বিশ্লেষণ

আত্মহত্যার দায় কার

ফারহান ইশরাক

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

আত্মহত্যা আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত ও অনাকাক্সিক্ষত একটি শব্দ। অনাকাক্সিক্ষত হলেও আমাদের এই শব্দের মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দিন দিন দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। চারপাশের মানুষের আত্মহত্যার মিছিলে সামিল হওয়ার প্রবণতা যেন ইদানীং সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেকে শেষ করার প্রয়াস পরিণত হয়েছে সামাজিক ব্যাধিতে।

কিছুদিন ধরেই বেশ কিছু আত্মহত্যার সংবাদ আমাদের আলোড়িত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, তুখোড় বিতার্কিক কিংবা মেধাবী শিক্ষার্থী এমন অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের সবাই দেশের কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কিংবা সাবেক শিক্ষার্থী। এর বাইরেও আরো অনেকেই নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছেন, মৃত্যুবরণ না করলেও আরো অনেকেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, ফিরে এসেছেন ভয়াল স্মৃতি ধারণ করে। হঠাৎ করে এই সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, তাই সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তবে গত কয়েক বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে আত্মহত্যার ঘটনা একেবারেই কম নয়। বাংলাদেশ পুলিশ, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা ৯ হাজারের কিছু কম। ২০১৭ সালে সেই সংখ্যা ১০ হাজার পেরিয়ে যায়। ২০১৮ সালে আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০১৯ সালেও এ হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সাল শেষে এই সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। কাক্সিক্ষত ফলাফল না পেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন অনেক শিক্ষার্থী। এইচএসসি, এসএসসি, এমনকি জেএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে দেশে। বছরের অন্যান্য সময়েও এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত কারণে সংঘটিত হয়েছে। পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার খবরগুলো হতে আমরা দেখি, আত্মহননকারী ব্যক্তিদের বেশির ভাগই স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী। এর বাইরেও যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে না, তা নয়। তবে মোটাদাগে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে তরুণ সমাজের মধ্যেই এ ধরনের প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। সব আত্মহত্যার সংবাদ গণমাধ্যমে আসে না। সচরাচর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের প্রতিষ্ঠিত কেউ এই পথ নেছে নিলে, তখনই কেবল আলোচনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর বাইরেও প্রতিনিয়ত অনেকেই আত্মহত্যা করছেন, যার খবর হয়তো আমরা কখনো জানতেও পারি না। আবার অনেকে আত্মহত্যা করে শেষ মুহূর্তে প্রাণে বেঁচে যান; তাদের সংখ্যাও সবার অগোচরেই থেকে যায়। তাই কতজন মানুষ আত্মহত্যার পথ নেছে নিয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা বের করাটা বেশ কঠিন। তবে ক্রমশ বেড়ে চলা আত্মহত্যার ঘটনা থেকে ধারণা করা যায়, সমাজে আত্মহননকারীর প্রকৃতসংখ্যা আমাদের অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি।

আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ অত্যন্ত জটিল একটি কর্ম। নানাবিধ কারণে এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়। আবার আত্মহত্যার পদ্ধতিরও ভিন্নতা দেখতে পাওয়া যায়। তাই সাধারণভাবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা দুরূহ। আবার সেই কারণ নির্ধারণ করে তার প্রতিকার গ্রহণও সহজসাধ্য নয়। তবে আত্মহত্যাকে অনেকেই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা বলে মনে করেন। মানসিক পীড়ন থেকেই বেশির ভাগ সময় মানুষ আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক চাপ। অর্থনৈতিক সমস্যা, ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের টানাপড়েন, ব্যক্তিজীবনের অশান্তিও অনেক সময় আত্মহত্যার কারণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানী এবং বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, মানসিক চাপই মানুষকে আত্মঘাতী করে তোলে। কোনো কারণে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পারলে এ পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। কেউ কেউ মনে করেন, বিষাদগ্রস্ত ব্যক্তি যদি প্রতিনিয়ত ঘটে চলা আত্মহত্যার সংবাদ দেখে, এটিও তাকে এ পথ বেছে নিতে প্রলুব্ধ করে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে আত্মহত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানার সুযোগ পাচ্ছে মানুষ। আবার কোন উপকরণ দিয়ে নিজেকে শেষ করা যায়, এ সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য রয়েছে অনলাইনে। এ কথা সবাই জানেন যে, বর্তমান তরুণ সমাজ দিনের সিংহভাগ সময় অনলাইনে ব্যয় করে। এর ফলে কেউ যদি অবসাদ বা বিষণœতায় ভোগেন এবং তার সামনে আত্মহত্যার খবরগুলো চলে আসে; তখন সে ব্যক্তি নিজেও এ ধরনের কাজে প্ররোচিত হন, ইন্টারনেটের কল্যাণে তথ্যপ্রাপ্তিও ঘটে খুব সহজেই। বিশেষ করে কয়েক মাস ধরে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। অনলাইন ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা অবসর কাটানোর জন্য প্রত্যেকেই প্রায় সারা দিন কোনো না কোনোভাবে অনলাইনে প্রচুর সময় ব্যয় করছেন। এ থেকে সৃষ্ট হতাশা, বিষণœতা, অবসাদও তাদের এ ধরনের প্রবণতার জন্য দায়ী।

আত্মহত্যা বর্তমানে একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মহত্যার সংখ্যা খুব দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ পরামর্শক, বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বজনীন সচেতনতা কার্যক্রম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সভা, সেমিনার, ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য যদি কাউন্সিলর ও মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে কেউ মানসিক পীড়নে থাকলে তার জন্য পরামর্শ গ্রহণ সহজ হবে। এ ছাড়াও অনলাইন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেও তরুণ সমাজের বিষণœতা দূর করার জন্য কাজ করা যায়। আশপাশের কারো মধ্যে যদি মানসিক অস্থিরতা কিংবা কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়, তবে তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার এবং বন্ধু মহলকেই সবার আগে এগিয়ে আসা উচিত। একঘেয়েমি ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতে পরিবারকে সময় দেওয়া, ঘুরতে যাওয়া কিংবা পছন্দের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে। কোনো কারণে চাপ অনুভব করলে সেটি নিকটজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রেও পেশাজীবীদের জন্য মাসিক বা ত্রৈমাসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা দরকার। এভাবে সর্বোপরি সবার জন্য একটি সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। কাউকে আত্মঘাতী হতে দেখলে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, প্রয়োজনবোধে মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হতে হবে। জীবনে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য এবং জীবন যে কতটা সুন্দর, সেটি তুলে ধরতে হবে সবার মাঝে। আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য পুরো সমাজকে হতে হবে একতাবদ্ধ। আত্মহত্যার দায় শুধু আত্মহননকারী ব্যক্তিরই নয়, বরং এ দায় সমাজেরও। সামাজিকভাবে কাউকে হেয় করলে বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কারণেও অনেক সময় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। এ সমস্যাটি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে তাই সবার সম্মিলিত প্রয়াস অত্যন্ত জরুরি।

জীবন সুন্দর। বেঁচে থাকার মতো আনন্দ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ধর্মীয়ভাবেও আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুন্দর এই জীবনকে উপভোগ করতে হলে জীবনে বেঁচে থাকার গুরুত্বকে অনুভব করতে হবে। নশ্বর এই পৃথিবীতে কেউ-ই অমর নয়, স্বাভাবিক নিয়মেই এক দিন সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। কিন্তু এই মৃত্যু যেন কখনো আত্মহত্যার মাধ্যমে না হয়। আত্মহত্যার অন্ধকার পথ থেকে মানুষ সরে আসবে; সুস্থ, সুন্দর জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবে সবাই এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষার্থী

ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"