মুক্তমত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার

দিলরুবা আক্তার

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এ যুগের উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মানুষকে সামাজিক জীব হিসেবে সমাজে বসবাস করার পাশাপাশি প্রতিনিয়তই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। আর সেই কাজটি সহজতর করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। বছর দশেক আগেও যেখানে মানুষ ফোনালাপ বা চিঠিপত্রের আদান-প্রদান করে দূর-দূরান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করত, আজ সে জায়গার অনেকাংশ দখল করে নিয়েছে নানাবিধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বহুল ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, গুগল, টুইটার, ভাইবার, ইনস্টাগ্রাম ও লিংকডইন অন্যতম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আনাগোনা।

প্রতিটি বিষয়েরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিক থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এর বাইরে নয়। ইতিবাচক দিকগুলো আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতিগত সব দিকের উৎকর্ষ সাধন করে থাকে। আমরা আমাদের কাছের মানুষ, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও দূর-দূরান্তের মানুষের সঙ্গে খুব সহজেই যোগাযোগ করতে পারছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারছি। আজকাল এ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। খুলে গেছে আউটসোর্সিং ও ই-কমার্সের দুয়ার। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘিরেই ঘরে উঠেছে নানা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন সংগঠন। মোটকথা এমন কোনো দিক নেই যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নেই। কিন্তু যেকোনো বিষয়ের ইতিবাচক দিকগুলোকে সাদরে গ্রহণ করে সেগুলোকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি; সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এবার আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবগুলো দেখি। এতে প্রথমেই বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কোনো কিছুই আমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো আমাদের যতটা না সামাজিক করে তুলছে, তার চেয়ে বেশি অসামাজিক করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। আমরা একটা পরিবারের কথা বলতে পারি। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটা অন্যরকম বন্ধন থাকে। সেখানে এই ফেসবুকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে আমরা সেই বন্ধনটা মধুময় করে রাখতে পারছি না। আমাদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা চলে আসছে। আমরা পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে গেলেও সেখানে আমরা যার যার স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমরা এতটাই যান্ত্রিক হই যে, মন খুলে কথা বলার সুযোগটাও পাই না। এতে আমাদের একে অপরের প্রতি আত্মিক ভালোবাসাটা কমে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক নির্ভরশীলতা। শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পড়ালেখায় মনোযোগী হতে পারছেন না। তরুণ প্রজন্ম ভুলে যাচ্ছে তাদের নৈতিকতা, ঢলে পড়ছে পর্নোসাইটে। রাত জেগে অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত হচ্ছে, বিষণ্নতায় ভুগছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে আমাদের আপনজন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। মানব সমাজে নীতিনৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবন করেছে সহজবোধ্য, দূরে বসবাসরত কাছের মানুষকে এনে দিয়েছে অতি নিকটে। কিন্তু এর ব্যবহার করতে হবে ইতিবাচক ফলাফলের উদ্দেশ্যে, আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে বরং ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতিগত উন্নতির স্বার্থে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, নীতিনৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মাঝে। আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সুনিশ্চিত করলে আমাদের দেশ এক সুন্দর আগামীর পথে এগিয়ে যাবে। তাই আমাদের তরুণ সমাজের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা, অতিরিক্ত সময় এ ক্ষেত্রে ব্যয় না করা, ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা এবং উদ্ভাবনীমূলক ও সৃজনশীল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে আনন্দের সঙ্গে জীবনকে উপভোগ করা।

লেখক : শিক্ষার্থী

আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"