মুক্তমত

চামড়া নিয়ে কারসাজি আর কত?

মাহবুবুল আলম

প্রকাশ | ০৬ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

গত কয়েক বছর ধরেই কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে শুরু হয়েছে নানা কারসাজি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফলে একদিকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে। কোরবানির চামড়া বরাবরই গরিব-মিসকিন ও এতিমের হক। কোরবানির ঈদে ধর্মপ্রাণ মানুষ গরু, মহিষ, ছাগল বা ভেড়া কোরবানি করেন। সেই পশুর চামড়া বিক্রির টাকা স্থানীয় মাদরাসার গরিব ছাত্র, এতিম-মিসকিন বা গরিব মানুষের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে থাকেন; কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই চামড়ার দাম পাচ্ছেন না কোরবানি দাতারা। এবারের কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এমন কমা কমেছে যে, বিক্রির জন্য ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লাখ টাকার কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। গত বছরও নির্ধারিত দরে বিক্রি না হওয়া কাঁচা চামড়া খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমেছিল। এবারো প্রায় একই অবস্থা। তবে এবার করোনার কারণে অন্য বছরের তুলনায় কোরবানি অনেক কম হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর ও সচিত্র প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, করোনার কারণে মৌসুমি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে তেমন বের হননি। তবে মাদরাসার ছাত্ররা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া কিছু কিছু এলাকায় চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য নিয়ে গেছে গরিব মানুষরা। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা বিভিন্ন স্থানে চামড়া কিনেছেন। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে বা বলতে গেলে ‘যদি ফেলে দিস তবে আমায় দিস’ এভাবে। অথচ চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রতি বর্গফুট গরুর লবণযুক্ত চামড়া ঢাকায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ও ঢাকার বাইরে ২৮ থেকে ৩২ টাকা, আর খাসির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা ও বকরি ১০ থেকে ১২ টাকা নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই নির্ধারিত দরে ঢাকায় লবণ ছাড়া প্রতিটি ছোট গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, মাঝারি গরু ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা ও বড় গরু ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হওয়ার কথা।

তবে দেশের কোথাও কোথাও প্রতিটি বড় গরুর চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। মাঝারি চামড়া ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা ও ছোট দেড়শ’ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর প্রতিটি খাসির বড় চামড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা ও ছোট চামড়া ২০ থেকে ২৫ টাকায় কিনছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে ছোট চামড়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাঝারি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা ও বড় চামড়া ৭ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের খবরে দেখা গেছে। তবে এলাকাভেদে চামড়ার দামে তারতম্যও হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া দরে লবণ ছাড়া কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে বিক্রি হওয়ার কথা, কিন্তু কোথাও তা হয়নি। তাই দেশের অনেক এলাকায় ক্ষোভে-দুঃখে কোরবানির পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা বা পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার খবরও বেরিয়েছে।

মানুষ বলাবলি করছে, এবার সরকারিভাবেই কোরবানির পশুর চামড়ার কম দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার একটি ছাগলের চামড়া আকারভেদে ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায়। বিক্রেতারা জানান, আড়তে নিয়ে বিক্রি করলে গাড়ি ভাড়াও ঠিকমতো উঠছে না। এ প্রসঙ্গে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে আলাপে আড়তদাররা বলেন, আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা পাইনি। এ বছর ধারদেনা করে চামড়া কিনেছি। সামনে কী হবে বুঝতে পারছি না।

গত কয়েক বছর ধরেই কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি হচ্ছে। ফলে দেশের হতদরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে। কারা এ কারসাজির সঙ্গে জড়িত তা সরকারকেই দেখতে হবে। কেননা সুযোগ সন্ধানীরা গ্রাম-গঞ্জে এ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। বলা হচ্ছে, সরকারের নিজেদের লোকদের কারণেই নাকি মানুষ কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। এতে ভুক্তভোগীদের মনে স্বস্তি ফিরে আসবে।

লেখক : কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক

[email protected]

 

"