনেকের ঘরে থাকে না। ঠিক এ সময়ে যখন একটি এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো না; তখন গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভরসা ছিল একটি গ্রহণযোগ্য ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। যার মাধ্যমে তারা মেধার বিকাশ ঘটাতে পারেন। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা করোনার ভয়ে জাতির বহুল কাক্সিক্ষত একটি স্বপ্ন সম্পূর্ণ নতুন, অজ্ঞাত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে করার প্রস্তাব করেছেন। সিস্টেমের এ সামান্য হেরফেরে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে অনেক মেধাবী মুখের। তাছাড়া প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন নিয়েও থেকে যায় ধোঁয়াশা।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা আমাদের প্রযুক্তির দিকে ধাবিত করছে, এটা সত্য। কিন্তু সেজন্য পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া সব ভার্সিটি মিলে সমন্বিতভাবে এমন একটি কাজে নামা কতটুকু বাস্তবসম্মত? অথচ এত দিন পর্যন্ত ভার্সিটিগুলো সবাই মিলে একটা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতেই রাজি হয়নি! সফটওয়্যারে পরীক্ষা নিতে গেলে একজন শিক্ষার্থীকে একটি রুমে একাকী বসে, ল্যাপটপ বা অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ডেটা সংযোগ রেখে নিজে নিজে অ্যাপে লগইন করে তারপর এক-দেড় ঘণ্টায় পরীক্ষা দিতে হবে। প্রশ্নের উত্তরগুলো হয়তো টিকমার্ক করতে হবে। একটা নির্ধারিত সময়ে লগইন করে নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে এবং এ সময়ের পরে উত্তরগুলো জমা হয়ে যাবে। এ রকম একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে ভর্তিযুদ্ধে একজন প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। কারণ যে শিক্ষার্থী জানেন না স্মার্টফোনের ব্যবহার, যেখানে নেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা; সেখানে বসে অনলাইনে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ছাড়া আর কিছুই না।

তাই উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষের এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগে আরো ভেবে দেখা উচিত। এ ছাড়া পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলে গুচ্ছাকারে সবগুলো ভার্সিটি মিলে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে, নানাবিধি নিষেধ আরোপ করে স্বল্প সময়ে একটি ভর্তি পরীক্ষা নিলেই বরং এইচএসসি না হওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে সবার প্রতি সুবিচার করা হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"