খেলাপি ঋণ

ব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ

মো. জিল্লুর রহমান

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর খুব ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এবং তিনটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। প্রথমত, বড় ধরনের সুপ্ত খেলাপি ঋণ। দ্বিতীয়ত, একক অঙ্কের সুদহারের বাস্তবায়ন এবং তৃতীয়ত, করোনাকালীন অর্থনৈতিক মন্দাভাব। তাছাড়া সরকারের চলতি বাজেট ঘাটতির কারণে সৃষ্ট ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার অবশ্য ইতিবাচকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে কতটুকু সাফল্য আসবে; সেটা কেবল সময়ই বলে দেবে। করোনা-পূর্ব ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিকে ভিত্তিমূল ধরেই করোনাকাল ও করোনা-পরবর্তী ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা, বিনিয়োগ, ঋণ প্রদান, ঋণ আদায় সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রম নিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব কার্যাবলি সহজ নয়। কাক্সিক্ষত সাফল্যের জন্য এ খাতের সব অংশীজনের আন্তরিকতা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতার প্রশ্ন যেমন জড়িত; তেমনি সবার স্বচ্ছ, নৈতিক, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও অত্যাবশ্যকীয় এবং এর জন্য পুরো কর্মপদ্ধতির সুশৃঙ্খল জবাবদিহিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১২ শতাংশ। এর বাইরে রয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা ঋণ। এসব মন্দঋণ আদায়ও অনিশ্চিত।

তাছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা; এর সঙ্গে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ (৫৪,৪৬৩ কোটি টাকা) যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা; যা খেলাপি ঋণের ২৫ শতাংশের নিচে নয়। এর সমর্থনে ‘সানেম’সহ স্থানীয় কিছু গবেষণায় সরাসরি খেলাপি ঋণের প্রদত্ত অঙ্কের সঙ্গে অবলোপনকৃত ঋণ, প্রায় অফেরত প্রত্যাশী পুনঃপুন তফসিলকৃত ঋণ, কথিত পুনর্গঠনকৃত বৃহৎ ঋণ, আদালতের আদেশক্রমে আটকে থাকা ঋণ যুক্ত করলে বিপদগ্রস্ত বা মন্দ ঋণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, চলতি জুন ২০২০ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতির পরিমাণ ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.১৬ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। তবে এপ্রিল ২০২০ প্রজ্ঞাপন দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ঋণের টাকা ফেরত না দিলেও জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গ্রাহককে নতুন করে খেলাপি হিসেবে দেখানো যাবে না। তাদের ঋণের মান ডিসেম্বরে যা ছিল তাই দেখাতে হবে। এই ছাড়ের সময়কাল কয়েক ধাপে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রাহক কোনো অর্থ না দিলেও খাতা-কলমে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়বে না।

উপরোক্ত প্রজ্ঞাপনের কারণে গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবসা সচল রাখার জন্য নতুন ঋণ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হবে না। আবার মন্দার কারণে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়বে না। কোনো ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে সেই ঋণের বিপরীতে সুদ আয় দেখানো যায় না, উল্টো প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে ব্যাংকগুলোর আয় কমে মুনাফা কমে যায়। এর ফলে শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত ব্যাংকগুলোর দেশের বাজারে যেমন ঝুঁকিতে পড়ে; তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের লেনদেনের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। আসলে খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকগুলো। মূলত ব্যাংক দুর্নীতি, অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ শিথিলতা ইত্যাদি বহু কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে নানা রকম নেতিবাচক চিত্র উঠে আসে। খেলাপি ঋণের স্ফীত চিত্র দেশের ব্যাংক খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত।

খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া। ব্যাংক খাতে মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে খেলাপি ঋণ চিত্র স্ফীত হচ্ছে। এ করোনা পরিস্থিতি এ অবস্থাকে আরো নাজুক করে তুলেছে। কাউকে নতুন করে খেলাপি বলা যাচ্ছে না। ঋণ আদায়ের জন্য কোনো তাগাদা বা আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে কোনোই সংশয় নেই যে, মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের দাপট ও আধিপত্যের কারণে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপি ঋণের প্রসার ঘটায়। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার পর তা খেলাপিতে পরিণত করার প্রবণতা শুরুতেই যদি ব্যাংকগুলো রোধ করতে পারত কিংবা এখনো পারে, তাহলে ঝুঁকি এড়ানোর পথ থাকত। এজন্য প্রয়োজনীয় জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়নি বিধায় সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ আরো কিছু ব্যাংকের বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। আমাদের সমাজে বস্তুত ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার প্রবণতা এক ধরনের অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণের বিস্তার ব্যাংকগুলোকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করছে।

ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি ও নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে কালক্ষেপণ না করে কঠোর আইন প্রণয়নের বিষয়টি ভাবতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে এবং তা ভবিষ্যতে আরো গভীর সংকট সৃষ্টি করবে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি সুশাসনের প্রভাব ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার দিকে আরো গভীর মনোনিবেশ অত্যন্ত জরুরি। এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, বিভিন্ন শিল্প-কারখানাসহ দেশে বড় ধরনের উন্নয়ন অবকাঠামো উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন ছাড়া এত বড় অর্থায়ন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন করা নিশ্চয়ই কঠিন হয়ে দাঁড়াত। ঋণখেলাপি যাতে না হয়, সে জন্য বিদ্যমান নীতিমালার ব্যাপারেও নতুন করে ভাবতে হবে। গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। সুতরাং ব্যাংকারদের সৎ থাকা ছাড়া উপায় নেই।

খেলাপি ঋণের মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যুগোপযোগী আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিশেষ বেঞ্চ গঠনের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। শুধু অর্থঋণ আদালতে এসব মামলার নিষ্পত্তি সময়মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়ে আলাপ-আলোচনা কম হয়নি; কিন্তু কাজের কাজ কতটা কী হয়েছে, এটি প্রশ্নের বিষয়। সরকারের উচিত জনগণের গচ্ছিত আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংক খাতকে আমাদের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা। মূলত করোনা সব ধরনের কার্যক্রমকে থমকে দিয়েছে। এ কারণে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঋণগ্রহীতার ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছেন না। বড় বড় করপোরেট গ্রুপ, শিল্পোদ্যোক্তা, এসএমই গ্রাহক এমনকি ক্রেডিট কার্ডসহ ভোক্তাঋণের গ্রাহকরা অর্থ ফেরত দিতে পারছেন না। এতে ব্যাংকগুলোর আয় অনেক কমে গেছে। তাছাড়া মহামারি কোভিড-১৯-এর কারণে অর্থনীতির অধিকাংশ খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় অনেক শিল্প, সেবা ও ব্যবসা খাত তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাই ঋণ/বিনিয়োগ গ্রহীতার ব্যবসায়ের ওপর কোভিড ১৯-এর নেতিবাচক প্রভাব সহনীয় মাত্রায় রাখার লক্ষ্যে ঋণ পরিশোধ ও শ্রেণিকরণের নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর থেকেই ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় অনেক কমে গেছে। এই সময়ে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনমুখী তাদের পণ্য বিক্রি করতে না পারায় আয় কমে যায়। ফলে তারা ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরেদের আয় কমে যাওয়ায় ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণের টাকাও ফেরত আসেনি। অনেকের বাসাবাড়ি খালি থাকায় হাউস লোনের কিস্তিও বকেয়া পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই খেলাপি ঋণ বাড়ার কথা। অনেকের সামর্থ্য থাকার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের শিথিলতার কারণে ইচ্ছা করেই ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করছে না। তাছাড়া ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ের জন্য কোনো কঠিন পদক্ষেপ বা আইনি ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। অন্যদিকে দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ থাকায় পূর্ববর্তী মামলাও কোনো গতি আসছে না। ফলে অনেক খেলাপি গ্রাহক স্বাচ্ছন্দ্যে সময় পার করছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নির্দেশনা ও ছাড়ের কারণে করোনাকালীন খেলাপি ঋণ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো লুকিয়ে আছে; যা করোনা পরবর্তী সময়ে লাভা উদগীরণ করবে। সুতরাং করোনা-পরবর্তী এসব সুপ্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ ও হুমকি হিসেবে কাজ করবে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে এখনই উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি অধিক সতর্ক হতে হবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"