বিশ্লেষণ

করোনা সংক্রমণ ও বাংলাদেশ

প্রকাশ | ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

গোপাল অধিকারী

গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তারপর থেকেই চলছে করোনার তা-ব। সাম্প্রতিক কয়েকটি দেশে করোনাভাইরাস নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে আবার পূর্বের কয়েকটি দেশে কমেছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। করোনার ভয়াল থাবার শিকার বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ। বিশ্বব্যাপী এক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। তবে করোনার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বলা যায় বাংলাদেশ করোনার প্রভাবের দিক থেকে স্বস্তির সমীকরণে রয়েছে। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হননি। বরং এ পর্যন্ত আক্রান্ত ৪৮ জনের মধ্যে আরো চারজন সুস্থ হয়েছেন। এ হিসাবে গত শনিবার দুপুর ১২ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৫ জন। এছাড়া এ সময়ে নতুন করে কোনো মৃত্যুও নেই। গত শনিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর মহাখালীতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

বিশ্বব্যাপী এক প্রকার যুুদ্ধই চলছে বলা যায়, যার এক প্রান্তে সব দেশের জনগণ আর অপর প্রান্তে করোনা। যুদ্ধে তবু একটি স্বস্তির জায়গা থাকে কিন্তু করোনার কাছে কেউ যেন স্বস্তি পাচ্ছে না। সবার মধ্যে কাজ করছে মানসিক চাপ। আর করোনার প্রভাব পরেছে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও অর্থনীতিসহ সব কিছুর ওপর। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সারি। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এই মৃত্যুর মিছিল। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ২৭ হাজার ছাড়িয়েছে আর আক্রান্ত হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজারেরও বেশি। করোনার সর্বশেষ গতিবিধি বা তা-ব বা পূর্বাভাস জানতে ওয়ার্ল্ডওমিটার থেকে তথ্য নিয়ে একটি সমীকরণ দেখে নেই। সমীকরণে দেখা যায়, গত ২০ মার্চ পর্যন্ত করোনায় চীনে মারা যায় ৩ হাজার ২৪৮ জন আর সুস্থ হয় ৭০ হাজার ৪২০ জন। গত ২১ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৩ হাজার ২৫৫ জন আর সুস্থ হয় ৭১ হাজার ৭৪০ জন। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় সাতজন আর সুস্থ হয় ১ হাজার ৩২০ জন। ২২ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৩ হাজার ২৬১ জন আর সুস্থ হয় ৭২ হাজার ৪৪০ জন। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত করোনায় মারা যায় ৩ হাজার ২৭০ জন আর সুস্থ হয় ৭২ হাজার ৭০৩ জন। গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৩ হাজার ২৭৭ জন আর সুস্থ হয় ৭২ হাজার ৭০৩ জন। গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৩ হাজার ২৮১ জন আর সুস্থ হয় ৭৩ হাজার ৬৫০ জন। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত করোনায় চীনে মারা যায় ৩ হাজার ২৮৭ জন আর সুস্থ হয় ৭৪ হাজার ৫১ জন। অর্থাৎ এই সাত দিনে চীনে মোট ৩৩ জন রোগী করোনায় মারা যায় আর সুস্থ হয় ৩ হাজার ৬৩১ জন। আর এই সাত দিনে চীনে করোনায় মোট নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ১৯২ জন।

আর গত ২০ মার্চ পর্যন্ত করোনায় ইতালিতে মারা যায় ৩ হাজার ৪০৫ জন আর সুস্থ হয় ৪ হাজার ২৫ জন। গত ২১ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৪ হাজার ৩২ জন আর সুস্থ হয় ৫ হাজার ১২৯ জন। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় ৬২৭ জন আর সুস্থ হয় ১ হাজার ১০৪ জন। গত ২২ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৪ হাজার ৮২৫ জন আর সুস্থ হয় ৬ হাজার ৭২ জন। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত করোনায় মারা যায় ৫ হাজার ৪৭৬ জন আর সুস্থ হয় ৭ হাজার ২৪ জন। গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৬ হাজার ৭৭ জন আর সুস্থ হয় ৭ হাজার ৪৩২ জন। গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৬ হাজার ৮২০ জন আর সুস্থ হয় ৮ হাজার ৩২৬ জন। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত করোনায় ইতালিতে মারা যায় ৭ হাজার ৫০৩ জন আর সুস্থ হয় ৯ হাজার ৩৬২ জন। অর্থাৎ এই সাত দিনে ইতালিতে মোট ৪ হাজার ৯৮ জন রোগী করোনায় মারা যায় আর সুস্থ হয় ৫ হাজার ৩৩৭ জন। আর এই সাত দিনে ইতালিতে করোনায় মোট নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৮ জন।

অন্যদিকে গত ২০ মার্চ পর্যন্ত করোনায় স্পেনে মারা যায় ১ হাজার ২ জন আর সুস্থ হয় ১ হাজার ৮১ জন। গত ২১ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ১ হাজার ৩২৬ জন আর সুস্থ হয় ১ হাজার ৫৮৮ জন। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় ৬২৭ জন আর সুস্থ হয় ১ হাজার ১০৪ জন। গত ২২ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ১ হাজার ৭৫৩ জন আর সুস্থ হয় ২ হাজার ১২৫ জন। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত করোনায় মারা যায় ৩ হাজার ৩৫৫ জন আর সুস্থ হয় ৩ হাজার ৩৫৫ জন। গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ২ হাজার ৬৯৬ জন আর সুস্থ হয় ৩ হাজার ৭৯৪ জন। গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় ৩ হাজার ৪৩৪ জন আর সুস্থ হয় ৫ হাজার ৩৬৭ জন। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত করোনায় স্পেনে মারা যায় ৩ হাজার ৬৪৭ জন আর সুস্থ হয় ৫ হাজার ৩৬৭ জন। অর্থাৎ এই সাত দিনে স্পেনে মোট ২ হাজার ৬৪৫ জন রোগী করোনায় মারা যায় আর সুস্থ হয় ৪ হাজার ২৮৬ জন। আর এই সাত দিনে স্পেনে করোনায় মোট নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজার ৪২৬ জন।

চোখ রাখি বাংলাদেশে, বাংলাদেশে গত ২০ মার্চ পর্যন্ত করোনায় মারা যায় একজন আর সুস্থ হয় তিনজন। গত ২১ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় দুজন আর সুস্থ হয় তিনজন। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় একজন আর সুস্থ সংখ্যা শূন্য। গত ২২ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় দুজন আর সুস্থ হয় পাঁচজন। গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত করোনায় মারা যায় তিনজন আর সুস্থ হয় পাঁচজন। গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় চারজন আর সুস্থ হয় পাঁচজন। গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত মারা যায় পাঁচজন আর সুস্থ হয় সাতজন। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত করোনায় বাংলাদেশে মারা যায় পাঁচজন আর সুস্থ হয় ১১ জন। অর্থাৎ এই সাত দিনে বাংলাদেশে মোট পাঁচজন রোগী করোনায় মারা যায় আর সুস্থ হয় আটজন। আর এই সাত দিনে বাংলাদেশে করোনায় মোট নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯। উপরোক্ত সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় করোনার প্রকোপ বাংলাদেশে এখনো মারাত্মক নয়। মারাত্মক রূপ রোধ করতে সরকার বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। গণমাধ্যম করোনার জন্য আলাদা বার্তা বিভাগ করেছে বা গুরুত্ব সহকারে করোনার সার্বিক অবস্থা তুলে ধরছেন। সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা অনুসরণ করলে করোনা বাংলাদেশে তেমন ক্ষতি করবে না বলে আশা করা যায়। করোনার ভয়াল থাবা বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেবে, এমন প্রত্যাশায় থাকলাম। ইয়েমেন, উত্তর কোরিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কেমিনিস্তান, সোলোমান আইল্যান্ড, ভানুয়াতু, সামোয়া, কিরিবিতি, মাইক্রোনেশিয়া, টোঙ্গা, মার্শাল আইল্যান্ড, পালাও, টুভ্যালু, নাউরু, বুরুন্ডি, সাউথ সুদান, সিয়েরা লিওন, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, বতসোয়ানা, লেসেথো প্রভৃতি দেশে আঘাত করেনি করোনা বা কয়েকটি দেশকে যেমন স্বল্প প্রাণহানিতেই বিদায় নিয়েছে করোনা বাংলাদেশেও তেমনি করোনা বড় ধরনের কিছু করার আগেই বিদায় নিবে সেই প্রত্যাশা করি। প্রত্যাশা করি সবাই মিলে সচেতনতার মাধ্যমে করোনার বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়ার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

[email protected]

 

"