পর্যবেক্ষণ

শেখ মুজিবের হাতেই আওয়ামী লীগের পূর্ণতা

ওমর খালেদ রুমি

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

পঞ্চান্ন বর্ষায় ভেজা মুজিবের ৫৫ বছরের জীবনে ৫৫টি বসন্তও যে ছিল তা কিন্তু মিথ্যে নয়। ২০ বারেরও বেশি কারাবাসের জীবনে ১২ বছরেরও বেশি সময় কেটেছিল কারাগারের অন্তরালে। টুঙ্গিপাড়ার ধুলো কাদা মাখা দীর্ঘকায় মানুষটি জীবনে হেরেছেন অনেকবার, কিন্তু তাই বলে কখনো নত হননি। যে বাংলার জল, হাওয়া, কাদায় তার বেড়ে ওঠা; সেই বাংলাকে তার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে আর কেউ পেরেছে কি না তা জানা নেই। আর এজন্যই হয়তো তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মুজিবকে আমি দেখিনি। দেখার কথাও নয়। আমার শৈশবেই তিনি গত হন। পৃথিবীর কোনো কিছুই বোঝার মতো বয়স তখন আমার হয়নি। কিন্তু বড় হয়ে তাকে যতটা জেনেছি বা জানতে ইচ্ছা করেছে, অতটা আর কারো ক্ষেত্রে হয়নি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় কোনো মানুষ তার দেশকে এতটা ভালোবাসতে পারে। দেশপ্রেমের আরেক নাম শেখ মুজিব।

বাঙালির লাঞ্ছনার অনেক ঘটনা আছে। রাজাকারের দায়ভার বহনের লাঞ্ছনা, লুটতরাজের রাজনীতির লাঞ্ছনা, অবিচার, অনাচার, অনিয়মের লাঞ্ছনা, ঘুষ-দুর্নীতির লাঞ্ছনা, অশিক্ষা আর অপুষ্টির লাঞ্ছনা সবচেয়ে বড় লাঞ্ছনা আমরা জাতির পিতার হন্তারক। পিতার রক্তে রঞ্জিত আমাদের হস্ত, পদ, আপাদমস্তক। ইতিহাস নিয়ে, তার সাল-তারিখ নিয়ে, জটিল আবর্ত নিয়ে অনেক ধুন্ধুমার কিচ্ছা কাহিনি, তুলকালাম ঘটনা, তুমুল লেখালেখি আর বক্তৃতার অভাব নেই। 

মাঝে মাঝে চেষ্টা করি কলমের কারিকুরিতে মস্তিষ্কের জটিল খেলায় অসামান্য কারিশমা দেখানোর। কিন্তু জীবনের সর্বত্র যে কারিকুরি চলে না, তা বেশ বোঝা যায়। যখন আমরা আমাদের আবেগের জায়গাগুলোতে হাত দেই। সন্তানের প্রতি পিতার আদরের তাই যেন ব্যাকরণগত কোনো সংজ্ঞা নেই। সে তার সন্তানকে কখনো মাথায় তোলে, ঘাড়ে বসায়, কখনো কোলে নেয়, আবার কখনো পায়ের ওপর শুইয়ে দোল খাওয়াতে খাওয়াতে ঘুম পাড়ানি গান শোনায়। এসব একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ আর অনুভূতির খেলা। মুজিবের প্রতি আমার ভালোবাসা এ রকমই একটি খেলার নামান্তর। আমি মুজিব নামের পাগল। ভাষা তাই ভালোবাসার কাছে অসহায়, প্রকাশের অপর সংজ্ঞা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে পিতার প্রস্থান হয়। কে কোন উদ্দেশ্যে সেদিন এমন বিয়োগান্তক ঘটনার জন্ম দিয়েছিল, তা নিয়ে বিগত ৪৫ বছরে কম জল্পনা, কল্পনা, গবেষণা হয়নি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যা দাঁড়িয়েছে তার অর্থ ওই একটাই আমরা পিতাকে হারিয়েছি। নিঃস্ব জাতির সামনে আজও অজস্র অন্ধকার হিংস্র থাবা মেলে ছুটে আসতে চায়। আমরা সবই বুঝি। কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। সেদিন সব নিষ্ঠুরতা একাই তিনি তার বুকে ধারণ করেছিলেন। আজ আর এমন কেউই নেই যিনি মুজিব হওয়াতো দূরে থাক অন্তত তার ছায়াটুকু হবে।

মুজিব বারবার আসে না। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চে যার জন্ম, মধুমতি আর বাইগার নদী অধ্যুষিত টুঙ্গিপাড়ার বাতাসে আজও তার শরীরের সুগন্ধ। পত্রপল্লবের মর্মরে আজও তার কণ্ঠের ধ্বনি যেন বারে বারে কেঁদে কেঁদে বেজে ওঠে। বাংলার আকাশে-বাতাসে আজও সে মেঘেদের কানাকানি। সকালের সূর্যের কাঁচা সোনা রোদের ঝিলিক। বিকালের রক্তিমা লাল আভার সর্বত্রই যেন মুজিবের ছোঁয়া। কোনো মানুষ তার দেশ মাটি আর মানুষের সঙ্গে এতটা মিশে যেতে পারে, তা অনুভব না করলে বোঝা সম্ভব নয়। মুজিবকে যাদের চোখে পড়ে না, তারা বাংলাকেও দেখে না। আর যারা বাংলাকে দেখে না, তারা কি বাঙালি? ইতিহাস এখনই আমাদেরকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে আমরা তাহলে কী? মানুষরূপী অন্য কিছু? ভাবতেও অবাক লাগে এত কিছুর পরও আমাদের লজ্জা হয় না। পিতার রক্তে রঞ্জিত হাতে আমরা দুহাত ভরে লুটপাট চালাই। বড় বড় কথা বলি। বিবেক তখন কোথায় থাকে।

নানামত, না মানা পথে আজ আমরা বহুধাবিভক্ত। এত্ত পথ নিশ্চয়ই সঠিক গন্তব্যে যায়নি। সঠিক গন্তব্যের পথ একটাই। তা হলো ঐক্যের পথ, সাম্যের পথ, সম্প্রীতির পথ। মুজিব ছিলেন সেই পথের ধারক ও বাহক। শত্রুরা তাই তাকে ভয় পেত। তারা জানত মুজিব সঠিক পথে আছে। জয় তারই হবে। কলকাতার দাঙ্গার সময় তিনি সেখানে ছিলেন। তারপর পূর্বপাকিস্তানে চলে এলেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম হলো। মুজিবের রাজনৈতিক জীবন নতুন মোড় নিল। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময় জেলে ছিলেন। তবু দেখা গেল সক্রিয়। ভাষার দাবিতে ১৩ দিন অনশন করার পর ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি জেল থেকে মুক্ত হন। 

১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩ আসনই ছিল আওয়ামী লীগের। ১৫ মে তিনি যুক্তফ্রন্ট সভার কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন। কিন্তু ২১ মে সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেফু দেয়। ২৩ মে করাচি থেকে ঢাকায় ফেরার পর বিমানবন্দরে আটক হন। আবারও আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। আর এর সঙ্গেই ১৭ জুন পল্টন ময়দানে ঐতিহাসিক ২১ দফা দাবি পেশ করা হয়। এখানেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি পেশ করা হয়। ২৬ আগস্ট পাকিস্তানের প্রাদেশিক গণপরিষদের অধিবেশনে শেখ মুজিব বলেন, “Sir [President of the Constituent Assembly], you will see that they want to palace the word “East Pakistan” instead of “East Bangal.” We had demanded so may times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word “Bengal” has a history, has a tradition of its own. You can change it only after the people have been concerned. So far as the question of one unit is concerned it can come in constitution. Why do you want it to be taken up just now? What about the state language, Bengali? We will be prepared to consider one-unit with all these things. So I appeal to my friends on that side to allow the people to give their verdict in any way, in the form referendum of in the form of plebiscite.”

১৯৬১ সালে গঠন করেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। ১৯৬৪ সালে গঠন করেন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। মাঝখানে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা পেশ করেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হন। ১৯৬৯ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ১১ দফা দাবি পেশ করে। এতে আগের সব মামলা তুলে নিতে বলা হয়। ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক সভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি ঘোষণা করেন “একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। ‘বাংলা’ শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ বদলে বাংলা বলে ডাকা হবে।” 

মূলত এখান থেকেই বাংলাদেশের বীজ রোপিত হয়। তারপর আসে ১৯৭০-এর নির্বাচন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আওয়ামী লীগ। দেশকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতাযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। রাজনীতির অমর কবি শেখ মুজিবের লেখা কাব্য কোনো একটা সাধারণ কাগজে ছাপানো নয়। তার লেখা মহাকাব্যের নাম বাংলাদেশ। তিনি যে মহাকাব্য রচনা করে গেছেন তা আর সব মহাকাব্যের মতো থেমে নেই। প্রতিদিনই নতুন নতুন ফুলে ফলে, ডালপালায় বিকশিত হচ্ছে। মুজিব তাই প্রতিদিনই স্মরণীয়। আমাদের অন্তরও তাই বারবার বলে ওঠে পিতা তোমায় সালাম।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

 

 

"