পর্যবেক্ষণ

চেনা পৃথিবীর অচেনা রূপ

আবুজার গিফারী

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

করোনাভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবী আজ করালগ্রাসে শ্বাসরুদ্ধ। কোভিড-১৯ আমাদের জীবনকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে, সবাইকে নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। প্রকৃতি নীরব-নিস্তব্ধ, নেই কোনো কোলাহল। বাতাসে ভেসে আসে মানুষের আর্তনাদের বিলাপ, লাশের গন্ধ। মানুষের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। অস্ত্রের ঝনঝনানি, ক্ষমতার দম্ভ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসীম অর্থের প্রাসাদ কিছুই কাজে লাগছে না। এই তো কিছুদিন আগেও পৃথিবী পার করছিল তার ব্যস্তময় সময়। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, চীন, মিয়ানমারে চলছিল মুসলমানদের রক্তের স্রোতে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, রাশিয়া, ফ্রান্স তারা তাদের ক্ষমতার নৈপুণ্য দেখাতেই ছিল ব্যতিব্যস্ত। আর তখনই অদৃশ্য শক্তি করোনা পৃথিবীর স্বাভাবিক গতিশীলতাকে তোয়াক্কা না করেই পৃথিবীকে থমকে দিল। এ যেন পৃথিবীর ওপর প্রকৃতির এক মহাপ্রতিশোধ।

একটি ভাইরাস কী পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে বিশ্ববাসী এখন সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। ভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবীর স্বাভাবিক গতিশীলতায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। শৈশবের রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো যেখানে পার করেছিÑ চেনা পথঘাট, চেনা শহর, চেনা গ্রাম আজ বড্ডই অচেনা। যে গ্রামের কাঁদাজল গায়ে মেখে বড় হয়েছি, সে গ্রামটাও যেন বেশ অপরিচিত হয়ে গেছে করোনার ভয়াল থাবায়। চারদিকে শূন্যতা বিরাজমান। অপরিচিত ঈদ উদ্যাপন, ছোটকাল থেকেই বুঝে এসেছি ঈদ মানে নতুন জামা পরে ঈদগাহ ময়দানে পরিবারের সঙ্গে দলবেঁধে ঈদের নামাজ আদায়, একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি, করমর্দন ইত্যাদি। তারপর একে একে বন্ধু, বড় ভাই, ছোট ভাই ও আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে মিষ্টিমুখ করা। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে দুটি আনন্দঘন দিন। যে দিনটা পালনের জন্য দূর-দূরান্তর থেকে মানুষ প্রিয়জনের কাছে ছুটে আসে। বাচ্চাদের হইচই, ঈদ সেলামি, নিত্যনতুন বাহারি পোশাকে প্রকৃতিও যেন কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে নিদারুণ আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্ত আজ এগুলো শুধুই স্মৃতি। নীরবে-নিভৃতে কেটে গেল দুটো ঈদ। ছিল না বাচ্চাদের হইচই বা দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়ার প্রকৃত সুখ। আর এগুলো সম্পন্ন না হওয়ার পেছনে একমাত্রই দায়ী হলো কোভিড-১৯; যা নোভেল করোনাভাইরাস নামে পরিচিত।

বর্তমানে করোনার আঘাতে পৃথিবীর সর্বস্তরেই টালমাটাল অবস্থা। ভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে বিশ্ব আজ যে ব্যবস্থা বেছে নিয়েছে তা হলো লকডাউন। ফলে বিশ্ববাসী আজ গৃহবন্দি। দিন আনা, দিন খাওয়া মানুষ পড়েছে বিপাকে। তবে বর্তমান সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় তাদের কষ্ট কিছ্টুা লাঘব হয়েছে। কিন্তু যারা মধ্যবিত্ত তারা আছে চরম বিপাকে। না পারে লোকলজ্জার ভয়ে কারো কাছে হাত পাততে, আবার না পারে অসীম কষ্ট সহ্য করে জীবন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে। কাজকর্ম না থাকায় দিনের বেশির ভাগ সময়ই তারা অলসভাবে পার করছে। দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, পৃথিবী করোনামুক্ত হলেও করোনাকালে অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে তার রেশ কাটতে পৃথিবীকে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু দেশ অর্থনীতির চাকাকে সচল অবস্থানে রাখতে লকডাউন শিথিল করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ট্যুরিস্ট প্লেস, হোটেল- মোটেল, রেস্তোরাঁ খুলে দিয়েছে। এজন্য আবার কোনো কোনো মহল থেকে প্রশ্ন আসছে আগে জীবন নাকি জীবিকা? তবে এসব প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। বিদেশি কিছু সংস্থার তথ্যমতে, গত মার্চ মাসের শেষ নাগাদ মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে ১৫০ কোটি শিশু-কিশোরের পড়ালেখা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গত এপ্রিলে মালালা ফান্ড একটি রিপোর্ট দেয় যে, মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে এক কোটি কিশোরী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনার কারণে বিশ্বের প্রায় ৫৫ কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। যা বিশ্বব্যাপী মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। এই ৫৫ কোটির মধ্যে ২৪ কোটিই এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের। অর্থাৎ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানও অনেকটা শঙ্কাজনক। করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ জানাচ্ছে, মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৮ মার্চ পর্যন্ত দেশটিতে ৬৬ লাখ কর্মী বেকার হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক অব আমেরিকা জানিয়েছে, অবস্থার আরো অবনতি হবে। বেকারত্বের হার ছাড়িয়ে যেতে পারে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। তাতে করে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মন্দার মুখোমুখি হতে পারে দেশটি। বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করার জন্য ছোট ছোট এই পরিসংখ্যানগুলোই যথেষ্ট।

এদিকে করোনাকালে পৃথিবী যখন ভয়াবহ সন্ধিক্ষণ পার করছে, তখনই প্রকৃতি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মানুষ গৃহবন্দি হওয়ার কারণে সমুদ্রসৈকতে এখন প্রকৃতির রাজত্ব। কক্সবাজার থেকে কুয়াকাটা, শালবন থেকে সুন্দরবন, চারদিকে প্রকৃতি এখন অপরূপ। সৈকতের তীরে নিজেদের আবাস ফিরে পেয়ে আনন্দের সুর তুলেছে লাল কাঁকড়া। প্রায় কিনারে এসে লাফিয়ে নাচছে রংবেরঙের ডলফিন। সজীব হয়ে উঠেছে বন। শব্দ ও বায়ুদূষণের জন্য বিশ্বব্যাপী সমালোচিত ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর এখন অনেকটা নীরব। এতে সজীবতা ফিরেছে প্রকৃতিতে। বিশ্বজুড়ে কমেছে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের হার। ফলে ওজোনস্তর আছে নিরাপদ। বায়ুসূচক নেমেছে স্বস্তির জায়গায়। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির একদল বিজ্ঞানীর করা গবেষণায় উঠে এসেছে, শিল্প, কল-কারখানা বন্ধ, বিমান চলাচল বন্ধ এবং জ্বালানির ব্যবহার কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন চার দশমিক ছয় শতাংশ কমেছে। গবেষকরা বলেছেন, এ সময় বিশ্বে সূক্ষ্ম ধূলিকণা দূষণ কমেছে ৩.৮ শতাংশ। অন্য দুই ধরনের বায়ুদূষণ কমেছে ২.৯ শতাংশ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ কার্বন নির্গমনকারী দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে রেকর্ড মাত্রায় কার্বন নির্গমন কমেছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সাগরলতা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পাখির কলকাকলী, ডলফিনের আত্মহারা উন্মাদ, সবুজের সমারোহ, সুস্থ বাতাস, যে বাতাসে নেই কোনো ধূলিকণা, ভাপসা দুর্গন্ধ। যে শহরগুলোতে ট্রাফিক জ্যাম, বিব্রতকর হর্নের শব্দ, বাতাসে ধূলিকণা, কালো ধোয়া ও সারাক্ষণ মানুষের হইচই লেগেই থাকত, সেই শহরগুলোও এখন সেজেছে তার অপরূপ সাজে। নেই কোলাহল, জ্যাম, পরিবহন চালকদের লাগামহীন ড্রাইভিং। এখন পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে না সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াল চিত্র। এ যেন প্রকৃতিকে মানুষের জন্য পুনর্গঠিত করতেই স্রষ্টার পক্ষ থেকে ফরমান জারি।

করোনাকালে যখন আমার দেশ অদৃশ্য শত্রুকে মোকাবিলা করতে গিয়ে দিশেহারা; তখনই সুপার সাইক্লোন আম্পান ও উত্তরাঞ্চলে বন্যার প্রকোপ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। ২০ মে বুধবার। সেদিন কী ঘটেছিল দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের ওপর; সে ঘটনা যুগ যুগ ধরে তাদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে সুপার সাইক্লোন আম্পানে ১৩০০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর অঞ্চলে বন্যার প্রকোপে লাখ লাখ মানুষ হারিয়েছে তাদের বাসস্থান। খাদ্য সংকট ও সুপেয় পানির অভাবে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। সুতরাং আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, করোনা আমাদের ব্যস্ততম জীবনকে রুদ্ধ করেছে। অন্যদিকে আম্পান ও বন্যা আমাদের জীবন জীবিকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এ পৃথিবীর কর্মব্যস্ততা আবার ফিরে আসবে। সহায়-সম্বলহীন মানুষ আবার ফিরে পাবে তার নির্জন তালপাতা, খড়পাতায় মোড়ানো কুঠির। বাচ্চারাও বাড়ির বাইরে যাবে খেলতে, মনের আনন্দে ডাকবে ডাহুক, দোয়েল, কোয়েল, ময়না। ছোটকালে রবীন্দ্রনাথের ‘দুর্বুদ্ধি’ নামক ছোটগল্পে পড়েছিলাম ‘হৃদয় যতই ব্যথিত হোক কর্মচক্র চলতেই থাকে’। এদিক দিয়ে কিছুদিন পর মানুষ করোনাকালের ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতি মেনে নিয়ে নতুন উদ্যমে আবার কর্মব্যস্ততায় নিমজ্জিত হবে, কিন্তু মানুষের মনে আজ যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা কি অতি সহজেই শুকাবে। যাহোক সময় থেমে থাকবে না, সময় চলবে সময়ের গতিতে। আমরাও আবার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডুবে থাকব কর্মের মধ্যে, পরিবারের ভালোবাসার মধ্যে। পুনরায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে। খুলবে দুস্থ মানুষের আয়ের উৎসদানকারী অনেক শিল্প কল-কারখানা, কর্ম প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। তবে হ্যাঁ, সবকিছু স্বাভাবিক হতে বেশখানিকটা সময়ের প্রয়োজন। সময়ের বিনিময়ে হলেও আমরা সেদিনটি চাই-ই চাই। আমরা সুন্দর একটা ভোর চাই। যে ভোরে ঘুম থেকে উঠেই যেন শুনি পৃথিবী করোনামুক্ত হয়েছে।

লেখক : শিক্ষার্থী

আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

 

"