পর্যালোচনা

ইসলামে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই

ড. শাহনাজ পারভীন

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় ঝুম বৃষ্টিতে ঘুম ভাঙলেও বুকের ওপর পাথরচাপা অনুভূতি নিয়ে সকাল হলো। হয় এভাবেই। ইদানীং প্রায়ই ঘুমের মধ্যে নানা রকম দুঃস্বপ্নে মনটা হতাশার শেষ মাথায় দাপাদাপি করে। থমকে থাকা জীবন আমার! এই কোভিড নাইনটিনের প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বেরই এক অবস্থা। কিন্তু তার পরও কিছু কিছু ঘটনা থাকে, কিছু কিছু দুর্ঘটনা থাকে তা একান্ত নিজের, ব্যক্তিগত। কাউকে বলতে চায় না মন। বলেওবা কি প্রতিকার পাওয়া যাবে? যায়? বিশেষ করে যারা প্রতিকার করবেন, তারাই যদি! যাক, বলছিলাম দুর্নীতির কথা।

‘দুর্নীতি’ শব্দটি নেতিবাচক। দুর্নীতি শব্দের আভিধানিক অর্থ : রীতি বা নীতিবিরূদ্ধ আচরণ, কুনীতি, অসদাচরণ ও নীতিহীনতা ইত্যাদি। এর আরবি প্রতি শব্দ আল ফাসাদ এবং ইংরেজি প্রতি শব্দ corruption। এটির ইতিবাচক শব্দ ‘নীতি’। যার জন্য আমরা আকুল। পৃথিবীময় সৎ এবং আপাত অর্থে ভীতু মানুষ এ আকাক্সক্ষার প্রজাপতির পেছনে দৌড়ায়। অথচ গুটিকয়েক নাক, মুখ, চোখওয়ালা দুই পেয়ে প্রাণীর জন্য আজীবন তা অধরাই থেকে যায় আকাক্সক্ষার উড়ন্ত ফিনিক্সের মতো।

দুর্নীতির সাধারণ বা নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। দুর্নীতি বলতে নীতি বা আইনবিরুদ্ধ কাজ বা আচরণকেই বোঝানো হয়। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যদি কেউ অন্যের আর্থিক অথবা বৈশ্বিক স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো পক্ষের বা পক্ষসমূহের ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে আইন পরিপন্থি কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে ওই কাজকে দুর্নীতি বলে চিহ্নিত করা হয়। এ সম্পর্কে Oxford advanced Learners dictionary-†Z ejv n‡q‡QÑ Willing to use their power to do dishonest or illegal things in return money or to get an advantage. ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ ক্ষমতা, অর্থপ্রাপ্তি, অন্য কাউকে ইচ্ছাকৃত অপমান, অবজ্ঞা বা কোনো অবৈধ সুযোগপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে অসৎ বা কোনো অসংগত কাজে ব্যবহার করাকেই দুর্নীতি বলা হয়।

দুর্নীতির সংজ্ঞা প্রসঙ্গে Social work dictionary-তে বর্ণিত হয়েছে, Corruption is in political and public service administration, the abuse of office for personal gain usually through bribery, extortion, influence padding and special treatment given to some citizens and not to others. এ সম্পর্কে ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ শর্মা বলেন, ওহ corruption a person willfully neglected his specified duty in order to have an undue advantage. ‘অবৈধ সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলাই দুর্নীতি।’ এ ছাড়া Transparency international-এর অভিমত হলো, corruption is the abuse of public office for private gain ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ লাভের জন্য গণপ্রশাসনের অপব্যবহারকেই দুর্নীতি বলা হয়।’

দুর্নীতি একটি চরম সামাজিক ব্যাধি। আরো একটু কঠিন ভাষায় তাকে অভিশাপও বলতে পারি। ইসলাম কোনো অবস্থায় দুর্নীতিকে সমর্থন করে না। মহান আল্লাহ আমাদের তার প্রেরিত মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এবং আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহম্মদ সা. বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে মানবজাতিকে বারবার সাবধান করেছেন। মহান আল্লাহ তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নিদর্শনও দেখিয়েছেন। কোনো জাতির ধ্বংসের আগে তাদের মধ্যে দুর্নীতি মহামারির মতো বিস্তার লাভ করে থাকে। মহান আল্লাহ যুগে যুগে কালে কালে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং এর রোধকল্পে এবং মানুষের দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা দিতে বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিকে শাস্তি দিয়েছেন। সেই শাস্তি দেওয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আল কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা দেশে সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং তাতে বড় বেশি দুর্নীতি করেছে, তখন তাদের ওপর তোমার প্রভু শাস্তির কশাঘাত হানলেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।’ আল কোরআন : ৮৯: ১১-১৪

এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, যখন দেশে দেশে আইন ও অধিকারের সীমা লঙ্ঘিত হয়, মহান আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করা হয় এবং এই দুর্নীতি বিস্তারের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয় অর্থাৎ দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে, তখন মহান আল্লাহ ওই দেশ ও জাতির ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের নানাভাবে শাস্তি দেন। যখন এই দুর্নীতি কোনো একক দেশ ছাড়িয়ে তা মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে যায়, তখন তার শাস্তিও মহাবিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন আর শুধু পাপিদের মধ্যে সেই শাস্তি বিদ্যমান থাকে না। তখন পুরো জাতিকেই মহান আল্লাহ চাবুক মারার মতো ভয়াবহ শাস্তি দিয়ে থাকেন। এজন্যই কোরআনে বলা হয়েছেÑ আজাবুন সাউতু বা শাস্তির চাবুক। আর বাস্তবতা হচ্ছে তা সকল জাতি, গোষ্ঠী মানুষকে ভোগ করতে হয়। কারণ সেই বহমান দুর্নীতিতে সবাই চুপ করেছিল। অথবা সাপোর্ট করেছিল। প্রতিবাদ করেনি। প্রতিবাদের চেষ্টাও করেনি। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে নিজে নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করেছিল।

বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, অবৈধ সিন্ডিকেট, ব্যবসায়িক দুষ্টচক্র, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্য, চিকিৎসা, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রীসহ নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ভোগ্যপণ্যে ভেজাল। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অথবা সরকারি-বেসরকারি অফিসে কোনো সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে ঘুষের লেনদেন এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষায় নকল, ভোট কারচুপি, দলিল দস্তাবেজে জালিয়াতি, শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানো, অবৈধ দখলদারি, অযোগ্য লোককে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান, আর্থিক অনিয়ম ইত্যাদি সব ধরনের দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। ইসলাম এসব কিছুকেই হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ আল কোরআনে বহুবার অন্যের অধিকার নষ্ট করাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। সহজ ও সঠিক পথ অনুসরণ করার হুকুম দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যর্পণ করতে। আর তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের যে উপদেশ দেন তা কতই না উৎকৃষ্ট! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা- (আল কোরআন : ৪: ৫৮)।’ মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না’- (আল কোরআন :২:৪২)। সব সামাজিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর এই হুকুম আমাদের মেনে চলতেই হবে। কারণ তিনি আমাদের পবিত্র কোরআনে অসংখ্য আয়াতে আইন অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বাণী উচ্চারণের মাধ্যমে সাবধান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না’- (আল কোরআন : ২:১৮৮)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না’- (আল কোরআন : ২: ১৯০)।

এই সীমা আইনের, ধর্মের, অধিকারের, ধৈর্যের, ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের সীমাও এর আওতাভুক্ত। এজন্যই প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে লোভে পড়ে হালাল রুজি ছেড়ে হারাম সম্পদ অর্জনও সীমা লঙ্ঘন বটে। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের হালাল ও পবিত্র যা দিয়েছেন তা হতে আহার করো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও নিয়ামতের জন্য শোকর কর। যদি তোমরা কেবল তারই ইবাদত করে থাক’- (আল কোরআন : ১৬ : ১১৪)। এই ইবাদত আমি করব আমার স্বার্থেই। আমার নিজেকে আমি ভালোবাসি বলেই আমি আমার কাজকে শুদ্ধ রাখব। ভালোবাসব এবং শেষ পর্যন্ত তার কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে। ফিরে যাব, তার সঙ্গে দেখা হবে এবং কৈফিয়ত দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের কৃতকর্মের ফলাফল আমাদের কড়ায় গ-ায় বুঝিয়ে দেবেন বলেই, তা আমাদেরকে মনে নিতে হবে বলেই আমরা এতটা সচেষ্ট থাকি। আত্মসমর্পণ করি শুধু তার কাছেই। আমরা প্রতি সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠের সময় বলি : ‘আমাদের সরল সঠিক পথে পরিচালনা করুন’- (আল কোরআন: ২ : ৬)। অথচ নিজেরাই তা মানতে নারাজ। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘হ্যাঁ, যে কেউ আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং সৎকর্মপরায়ণ হয় তার বিনিময় তার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে এবং তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না’- (আল কোরআন, ২ : ১১২)।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জালিয়াতি বা সঠিক তথ্য গোপন করল, সে আমাদের সমাজভুক্ত নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘যে লোক মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার ওপর দয়া করেন না।’ মুমিন ব্যক্তি সদয় ও ভদ্র স্বভাবের হয়ে থাকে আর পাপিষ্ট ব্যক্তি প্রতারক ও নিচ প্রকৃতির হয়ে থাকে। এক ধরনের ধোঁকাবাজি, যা মানুষের হক নষ্ট করে এবং প্রকৃত হকদার প্রতারিত হয়ে থাকে। তাই দুর্নীতির মাধ্যমে জাহান্নামের পথিক হওয়া থেকে বিরত থাকব। এটা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা লাভবান হলেও সামগ্রিকভাবে সমাজ ও অর্থনীতির ওপর এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আসুন! শুধু নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকি। ভালো রাখি সবাইকে।

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

[email protected]

 

"